বাংলাপ্রিয়বিভাগ
প্রবন্ধ

নামাজ, শয়তান ও স্বদেশ

লেখার আকার

“Science without religion is lame, religion without science is blind.” আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তি ইদানিং মনে পড়ছে মসজিদ বন্ধ রাখা না-রাখা প্রসংগে।

আগেভাগেই বলে রাখি, এটা শয়তানি আলোচনায় ভরপুর, ইতিবাচক একটা পোস্ট। মসজিদ খোলা রাখার পক্ষপাতী মানুষের সংখ্যা যে নিতান্ত কম না, সেটা টের পাচ্ছি অনলাইনে ঘোরাঘুরি করে। কিছুদিন আগে এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল, তিনিও বললেন – ব্যাংক খোলা, বাজার খোলা, শুধু নামাজের জায়গা বন্ধ! এইটা মানা কঠিন। কি আর করা, আত্মীয়স্বজন ডাইকা বাসাতেই জুম্মার ব্যবস্থা করতে হবে।

শপিং মল ‘সীমিত আকারে’ খুলতে যাচ্ছে। ফ্যাক্টরি চালু হচ্ছে। এই অবস্থায় মসজিদ খোলার দাবি যে ক্রমেই আরো জোরালো হবে, সেটা ধরে নেয়া যায়। অথচ মহামারী এলাকায় প্রবেশ করা যাবে না, নিজ এলাকা মহামারীগ্রস্থ হলে বের হওয়া যাবে না, সংক্রমিত মানুষের আশেপাশে থাকা যাবে না, অসুস্থ মানুষদেরকে সুস্থদের সাথে রাখা যাবে না, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে – হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সেসব কথা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন।

এমনকি তিনি যে ঝড়-বৃষ্টির দিনে জুম্মার নামাজ মসজিদে না পড়ে বাসায় পড়তে বলতেন, সেই উল্লেখ পাওয়া যায় ইবনে কুদামা আল-মাকদিসির বিখ্যাত ‘আল-মুঘনি’ গ্রন্থে।

কুরআন-হাদিসের প্রিভ্যালেন্ট একটা থিম হচ্ছে, preservation of life: প্রাণ-সংরক্ষণ। জান বাঁচানো ফরয, নিজের ও অন্যের। তাহলে যারা জামাতে নামাজ পড়ার জন্য উশখুশ করছেন, তাদের মোটিভেশনের উৎসটা কী? তাদের সচেতন বা অবচেতন মনের মধ্যে দিয়ে কী ধরনের চিন্তাপ্রবাহ হচ্ছে?

সেই রহস্যের জট খুলতে হলে শুরু করতে হবে খুব পুরানো একটা গল্প থেকে।


সৃষ্টির আদিতে আদম-হাওয়া বেহেশতে দিন গুজরান করছেন। একদম গার্ডেন গার্ডেন জীবন যাকে বলে, শুধু শান্তি আর শান্তি।

একদিন শয়তান এসে তামিল ছবির নায়কদের মতো পেট ঘষতে ঘষতে বললো – আরে আদম, দোস্ত! তুমি নাকি এখনো গন্ধম ফল টেস্ করো নাই? যেই মজা, খাও খাও!

আদম শৈশবের সরলতা নিয়ে বললেন – কিন্তু ফ্রেন্ড, খোদা যে আমাকে ঐটা খেতে নিষেধ করেছেন?

– আরে ধুর! ঐ হালায় তো পুরানা চিটার। খাইলে তোমার সুপারপাওয়ার হৈব, সামলাইতে না পাইরা হ্যায় উষ্টা খায়া পড়বো। তাই এইসব হাবিজাবি বুঝাইছে।

– সুপারপাওয়ার কী?

– সুপারপাওয়ার মানে.... যাউগ্গা টাইম নাই, খাইবা কি খাইবা না?

– কিন্তু উনি যে বলেছেন খেলে আমরা মরে যাব?

– তোমার মাথা। খায়েই দেখ না!

– ....

– ধুর আদম! তুমি হাবলা, হাবলাই থাইকা গেলা.... অ্যাই হাওয়া, কেমন আছ? শুনলাম তোমার নাকি মিষ্টি কিছু খাইতে ইচ্ছা করতেছে?

বা এরকম একটা কিছু। বলা বাহুল্য, Garden of Edenয়ের অরিজিনাল গল্পটা আরো শৈল্পিক এবং সিরিয়াস। আমারটার মতো কোয়ারেন্টিনে-থাকতে-থাকতে-মাথা-নষ্ট টাইপ না। বাইবেলে অবশ্য প্রচুর হিউমার আছে। কুরআনে অন্তত একটা প্রেমের গল্প আছে। আরেকদিন হয়তো সেসব নিয়ে আলাপ হবে।

আপাতত একেশ্বরবাদে শয়তানের বিবর্তনের দিকে মন দেয়া যাক। কারণ আজ যারা ধর্মীয় গাইডেন্সের উল্টা পথে হেঁটে সামাজিক দূরত্ব লংঘন করতে ইচ্ছুক, তাদের ইচ্ছের শিকড়টা সেখানেই।


ইহুদি ধর্মে সেইটান ওরফে ডেভিল ওরফে শয়তানের কনসেপ্ট নাই বললেই চলে। কিন্তু খৃষ্টধর্মে সেইটান যথেষ্ট গুরুত্ববহ।

বাইবেলে সে রীতিমত যীশুর প্রতিপক্ষ; শয়তান বা শয়তানির কনসেপ্ট যেজন্য ক্রিশ্চিয়ানিটিতে Evilয়ের সমার্থক হয়ে গেছে। নিউ টেস্টামেন্টে exorcismয়ের বহু উল্লেখ আছে। বঙ্গীয় পরিভাষায় যাকে বলে, ওঝাগিরি।

এখানে অবশ্য একটা ‘কিন্তু‘ আছে। তোরাহ্‌/ওল্ড টেস্টামেন্টে আদম-হাওয়ার ন্যারেটিভে শয়তানকে কিন্তু ‘শয়তান‘ বা সেরকম নামে ডাকা হয়নি। ডাকা হয়েছে Serpent, অর্থাৎ সাপ বলে।

এত কিছু থাকতে সাপ কেন? সেই উত্তরটা খুবই ইন্টারেস্টিং।

Garden of Edenয়ের গল্পটা আসলে খুবই পুরানো। প্রাচীন সাহিত্যে-পুরাণে প্রায়ই সাপ প্রাণীটাকে দেখা যায় agent of change হিসেবে। কারণ সাপ চামড়া বদলায়।

একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর সে পুরানো চামড়া ঝেড়ে নতুন চামড়ায় আবির্ভূত হয়। কাজটার শুরুতে সাপ কোন গর্ত বা আবদ্ধ জায়গায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে প্রথমে শক্ত কিছুতে মাথা ঘষে পুরানো ছালটায় একটা ছিদ্র করে, তারপর কয়েকদিনের চেষ্টায় সেই ছিদ্র দিয়ে টাটকা ত্বক নিয়ে বের হয়। আগের চামড়াটা সেই নির্জন জায়গাটাতেই পড়ে থাকে, ফেলে আসা শৈশবের মতো।

জীবন মানেই যে পরিবর্তন, সাপ সেটার জ্যান্ত উপমা। আদি গল্পগুলিতে তাই সাপ, ড্রাগন ইত্যাদি চামড়া-খসানো জীবরা বেশ সম্মানিত। সেই সূত্রে কখনো সাপ দেব-দেবী বা দৈব সহচর, কখনো জ্ঞান-বৃক্ষের রক্ষাকর্তা, আবার কখনো বিদগ্ধ প্রতিপক্ষ।

এখনো সেজন্য নাগিন-টাইপ সিরিয়াল হয়, সিনেমা হয়, আইটেম সং হয়। অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিকের লোগোতে যে প্যাঁচানো একটা সাপ থাকে, তার উৎসও সেই প্রাচীন ভক্তি। একই ধারাবাহিকতায় Game of Thronesয়ের সেই আয়রন থ্রোন ধ্বংস করে খেলার যবনিকাপাত করে – কে আর? আমাদের মা-মরা ফিলোসফার ড্রোগন।

(বাই দ্য ওয়ে, ‘গল্প’ শব্দটা আমি এই লেখাজুড়ে ‘ন্যারেটিভ’ অর্থে ব্যবহার করছি, কেচ্ছা অর্থে না।)


একেশ্বরবাদে মানব জাতির গল্পটা নতুন করে বলার ইচ্ছেটা স্পষ্ট। তাই বাইবেলে সাপ ভিলেন।

প্রজ্ঞার বদলে তার মধ্যে আমরা অবজ্ঞা লক্ষ্য করি, মহত্ত্বের পরিবর্তে ছলনা। ঈশ্বরের বিরূদ্ধাচরণ করার জন্য আদম-হাওয়ার পাশাপাশি সাপকেও শাস্তি পেতে হয়।

এই যে প্রাচীন একটা গল্পকে উল্টে ফেলা হলো, সেটা evolutionary psychologyর সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গেছে। সব প্রজাতির মধ্যেই আত্মরক্ষার কোন না কোন মেকানিজম কাজ করে। পুরা ব্যাপারটাই instinct, যেন বিপদে পড়লে ব্রেনকে চিন্তার সময়টুকুও খরচ করতে না হয়। এটাকে বলা হয় fight or flight response.

ধরুন আপনি চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়ালেন। বনের রাজার সেটা পছন্দ হলো না, তিনি হুংকার দিলেন। আপনার ঘাড়ের লোম অটোমেটিক খাড়া হয়ে গেল। জঙ্গলে বাঘটার মুখোমুখি হলে আপনার একেবারেই কোন চান্স ছিল না। কিন্তু আপনি জানেন, এই কংক্রিটের বনে সে বন্দি – আপনার জয় সুনিশ্চিত।

তাই দেয়াল টপকে আপনি একট লাঠি দিয়ে খাঁচার গায়ে জোরে জোরে বাড়ি মারতে থাকেন। দুই-চার ঘা বাঘের গায়েও লাগে। রাগের চোটে সে পাগলের মতো হয়ে যায়; গর্জনে গর্জনে মিরপুর চিড়িয়াখানা প্রকম্পিত হয়ে। বাবা-মা’র সাথে ঘুরতে আসা ছোট ছোট বাচ্চারা কেঁদে ফেলে। দেয়ালের ওপাশে দাঁড়ানো আপনার গার্লফ্রেন্ড ‘অ্যাই চলে আসো, ভয় লাগতেছে’ বলে হাসি-হাসি মুখ করে ভিডিও করতে থাকে।

হঠাৎ বাঘটা রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যায়। বিজয়ের আনন্দে আপনি হাউকাউ করে উঠেন। এমন সময় আপনি আবিষ্কার করেন, খাঁচার পিছন দিকের দরজাটা খোলা।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দুলাল নামের রয়েল বেঙ্গল টাইগারটা আপনার দিকে তেড়ে আসে। আপনার গার্লফ্রেন্ডের হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়। হাতের লাঠি ফেলে কোন এক অদৃশ্য ফ্লাইট ধরার তাড়াহুড়ায় আপনি প্রাণপণে খাঁচার চারদিকে দৌড়ানো শুরু করেন। আপনার পিছনে পিছনে বাঘটাও....

খুব সরল কিন্তু এফেক্টিভ একটা সিস্টেম –পারলে মারো, নইলে ভাগো। সেই সিস্টেমের জন্যই আমরা এখন পর্যন্ত টিকে আছি। সাপ-খোপের বেলায় অবশ্য ভজঘট লেগে যায়। কখন কোন্‌ গর্ত দিয়ে সাপ এসে ছোবল দিবে, সেটা বলা মুশকিল। পালাবেন কই? আবার সামনাসামনি পড়লে মারামারি করাটাও রিস্কি।

তাই সিস্টেমে exception ঢুকে গেল, সর্পের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকিতে হইবে। আজও আমাদের মধ্যে জিনিসটা আছে। কয়েক বছর আগে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট এবং সুইডেনের উপসলা ইউনিভার্সিটির একটা যৌথ রিসার্চে দেখা গেল, সাপের ছবি দেখলে ছয় মাস বয়েসী বাচ্চারাও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।

তাদের সেই দৃষ্টিতে যে অনুভূতিটার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তার নাম ভয়।


কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল দুনিয়ায় আল্লাহর খলিফা, মানে প্রতিনিধি হিসেবে। আর বিবর্তনবাদী লেন্স দিয়ে দেখলে শয়তান food chainএ মানুষের দুর্ধর্ষ কোন খাদকের উপমা।

আদি মানুষ বা প্রায়-মানুষদের জন্য সাপ খুব বড় একটা থ্রেট ছিল। কিন্তু কিছুটা সভ্য হওয়ার পর থেকে দৃশ্যমান কোন খাদকই আদম-সন্তানদের অজেয় না – তার যত ভয় ফুড চেইনের অদৃশ্য খাদকগুলিকে।

সেই পরম্পরায় নিউ টেস্টামেন্টে সাপের জায়গা নেয় Satan ওরফে শয়তান। একেশ্বরবাদে স্রষ্টার ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। এক একটা মহামারী, ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ – সবই আমাদেরকে লাইনে আনার জন্য উপরঅলার পরীক্ষা।

তবু সব মন্দের দায় সেইটানের। সে রোগ-বালাই ছড়ায়, মহামারী ঘটানোর পায়তারা করে, মানুষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এমন কি সে খুনীও।

ইসলামে শয়তান অবশ্য অতটা ঝাঁঝালো না। ক্ষমতা এবং গুরুত্বে সে ক্রিশ্চিয়ানিটির তুলনায় মিনমিনে। বাইবেলের original sinয়ের ব্যাপারটাও কুরআনে নাই; আল্লাহ স্পষ্টই আদম-হাওয়াকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শয়তানও যদি খাস দিলে অনুতাপ করে তাহলে আল্লাহর ইচ্ছা হলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। অর্থাৎ শয়তানের নিজেরই ‘নিরাময়’ হওয়ার চান্স আছে।

Garden of Eden/জান্নাতুল আদ্‌নি’র পর্বে অবশ্য কুরআনে সাপের বদলে সরাসরি ‘শয়তান’ শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহর আদেশে যখন ফেরেশতারা আদমকে সিজদা করলো, কিন্তু আল-শয়তান করলো না, তখন আবার তাকে ডাকা হয়েছে নাম ধরে (এই ঘটনাটা তোরাহ্‌ বা বাইবেলে নাই)।

‘ইবলিস’। সিজদায় ইবলিসের অনীহার কারণ ছিল সে আগুনের তৈরি, আর আদম মাটির। অতএব সেইটানের মতো সে fallen angel না – সে জ্বিন।

ইসলামি ontology অনুযায়ী জ্বিন অদৃশ্য, বংশবৃদ্ধি করে, মানুষ ও অন্য প্রাণীর উপর ভর করে, এক জায়গায় স্থির থাকে না, এবং বাতাসে উড়তে পারে। অযু’র দোয়া আছে, বাথরুমে যাওয়ার দোয়া আছে – এসবের কারণ এক শ্রেণীর জ্বীন-শয়তান টয়লেটে বাস করে, যাদের একমাত্র কাজ মানুষকে নাপাক করা। হাই তুললে মুখ ঢাকার নিয়ম, কারণ হা-করা মুখ দিয়ে শয়তান ঢুকে যেতে পারে।

আবার আরেক জায়গায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, মানুষের শরীরের ভেতরে শয়তান রক্তের মতো প্রবাহিত হয়....

চেনা চেনা লাগছে? লাগারই কথা, একদম সংক্রামক অণুজীবের মতো। Metaphorically speaking, ভাইরাস একটা শয়তান বা ইবলিস।


সমাজের অভ্যাসই হচ্ছে একটা ফ্রেমওয়ার্কে কাজ না হলে আরেকটা ট্রাই করা। কমিউনিজমে কাজ না হলে সিস্টেমে পুঁজিবাদ ঢুকে পড়ে।

গণতন্ত্র যদি অকার্যকর হয়, তাহলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে গোষ্ঠীতন্ত্র বা মৌলবাদ।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ অসুখ-বিসুখের জন্য কোন না কোন অপশক্তিকে দোষ দিয়ে আসছে। সেই প্রথা বদলে দিয়েছে বিজ্ঞান। অণুজীবদেরকে আমরা দেখতে-বুঝতে শিখেছি খুব বেশিদিন হয়নি – ভাইরাস আবিষ্কৃত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর একদম শেষদিকে। তারপর মেডিকেল সায়েন্সের এক একটা আবিষ্কার মিলাদে ছিটানো গোলাপজলের মতো পৃথিবীর সবাইকে কোন না কোনভাবে ছুঁয়ে গেছে।

জীবাণু কী সেটা এখন আমরা জানি, তাই রোগ-বালাইয়ের জন্য অপদেবতা বা জ্বিন-টিনকে আর দোষ দিই না। কিন্তু নিরাময় চেয়ে আজো সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, যারা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে ঘটা করে জামাতে নামাজ পড়তে চায় বা পড়ছে, তাদের গোঁড়ামির গোড়াটা কত গভীরে। করোনা-কালে এক একটা জানাজা, জুম্মা, তারাবি, আখেরি মোনাজাত, ঈদের জামাত – সবই আদতে প্রক্সি-শয়তানের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লড়াই।

সেই evolutionary impetusয়ের সঙ্গে যদি অশিক্ষা, বঞ্চনা, স্ট্রেস, অসচেতনতা, ইত্যাদি মিলিয়ে একটা ঘুগনি বানানো হয়.... তাহলে রোযার মাসে সতের কোটি মানুষের দেশে যে কেউ কেউ সেটা টেস্‌ করতে চাইবে, তাতে আশ্চর্য কি?

কিন্তু এ তো গেল যারা মহামারীর মধ্যে জামাতে নামাজ পড়তে আগ্রহী, তাদের অন্তরের অন্তঃস্থলের কথা। বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, খাদেম, খতিব, মুয়াজ্জিন, প্রমুখ কেন শুরু থেকেই মসজিদ বন্ধ করার দাবি তুললেন না? ইসলামের গাইডেন্স তো তাদেরই ভালো জানার কথা।

আমার মনে হয় সেই উত্তরটা আমরা সবাই কম-বেশি জানি।


অনেকদিন আগের কথা। আমি তখন কেবল নর্থ সাউথে ঢুকেছি বা ঢুকবো-ঢুকবো করছি।

কাঁঠাল বাগানের রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ছোটবেলায় আমাকে যে হুজুর আরবি পড়াতেন, তার সাথে।

বরাবরের মতোই তার পরনে মাড় দেয়া সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। বুক পর্যন্ত মেন্দি-রাঙা দাঁড়ি, মাথায় টুপি, পায়ে ইমিটেশন লেদারের স্যান্ডেল। উনার নাম মনে নাই; বোধহয় কোনদিন জিজ্ঞেস করার সাহসও হয় নাই। মুখভর্তি পান নিয়ে দূর থেকে আমাকে দেখে হুংকার দিলেন – অ্যাই তাশফীন, কৈ যাও?

এত বছর পরও মনটা খচ করে উঠলো, এই বুঝি লোকটা বেত বের করবে! বললাম – আস্‌সালামু আলাইকুম হুজুর, অফিসে যাই।

– ওয়ালাইকুমাস্‌ সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। তুমি চাকরি করা শুরু করছ কবে থেকে?

– এই তো হুজুর, বেশি দিন না।

– কোথায় চাকরি?

– একটা পত্রিকা অফিসে।

– বাহ! সুবহানাল্লাহ। সেই ছোট্ট তাশফীন এখন চাকরি করে!

– (আমি ভ্যান্দার মতো হাসি।)

– তাইলে তো তুমারে খাওয়ানো লাগে। নতুন চাকরি পাইছ।

এখানে বলা দরকার, চাকরিটা নিয়ে আমার অনেক গর্ব ছিল। পার্ট টাইম কাজ হলেও কয়েকটা ফিচার পেইজের দায়িত্বে ছিলাম। চ্যাংড়া বয়সেই বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের সাথে ভাই-ব্রাদারি করতাম; ভালোই লাগতো।

তার উপর বাপের হোটেলে থাকা-খাওয়ার সাথে সাথে পড়ার খরচ, যাতায়াত খরচ, জামাকাপড় এবং আহ্লাদ ফ্রি। ফলে সেই পার্ট টাইম চাকরি করেই আমার ক্ষুদ্র জীবনে শুধু টাকা আর টাকা। সেই বাষ্পেই হয়তো আহাম্মকের মতো হুজুরকে তখন বলে ফেললাম – না না আপনার খাওয়ানো লাগবে কেন! আমিই খাওয়াই, চলেন!

সঙ্গে সঙ্গে উনি মুখ অন্ধকার করে বললেন – এইটা কি শোনাইলা? একটা আদবের ব্যাপার আছে না? আমি শিক্ষক হয়ে তোমারে খাওয়াইতে চাইতেছি, তুমি বলবা, জ্বি কবে আসবো বলেন?

আমি নিমিষেই ক্লাস থ্রি’র তাশফীন হয়ে বলি – না না সেটাই হুজুর, কবে আসবো বলেন?

এবার হুজুর হাসি হাসি মুখ করে বললেন, সামনের বিষ্যুদবারদিন আইসো। দুপুরে আসতে পারবা, নাকি তখন কাজ থাকে?

বললাম পারবো। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে এক কেজি রসকদমের প্যাকেট নিয়ে সেই ভ্যাপসা-গরম বৃহষ্পতিবারে উনার বাসায় হাজির হলাম। এক বেডরুমের পরিপাটি একটা ফ্ল্যাট। তাতে ছেলে-মেয়ে, কাজের মেয়েসহ মোট পাঁচ-ছয়জনের বসবাস। একটা বিড়ালও আছে। জানালায় সাদা নকশাকরা প্লাস্টিকের পর্দা ঝুলছে। রুমের মাঝখানে চাদর টাঙিয়ে অন্দরমহল।

আন্টি, মানে হুজুরের স্ত্রী হাসি হাসি মুখ করে বললেন – আসছো? কতদিন পর আসলা, কত বড় হয়ে গেছ!

আসলেই তো, কত বড় হয়ে গেছি! শেষ যখন হুজুরের বাসায় গিয়েছিলাম, উনারা লক্ষীর বস্তির কাছে একটা টিনের চালঅলা একতলা বাসায় ভাড়া থাকতেন। তখন মনে হয়েছিল, উনাদের বাসাটা কি মজার, টিনের ছাদ আছে! কিন্তু এখন ফ্ল্যাটটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খালি মনে হচ্ছে, এই ঘুপচি বাসায় এতগুলি মানুষ আঁটে কি করে?....

– বসো, তোমার হুজুর নামাজে দাঁড়াইছেন।

ফ্লোরে পাটি বিছানো। আমি মিষ্টির প্যাকেটটা আন্টিকে দিয়ে বসলাম। একটুপর পাশের রুম থেকে হুজুর এসে বললেন – ওহ্‌ তাশফীন, আসছ!

– আর বৈলেন না, আপনার ছাত্র তো মিষ্টি নিয়ে হাজির হৈছে!

– অ্যাই তুমি আবার মিষ্টি আনতে গেছ কেন?

– আম্মু, ভাইয়া সন্দেশ আনছে!

– এইটা সন্দেশ না…. অ্যাই বাবু, এইটা কি মিষ্টি?

– আন্টি, রসকদম।

– আম্মু খাই?

– আইচ্ছা, খানা খায়ে খায়ো।

– এখন আমি আর মরিয়ম মিলে একটা খাই?

– আচ্ছা খাও।

সাদা-কালো বিড়ালটা আমার জিন্সের প্যান্টে মাথা ঘষে মিয়াঁও মিয়াঁও করতে থাকে। হুজুর খুশি খুশি গলায় বললেন, তুমি নতুন চাকরিতে জয়েন কৈরা এতগুলি টাকাপয়সা খরচ করে মিষ্টি আনলা, কাজটা ঠিক করো নাই।

আমি সাহস করে বললাম, অসুবিধা নাই।

কাজের মেয়েটা হাত ধোয়ার চিলম্চি দিয়ে যায়। প্রথমে আমি আর হুজুর খাবো, তারপর অন্যরা। লাঞ্চের মেন্যু মোটা চালের ভাত, কচুর লতি দিয়ে টেংরা মাছ, মাশকলাইয়ের ডাল, কালোজিরার ভর্তা, ডিমের তরকারি (তাতে দুইটা সিদ্ধ ডিম), আর ছোট্ট একটা বাটিতে ফালি করে কাটা শসা-টমেটোর সালাদ।

আন্টি প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। মাথার উপর ফ্যান ঘোরা সত্ত্বেও আমার পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকলেন।

হুজুর গপ্পোবাজ মানুষ। কোন্‌ কথা থেকে কোন্‌ কথায় পৌঁছে একসময় নিজেই বলে উঠলেন – তোমার মনে নাই হয়তো, আমরা আগে অন্য একটা বাসায় থাকতাম।

– মনে আছে হুজুর।

– এটাও ভাড়া বাসা। আমার আয়-রোজগার আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন ভালো, তাই বড় বাসা নিছি।

– খুব সুন্দর।

– তোমার জব কেমন চলতেছে?

– আছে আর কি।

– ‘আছে আর কি’ বলতে নাই। আল্লাহর কাছে শুকর করতে হয়। উনিই রিযিকের মালিক।

– জ্বি, ভালো চলতেছে।

– এই আমারে দেখ। ছয় মাস আগেও আমার বেতন ছিল আঠাশ শ‘ টাকা। এখন হৈছে চার হাজার টাকা। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। তা তুমি কেমন পাও?

তখন পেতাম প্রায় সাড়ে আট হাজার। আমি ফ্যাকাশে গলায় বললাম – ষোল শ’।

– বলো কি, নতুন চাকরিতে ষোল শ’ টাকা তো অনেক টাকা! মাশাল্লাহ!

– থ্যাংক ইউ।

– তোমারে খালি উপদেশ দিতেছি, কিছু মনে নিও না। তোমারে পড়াইতাম তো। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে বলতে হয়, আলহামদুলিল্লাহ…. এ কি তাশফীন, তোমার কি গলায় কাঁটা আটকাইলো?

– ….

– দলা করে ভাত গিল্লা খাও। ভাত দলা করে দিব?


সাধারণত আমি বর্ণনার খাতিরে জিনিসপাতি styize করি। কিন্তু হুজুরের ঘটনাটা কিছু মাইনর স্মৃতিবিচ্যুতি ছাড়া হুবহু লিখেছি।

আজো আমি, আমরা সবাই গলায় সেই অদৃশ্য কাঁটাটা বয়ে বেড়াচ্ছি। বাংলা ট্রিবিউনের কয়েক বছর আগের একটা রিপোর্ট অনুযায়ী রাজধানীর মসজিদগুলিতে ইমামদের বেতন ৬-১৫ হাজার টাকা। একজন মুয়াজ্জিনের সর্বোচ্চ বেতন ১০ হাজার, যদিও গড় বেতন তার অর্ধেক। ঢাকার বাইরে অবস্থা আরো সঙ্গীন; কোথাও মৌসুমী ধান দিয়ে তাদের পেমেন্ট হয়, আবার কোথাও বেতন মাসে ২০০-২৫০ টাকা।

সরকার ২০০৬ সালে মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করলেও বেশিরভাগ মসজিদ কমিটি সেগুলি মানে না। তাই সার্বিক বেতন-চিত্রটায় কোন চেইঞ্জ হয় না। একবিংশ শতাব্দীতে ধর্মের উপযোগিতা আছে কি নাই সে ব্যাপারে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এত কম আয়ে যে বেঁচে থাকা দায়, বিশেষ করে ফ্যামিলি নিয়ে, সেটা যে-কেউই মানবেন।

ঐ মানুষগুলিকে সেজন্য অনেকাংশে নির্ভর করতে হয় বড় বড় জামাতের কাতারে কাতারে কচ্ছপের মতো যে দানবাক্সগুলি ঘোরে, সেগুলির উপরে। তার সাথে আরবি পড়ানো, মিলাদ পড়ানো আর ছোটখাটো ব্যবসা যোগ করলে কোনমতে ভদ্রস্থভাবে দিন পার করা যায়।

কাজেই এরকম কেউ যদি করোনায় মসজিদ বন্ধ করার ব্যাপারে অনুৎসাহী হয়, এবং সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত জামাত অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায় –তাকে কতটাই বা দোষ দেয়া যায়? ক্ষুধা আর নৈতিকতার বক্সিং ম্যাচে প্রতিবার কে চ্যাম্পিয়ন হয়, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।

তাহলে সমাধান কী? আগের একটা পোস্টে লিখেছিলাম উপমহাদেশে মৌলবাদের পৌনঃপুনিকতার কথা। আমরা কি দারিদ্র্য, ধর্মান্ধতা, আর বিবর্তনের মারপ্যাঁচে অনন্তকাল খাবি খাবো?

সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমি বিশ্বাস করি লেখকদের কাজ empathy engineering, পলিসি বাৎলানো না। তবু এতদূর যেহেতু পড়েই ফেলেছেন, কিছু সাজেশন দিচ্ছি।


আপাতত টিকে থাকতে হবে। যেভাবেই হোক, এই ব্ল্যাক হোল মার্কা সময়টা দাঁতে দাঁত চেপে পার করতে হবে।

শুধু নিজে সুস্থ থাকলেই হবে না, অন্যকেও সুস্থ থাকার সুযোগ করে দিতে হব। সংক্রমণ জিনিসটাই এমন; আপনি স্ফটিক মিনারে বাস করলেও এক না এক সময় সেটা আপনার কাছে ঠিকই পৌঁছে যাবে।

তাই সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা ছাড়া গতি নাই। আর সেটার সবচেয়ে বড় অন্তরায় আমাদের আদিমতম সমস্যা – ক্ষুধা। কিন্তু অজস্র অভুক্ত মানুষের জন্য আপনি একা আর কী-ই বা করতে পারেন?

যদি সত্যি সত্যি এরকম ভেবে থাকেন, তাহলে আপনি সাইকোলজির ভাষায় scope insensitivity’র চক্করে পড়ে গেছেন। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটা মানুষ কতটুকু দান করবে সেটা অবচেতন কারণে দানপ্রার্থীদের সংখ্যার উপর নির্ভর করে।

যদি আপনাকে বলা হয় দরজার বাইরে ১০০ লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাদের খাবার কেনার জন্য প্লিজ কিছু টাকা দেন – তাহলে আপনি মানিব্যাগ খুলে যা দিবেন, তার চেয়ে বেশি দিবেন যদি সংখ্যাটা ১০০’র বদলে ১ হয়। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে একজন মানুষের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করা সহজ। কিন্তু বেশি লোকের সাথে রিলেট করা খুব কঠিন।

প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সর্বোচ্চ দান নিশ্চিত করতে দানপ্রার্থীদের ম্যাজিক সংখ্যাটা ১। কাজেই, একজনকে সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। সেভাবেই বিন্দু বিন্দু মিলে ম্যাক্সিমাম সাইজের সিন্ধু হয়ে যাবে।

আরেকটা জিনিস ভীষণ দরকার – তথ্য জোগাড় ও সংরক্ষণ। এই সময়ের ডেটা দিয়ে forecasting model তৈরি করে আসন্ন ঝড়-ঝাপ্টা কিছুটা সহজে সামাল দেয়া যাবে। অতএব সাংবাদিকদেরকে তাদের কাজ করতে দিতে হবে। সত্যি কথা বলার, বোঝার ও অ্যাপ্রিশিয়েট করার এটাই সময়।

নিঃসন্দেহে বহুমুখী একটা লং টার্ম সলিউশন লাগবে। আমি এখানে সেই সম্ভাব্য সলিউশনের শুধু একটা সাইড নিয়ে বলছি।

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কারমনস্ক করে গড়ে তুলতে হবে। আমার কাছে এটাকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মের নামে মানুষকে politically exploit করার ট্র্যাডিশন খুবই প্রাচীন।

পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ ইমাম-মুয়াজ্জিন কোন বেতন পান না, অথচ কট্টরপন্থী জোটের সাপোর্ট ছাড়া সেই দেশে কোন সরকার গঠন করা যায় না। ইন্ডিয়ায় শ্রেণীবৈষম্যের জন্য মুসলিমদেরকে দায়ী করে বিজেপি ক্ষমতায়। আমাদের দেশে আল্লামা শফী’রা এয়ার-অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে যায়। করোনা-বিধ্বস্ত গ্রামাঞ্চলে যে অচিরেই নতুন মোড়কে পুরানো কিছু ধর্মভিত্তিক দল মাঠে নেমে পড়বে, এবং কালের পরিক্রমায় যথারীতি পাবলিকের ঘাড় ভেঙে খাবে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত।

তাই সংস্কারমনস্ক মাদ্রাসা শিক্ষার বিকল্প নাই – এবং সেটার প্রণোদনা (motivation অর্থে) আসতে পারে ইতিহাস থেকে। ইসলামের স্বর্ণযুগে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, সাহিত্য, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, ইত্যাদি পড়ানো হতো। অ্যালজেব্রা, আরব্য রজনীর গল্প, opticsয়ের বহু আবিষ্কার, রুমির কবিতা, গণিতে ফাংশনের ধারণা, পৃথিবীর প্রথম জেনারেল হসপিটাল – সব ঐ সময়ের ফসল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ‘ইসলামের’ স্বর্ণযুগ বলা হলেও contextটা ছিল খুবই মাল্টিকালচারাল। বিভিন্ন জাতের, বর্ণের ও ধর্মের মানুষের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই সেই যুগটা ‘স্বর্ণযুগ’ হয়েছে।

বলা বাহুল্য, আধুনিক কালের মাদ্রাসাগুলি সেই তুলনায় যথেষ্ট সেকেলে। উপযুক্ত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও আন্তরিকতা পেলে সেগুলি বদলে যাবে। এটা যে আকাশকুসুম কল্পনা না, তার আভাস পাওয়া যায় আমেরিকার National Bureau of Asian Researchয়ের ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটা রিপোর্ট থেকে। বাংলাদেশের মাদ্রাসা ছাত্রদের ডিটেইলড্‌ সমীক্ষা করে সেখানে উপসংহার টানা হয়েছে:

”Their political consciousness and worldviews are formed more by their encounter with the wider world than by their affiliation with madrasas. [...] Like other members of society, they read newspapers, watch television, and become informed and concerned about the developments and upheavals in the Muslim world.

Their exposure to the media greatly influences their perceptions of world politics and the role of the West. In this respect, a madrasa teacher or a graduate student is not much different from an ordinary person from the general stream of education.

To essentialize the madrasa education as the primary or main culprit for the recent rise of extremism and militancy among some Muslim groups is, therefore, a tenuous proposition, and one that has more to do with the politics of ‘representation’ than with the reality of the situation."

সংক্ষিপ্ত বাংলা তর্জমা: মাদ্রাসা মানেই যে জঙ্গি তৈরির কারখানা, বা সেসব প্রতিষ্ঠানে ইসলাম বাদে কোন বিষয় নিয়ে কেউ চিন্তা করে না – এই জাতীয় ধারণার কোন ভিত্তি নেই। আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা মন্দিরের প্রতিমা ভাঙা ঠেকাতে গেছে, এমন ঘটনার উল্লেখও সেই রিপোর্টে পাওয়া যায়।

হয়তো ঢেলে-সাজানো সেই শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ে একটা ছেলে বা মেয়ে একদিন ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ জিতে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবে। অথবা এই যুগের আরব্য রজনীর গল্প লিখবে, আমাদের হিন্দু-মুসলিম-খৃষ্টান-বৌদ্ধ-আদিবাসী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

সেটা যদি না-ও হয়, ধরে নিচ্ছি বিজ্ঞানমনস্কতার সুবাদে তারা ধর্ম-ব্যবসায়ীদের তাবেদার হয়ে রাস্তায় নামবে না, মগজ-ধোলাই হয়ে মুজাহিদিন হয়ে যাবে না, নিজেকে জয় করার জিহাদে জয়ী হবে, দারিদ্র্য দূর করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আর সেটা-ও না হলে অন্তত এটুকু আশা করাই যায়, পরবর্তী মহামারীতে তারা নিজেরা জামাতে নামাজ পড়বে না, এবং অন্যদেরকেও পড়তে নিরুৎসাহিত করবে।

শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা সময়ই বলে দিবে। আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি – বাকিটা, ধর্মীয় পরিভাষায়, উপরঅলার ইচ্ছা।


এই লেখককে আরও পড়ুন