বাংলাপ্রিয়বিভাগ
পিতামহ · পর্ব ২

পর্ব ২

লেখার আকার

আমাদের বাসায় মুরুব্বিদের ‘আপনি’ করে বলার রেয়াজ নেই, তাই দাদাকে ডাকতাম ‘তুমি’ বলে। দাদাও আমাকে ‘তুমি’ বলতো, স্নেহের আতিশয্যে সেটা হয়ে যেত ‘তুই’।

একদিন সে খুব ইমোশনাল হয়ে বললো – দেখবি, তোর হাতেই আমার মরণ আছে!

আমি আঁতকে উঠে বললাম, হায় হায় এইটা কি বল্লা! আমাদের সম্পর্ক তো এত খারাপ না!

– আরে না না, বলতে চাচ্ছি তুই আমার মরার সময় থাকবি।

– মানে তুমি মার্ডার হওয়ার সময়?

– আহা না, মার্ডার হব কেন। আমি আল্লা-অলা লোক, ইনশাল্লাহ এরকম কিছু হবে না…

– তাহলে?

– বলতে চাচ্ছি, আমি যেই সময়ে মারা যাব, সেই সময়টায় তুই পাশে থাকবি।

– ও, সেইটা বলো। তা তুমি এত শিওর হচ্ছো কিভাবে?

– দেখিস, তাই হবে। (কিঞ্চিৎ অশ্রুবর্ষণ) তোর হাতের উপরেই আমি মরবো।

– উফ দাদা, কি যে তোমার ভাষার ছিরি…

শেষ অবধি দাদার বয়স কত হয়েছিল? মনে করতে পারছি না। জিজ্ঞেস করলে বুড়োটা একেক সময়ে একেক বয়স বলতো।

– দাদা, তোমার জন্ম কবে?

– ১৯০০ সালে।

– সেইদিন না বল্লা ১৯০২?

– আরে না, ১৯০০ সালেই আমার জন্ম। জর্জ দ্য ফিফথ্‌ আসছিলেন আমার স্কুলে, আমরা গান গেয়ে তাকে রিসিভ করছিলাম। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি।

তাতেও অবশ্য দাদার বয়স সম্পর্কে খুব একটা নিশ্চিত হওয়া যায় না। ঐ আমলে কে কোন্‌ বয়সে কোন্‌ ক্লাসে পড়তো, সেসবের কোন ঠিক ছিল না।

জর্জ দ্য ফিফথ্‌ ইন্ডিয়ায় এসেছিলেন ১৯১১ সালে। মাত্র দশ দিনের সফরে তিনি ও তার দলবল ৩৯টা বাঘ, ১৮টা গন্ডার ও ৪টা ভাল্লুক শিকার করেন। একটা বাঘ তিনি মেরেছিলেন একেবারে ঘাড় সিধা, মানে অন্যরা বাঘটা ধরে রেখেছিল, আর উনি সেটার ঘাড়ে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপেছিলেন। বীর বটে।

রাজনৈতিক ব্যাপারে দাদার মতাদর্শ ছিল খুব পরিষ্কার। ব্রিটিশরা খারাপ, কিন্তু ওদের ডিসিপ্লিন ভালো ছিল। ইন্ডিয়া স্বাধীন হওয়া খুবই দরকার ছিল, পাকিস্তান হওয়াটা সময়ের দাবী ছিল। তার চোখে বাংলাদেশ না হলেও চলতো। এই নিয়ে দাদার সাথে আমার প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হতো।

– দাদা, তুমি এই কথা বল্লা, তুমি তো একটা রাজাকার!

– কেন রাজাকার হবো? আমার একটা ওপিনিয়ন থাকতে পারে না?

– এইটা তো যেই সেই ওপিনিয়ন না, তুমি আমাদের দেশটাকে প্রায় অস্বীকার করতেছ।

– দেশ কোন সিরিয়াস ব্যাপার না। কাগজের খোঁচা দিলেই দেশ হয়ে যায়।

– কী বলো না বলো!

– সত্যি, দেশ মানে বর্ডার। বর্ডার টানার লোক সবসময়ই ছিল, থাকবে। যত কম থাকে ততই ভালো।

– কিন্তু পাকিস্তানিরা আমাদের উপর এত অত্যাচার করলো, সেটার কি হবে?

– হ্যা ঐসব ঠিক করে নাই। বুঝে করে নাই মনে হয়।

– …!

– …!

এরকম চলতেই থাকতো।


স্মৃতির মতো ছিনাল স্বভাবের কিছু হয় না। কত কিছু যে চোখের ছায়ায় নাচে, কিন্তু মনে করার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায়!

কত কন্ঠ যে কানে বাজতে গিয়ে ফিসফিস করে চুপ হয়ে যায়, তার হিসাব নাই… আমার কাছে যে ভীষণ প্রিয়, অন্য কারো কাছে সে হয়তো অখাদ্য। যাকে আমার প্রচন্ড ইন্টারেস্টিং মনে হয়, সে-ই হয়তো আরেকজনের মেমোরিতে খুব ট্র্যাডিশনাল বা বোরিং বা স্বার্থপর একটা মানুষ।

আবার নিজের স্মৃতির উপরও যে খুব ভরসা করা যায়, তা না। একেক বয়সে একেক স্মৃতির একেক রকম অর্থ হয়ে যায়।

কিন্তু দিনের শেষে ঐ স্মৃতি নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের যত প্রতিপত্তি।

লোকটার অভ্যাস ছিল নিজের জিভ কামড়ানো, অনেকটা মুদ্রাদোষের মতো। দেখলে মনে হতো জাবর কাটছে। কথায় হাল্কা যশোর অঞ্চলের টান ছিল। ‘অশীতিপর’ বললেই কেন যেন মনে হয় জির্ণশির্ণ কেউ; বাস্তবে আমার অশীতিপর দাদা ছিল ঠিক উল্টা। মোটা ফ্রেমের চশমা পড়তো। মোটাসোটা, মাঝারি উচ্চতার শ্যামলা একটা মানুষ। ভুড়ির জন্য শার্টের নিচের দিকের বোতামগুলি আটকানো যেতো না।

আমরা লন্ডনে থাকতে দাদা-দীদা আমাদের কাছে বেড়াতে এসেছিল। সেই সফরের বলতে গেলে আমার কিছুই মনে নাই, কিন্তু দাদা আমাকে বিশাল বড় একটা ললিপপ কিনে দিয়েছিল, সেটা মনে আছে। তখন খালি মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ললিপপ এটাই!

বহু বছর পর, দাদা ততদিনে মরে ভূত, আমি কানাডায়, মেয়ে আর টিনাকে নিয়ে বেড়াতে গেছি ভিক্টোরিয়ায়, মানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের রাজধানীতে। টিনা বললো, আমার জন্য বিভার টেইল কিনে আনবা কষ্ট করে?

কষ্ট বলতে তেমন কিছু না, গাড়িটা পার্কই করা, রাস্তার অন্যপাশ থেকে সেই ভাজা ডেজার্ট কিনে আনতে হবে। গেলাম; দাম দেয়ার পর দোকানের ছেলেটা বললো, পাঁচ মিনিট লাগবে বানাতে। আমি টিনাকে ইশারা দিলাম, একটু হেঁটে আসছি।

মোড় ঘুরেই দেখি একটা ক্যান্ডির দোকান। সেখানে রাজ্যের চকলেট, হাওয়াই মিঠাই, টফি, চুইংগাম… আর বিশাল বিশাল ললিপপ। ধা করে মনে পড়ে গেল সেইন্সবারিস-এ দাদার সাথে সেই ললিপপ কেনার কথা।

প্রথমে ভাবলাম, সবচেয়ে বড় সাইজেরটাই লীলার জন্য কিনবো। কিন্তু বছর তিনেকের একটা বাচ্চার জন্য একটু বেশি বেশি হয়ে যায়। তাই মাঝারি গোছের একটা রঙধনু রঙের ললিপপ আর দুইটা বিভার টেইল নিয়ে গাড়িতে ফিরলাম।

ললিপপ পেয়ে লীলার আনন্দটা কখনো ভুলবো না। আচ্ছা, দাদাও কি সেরকমই খুশি হয়েছিল ললিপপ হাতে আমার আনন্দ দেখে? এমনিতে সে ছিল চাপা স্বভাবের। তার উপর দাদা-সুলভ গাম্ভীর্য তো ছিলই। কিন্তু স্পষ্ট মনে পড়ে, ললিপপ কিনে সেইদিন দাদা-নাতি খিলখিল করে হেসেছিলাম।

লন্ডন থেকে ফিরে যখন দাদার সাথে আমার পুনঃপরিচয় হয়, তখন আমার বয়স পাঁচ, আর দাদা রিটায়ার্ড। আমি দেখলাম, গুরুগম্ভীর একটা বুড়া লোক, আমার সাথেও খুব একটা কথা-টথা বলছে না।

বিলেত-ফেরত আমাকে নিয়ে বাসার সবার সে কি মাতামাতি! দাদাও খুশি, কিন্তু তার প্রকাশটা অন্যরকম। হঠাৎ সে বললো, তোমাকে একটা ম্যাজিক দেখাই।

দাদার হাতে ছোট একটা প্লাস্টিকের বল ছিল, খুব সম্ভবত আমার ফুফাতো বোনের – ঐটা সে ঠাস করে গিলে ফেললো। আমি তো হতভম্ব। প্রথমত, বলটা কি সে সত্যিই গিলে ফেলেছে? দ্বিতীয়ত, বল গিলে ফেলা আবার কেমন ম্যাজিক? এতকিছু থাকতে প্লাস্টিকের বল গিলতে হবে কেন?

বললাম, শো মি হাউ ইউ ডিড ইট। কিন্তু দাদা বলে, নো ইটস ম্যাজিক।

তখন আমি বললাম, ওকে শো মি এগেন। এভাবে কয়েকবার একই ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত দাদার জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেল। দেখলাম, বলটা সে বগলের মধ্যে লুকিয়ে রাখছিল।

আহা! আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠি। দাদার মুখেও খিলখিল হাসি। ঐ যে সেইন্সবারিস থেকে বের হয়ে সে যেভাবে হেসেছিল, একদম সেইরকম।

ব্যস, আবার কানেকশন।


কিছুদিন আগেও একটা বিষয় নিয়ে আমার খুব আফসোস হতো। আমি আমার দাদার সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি, কিন্তু লীলা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত – তার দাদা-নানা দুইজনই হাজার হাজার মাইল দূরে থাকে।

এখন আর সেইরকম ভাবি না, কারণ সম্পর্ক দিয়ে সত্তার ফ্রিকোয়েন্সি মেলানো যায় না। যদি যেতই, তাহলে তো সব আত্মীয়ের সাথেই আত্মার সম্পর্ক হয়ে যেতো – যেটা একেবারেই অবাস্তব।

ঘন্টার পর ঘন্টা আমি-দাদা একসাথে বসে গল্প করতাম। দাদা-নাতি হিসাবে না, বরং কাছাকাছি বয়সের মানুষ যেভাবে গল্প করে, সেরকম। লন্ডনের আগে কি আমাদের কখনো দেখা হয়েছিল? দেশ ছাড়ার আগে দাদা পিরিচে কাপ দিয়ে ঠুনঠুন করে শব্দ করতো, আমাকে একটা প্লেন না কি যেন একটা খেলনা কিনে দিয়েছিল – সেসব অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে। বা হয়তো সেগুলি মা’র কাছ থেকে শোনা গল্পের ভিত্তিতে আমার ছিনাল স্মৃতির কল্পনা।

শৈশবের আগে কি কোথাও আমার দাদার সাথে দেখা হয়েছিল? বা মৃত্যুর পরে হবে? তখনো কি তার গায়ে সরিষার তেলের গন্ধ থাকবে? লোকটা গোসলের আগে সবসময় মাথায় সরিষার তেল মাখতো।

গোসলের ব্যাপারটার আসলে একটা সিকোয়েন্স ছিল; প্রথমে সে ‘এইইই বাবু’ বা ‘এইইই ইডা’ বলে হাঁক দিতো। (যাকে ডাকা হচ্ছে, তার নাম মনে করতে না পারায় এমন সম্বোধন।) তারপর হুকুম করতো, যা সরিষার তেল নিয়ে আয়, গোসল করবো। তেল চলে আসতো।

দাদা খালি গায়ে মাথায় তেল মাখতে মাখতে উঠে দাঁড়াতো। তারপর ঘাড়ে গামছা চাপিয়ে জোরে জোরে বলতো, বউমা, গোসলে গেলাম! (কেন তার সবকিছু এভাবে ঘোষণা করতে হতো, আল্লাহ মালুম।) মা শুনে হয়তো রান্নাঘর থেকে বলতো, আচ্ছা যান।

তারপর খোকাবাবু প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে খশখশ শব্দে বাথরুমমুখী হতেন।

(আমার দাদার নাম আসলেও খোকা ছিল। কিন্তু এই নামে কেউ তাকে ডাকলে রেগে যেত – ডাকনাম নাকি পার্সোনাল ব্যাপার।)


বড় হয়ে যে লোকটা ওয়াহাব সাহেব, বা চলতি ভাষায় ওহাব সাহেব হয়, শৈশবে তার মা তাকে ডাকতো খোকা বলে। গ্রামের লোকে বলতো খোকা মল্লিক।

বিরাট একান্নবর্তী পরিবার ছিল খোকা মল্লিকদের। টাকাপয়সা অবশ্য বেশি ছিল না, টেনেটুনেই সংসার চলতো। তার বাবা মারা গিয়েছিল অল্প বয়েসে। পারিবারিক ব্যবসা ছিল পিরানী।

সেইসব গল্প করতে করতে দাদা গদগদ হয়ে যেত।

– দাদা, সত্যি সত্যি কি আমরা ফকির ছিলাম?

– (গম্ভীরভাবে) ফকির হব কেন? পীর ছিলাম।

– আহা, মাইন্ড করো কেন। পীর-ফকির অর্থে বলছি।

– তোমার দুষ্টামি আমি ঠিকই ধরতে পারি।

– আচ্ছা, তুমি কি বড় পীর ছিলা?

– বড়ই বলতে পারো, তিরিশ হাজার মুরিদ ছিল আমার।

– যাহ্‌!

– সত্যি। আমার দাদার আরো অনেক বেশি মুরিদ ছিল। কমতে কমতে আমার বেলায় তিরিশ হাজারে ঠেকিছে।

– তখন তুমি কতো বড় ছিলা, দাদা?

– ফাইভে পড়তাম।

– …

– সত্যি, ক্লাস ফাইভে থাকতি এক মজলিশে দাওয়াত করে নিয়ে গেল। বুড়া লোকজন, সত্তর-আশি বছর বয়স, একেকজন অবস্থাপন্ন গৃহস্থ … তারা কান্নাকাটি করে আমাকে কদমবুসি করলো।

– তোমার অস্বস্তি লাগে নাই?

– তা তো লাগিইছে। খুবই লজ্জা পাইছি।

– গেছিলা কেন?

– পয়সার জন্য, আবার কি! বাসা থেকে পাঠাইছে।

– এইসবে যাওয়া বন্ধ হইলো কিভাবে?

– আমার ছোট চাচা খুব কট্টর ছিলেন, উনি বললেন এগুলি হারাম। আমিও না গিয়ে খুশি।

প্রতিদিন দাদা নামাজের পর “দোয়া গঞ্জল আরশ” পড়তো। একদিন আমি লক্ষ্য করলাম বইটায় বাংলা উচ্চারণ দেয়া আছে। বহুদিন ধরেই আমার কৌতূহল ছিল, দাদা কোরান শরীফ না পড়ে এই বই পড়ে কেন?

হঠাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেললাম। দাদার পড়া শেষ হলেই তাকে জেঁকে ধরলাম – তুমি তো আসলে আরবি পারো না!

দাদা কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললো, তা তো পারিই না। কিন্তু ফারসি পারি, সংস্কৃত ভুলে গেছি তাও পারি…

– হাংকিপাংকি কইরো না। আরবি পারো না, এটাই আসল কথা।

– হুম।

– এইটা কিভাবে সম্ভব হইলো? তুমি না এত বড় পীর ছিলা?

– ছিলাম তো। বড় না হইলেও, মোটামুটি।

– তাইলে তুমি আরবি জানো না, এটা কেম্নে হয়?

– তিরিশ হাজার মুরিদ থাকলি আরবি জানা লাগে না।

(যতদূর জানি, পীরানির সিরিয়ালে আমিই নেক্সট পীর।)


দাদার ছিল ন্যাচারাল ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি। হঠাৎ হঠাৎ তাকে দেখা যেত, অনেক পুরানো একটা রেজারে ব্লেড ভরে, গোল একটা আয়নার দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগে শেভ করছে।

একদিকে সে ছিল গম্ভীর স্বভাবের, আরেকদিকে হাঁকডাক করে বাসা মাথায় তুলে রাখতো। আমার সাথে খাতির থাকলেও ঠিকই ঝাড়ি দিত।

আমার ছোটফুফুকে অন্য সন্তানদের চেয়ে একটু বেশি স্নেহ করতো।

আমরা খেলতে গেলে লাঠি নিয়ে মাঝেমাঝে তেড়ে আসতো, বিশেষ করে কেউ জানালার গ্লাস ভেঙে ফেললে। রেগে গেলে দাদা ছিল ভয়ংকর – আমার ছোটবেলার এমন কোন বন্ধু নাই যে তার রুদ্ররূপ দেখে পালায় নাই।

সেই একই মানুষ প্রায়ই তার স্ত্রীর ছবির দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকতো।

আবার সেই মানুষটারই পাকিস্তানের প্রতি এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। ঐ জেনারেশনের আরো অনেককেই দেখেছি, তাই।

আমার ধারণা, এর কারণ রাজনৈতিক ক্লান্তি। ব্রিটিশ শাসনের তোড়জোড়, দুই-দুইটা বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ছাড় আন্দোলন, আরো কত আন্দোলন, অবশেষে দেশভাগ, না দেশভাগের পরও রক্তাক্ত সংঘর্ষ… এ পর্যন্ত এসে যুধিষ্ঠিরের মতো তাদের রথের চাকা মাটিতে নেমে গেছে।

মজার কথা হচ্ছে, পাকিস্তানকে নিয়ে দাদাকে স্মৃতি রোমন্থন করতে দেখেছি খুবই কম। ইন ফ্যাক্ট, এখন যখন চিন্তা করি, তখন মনে হয় দেশটার প্রতি তার আসলে একধরনের অভক্তি ছিল – যেটা সে হয়তো নিজেই কখনো বুঝতে পারে নাই।

– দাদা, গান্ধীকে চিনতা?

– গান্ধী না, বলতে হয়ত গান্ধীজি। চিনবো না কেন, কত মিটিঙে গেলাম তার সাথে!

– মানে পার্সোনালি তুমি তাকে সামনাসামনি দেখছো?

– (হাসি) কত!

– নেহেরুকে চিনতা?

– (উচ্ছ্বসিত) কেন চিনবো না? (হাসি-হাসি মুখে উৎফুল্ল ঘটনা-বিবরণ।)

– আচ্ছা, গান্ধী কেমন লোক ছিল? অনেকে তো বলে ব্যাটা আসলে শয়তান ছিল।

– হ্যা, এইটা তুমি কি বললে? (মৃদু চড়। যতদূর মনে পড়ে, এটাই দাদার হাতে আমার মার খাওয়ার একমাত্র ঘটনা।)

– (গাল ডলতে ডলতে) তুমি আমারে মারতে পারলা? তাও গান্ধীজির জন্য?

– তা মারবো না! উনি কি যেই সেই মানুষ, তুই তাকে ‘ব্যাটা’ কচ্ছিস? স্বয়ং রবি ঠাকুর উনার নাম দিছিলেন ‘মহাত্মা’।

– কিন্তু গান্ধীজি কি সত্যি ভালো লোক ছিল? নাকি রেইসিস্ট ছিল?

– কোন ভাবেই না। আমি নিজে স্বাক্ষী। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরে যদি আমি কাউকে মানি, সেটা উনাকে।

– জান দিয়ে দিতা গান্ধীর জন্য?

– অবশ্যই দিতাম, সেই সাথে পুরা সাবকন্টিনেন্টই উনার জন্য জান দিয়ে দিতো। উনি তো শেষে নিজেই জান দিলেন আমাদের জন্য… আহারে… আহা…

আরো কিছু ইমোশনাল কথা-টথার পর আবার জিজ্ঞেস করলাম – জিন্নাহকে চিনতা?

– কেন চিনবো না।

– একসাথে মিটিং-ফিটিং করতা?

– হ্যা, কত।

– তুমি এত বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষদের চিনলা কিভাবে?

– ঐ সময়টাই আসলে ঐরকম ছিল…


সাইড নোট: দাদার সাথে মোঃ রফি’র সাক্ষাতের কথা নিয়ে আগে একটা পোস্ট লিখেছি। আমার পিতামহ কোন পর্যায়ের সেলিব্রিটি ম্যাগনেট ছিল, সেটা বোঝাতে এখানে আরেকটা ঘটনা বলছি।

আমাদের বাসার কাছে সোনারগাঁ হোটেলের পেটের মধ্যে সোনালী ব্যাংক। সেখানে দাদার একটা একাউন্ট ছিল। আমাকে একদিন বললো, চলো দাদু, টাকাপয়সার কি অবস্থা দেখে আসি।

আমি পাত্তা দিলাম না, কারণ ঐ একাউন্টে কোন সোর্স থেকে টাকা যাচ্ছিল না। অর্থাৎ দাদা ব্যাংকে যেতে চাচ্ছে তার অল্পকিছু টাকায় কত ইন্টারেস্ট হলো, সেটা দেখার জন্য। হিসাব করে বলে দেয়া যায়, কিন্তু ঐটায় হবে না – নিজ চোখে দেখে আসতে হবে।

যেটার কোন মানেই হয় না। বুঝলাম, বুড়া আসলে বোরড্‌। আর আমার যাবতীয় উত্তেজনা তখন আসন্ন একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়ে। ইন্ডিয়া টিম ঢাকায় চলে এসেছে, পাকিস্তানও যেকোন সময় চলে আসবে।

দাদা নিজেই গেল। কয়েক ঘন্টা পর ফিরে এসে বললো – খেলা হচ্ছে, জানিস?

আমি বললাম – কি, ক্রিকেট খেলার কথা বলতেছে? শুরু হয় নাই তো, হবে।

– হ্যা, পরশু ইন্ডিয়ার ম্যাচ।

আমি নড়েচড়ে বসলাম। দাদা হঠাৎ ক্রিকেটের কথা বলতেছে কেন? সে তো খেলা-টেলা দেখে না।

– তুমি কৈ শুনলা?

– লবিতে একটা ছেলের সাথে দেখা হলো, সে বললো।

– আচ্ছা?

– হ্যা, ইয়াং ম্যান। কোকড়া চুল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া? বললো ইয়েস, আই অ্যাম ফ্রম বম্বে। তখন আমি বললাম, আই ওয়াজ ইন বম্বে টু ফর মেন ইয়ার্স। তখন তার সাথে খানিকক্ষণ গল্প করলাম। ভালো ছেলে, মারাঠি। ওর বাসা যেখানে সেই জায়গাও আমি চিনি।

– তার নাম কি?

– … জিজ্ঞেস করলাম, ডু ইউ প্লে ওয়েল? তো শুনে বললো, আ বিট। আই ওয়াজ রিসেন্টলি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। তখন জিজ্ঞেস করলাম আর ইউ আ ব্যাটসম্যান অর আ বোলার? বললো আই ক্যান ডু বোথ, বাট মোস্টলি…

আমি দাদার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম – দাদা! নাম কি বলসে বলো, নাম!

- হ্যা বলতিছি তো! অস্থির হৈস কেন। বললো মাই নেম ইস সাচিন..

আমি সঙ্গে সঙ্গে কাপড়চোপড় পড়ে কাঁঠাল বাগান থেকে এক দৌঁড়ে সোনারগাঁ হোটেলের লবিতে গিয়ে ঢুকলাম। কিন্তু শচীন টেন্ডুলকার ততক্ষণে ভেতরে চলে গেছেন।


– দাদা, জিন্নাহ কেমন লোক ছিল বল্লা না?

– …ভালো ছিল। পলিটিশিয়ান ছিল।

– এর মানে কি? গান্ধীজির লেভেলে ভালো, নাকি নেহেরুর লেভেলে?

– কোনটাই না। সে পলিটিশিয়ান ছিল।

– গান্ধীর কথা বাদ দিলাম, নেহেরুও তো পলিটিশিয়ান ছিল?

– না… নেহেরু ইন্ডিয়ার স্বার্থেই ইন্ডিয়া চাইছে। জিন্নাহ আসলে মুসলমানদের স্বার্থে পাকিস্তান চায় নাই। চাইছে নিজের স্বার্থে।

– এইটা তুমি কেম্নে বুঝলা? তুমি তো তার মনের মধ্যে বসে ছিলা না।

– (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) বুঝছি তার বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে। তার ইগো খুব বেশি ছিল।

– (আমিও কিছুক্ষণ চুপ থেকে) তাহলে তাকে ফলো করতে গেলা কেন?

– তখন আসলে সময়টাই ঐরকম ছিল…

জহির রায়হানের একটা বিখ্যাত ছোটগল্প আছে, “সময়ের প্রয়োজনে”। দাদার সময়-লজিকের কথা ভাবলে প্রায়ই আমার সেই গল্পটার কথা মনে পড়ে যায়।

কেন সময়টা ঐরকম ছিল, সেটার উত্তরে দাদা ঘুরেফিরে একই কথা বলতো:

– হিন্দুরা লোক ভালো না, মোসলমানদের অনেক কষ্ট দিছে।

অথবা বলতো:

– আতরকে (দাদার ছোটভাই, আতাউর) ওর বেস্ট ফ্রেন্ড বোমা মারিছিল রায়টের সময়। সেই ব্যাটা হিন্দু।

এইসব। বহু বছর ধরে এই টাইপ কথাবার্তা শোনার পর একদিন আমার খেয়াল হলো, দাদার হিন্দু-বিদ্বেষে ফাঁক-ফোকড় আছে। গান্ধী ভালো, রবীন্দ্রনাথ ভালো, সুভাষ বোস ভালো (তবে নাস্তিক, এটা ভালো না)। কাহিনী কি?

(বঙ্কিম অবশ্য খারাপ, কিন্তু সেটা সে মুসলিম বৃত্তিতে পড়েও মুসলমানদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কারণে।)

দেখা গেল, ‘হিন্দু’ বলতে সে আসলে কোলকাতার হিন্দুদেরকে বুঝাচ্ছে। আগেই শুনেছিলাম, দাদার কোলকাতায় থাকার এক্সপিরিয়েন্স খুব একটা ভালো ছিল না। স্যার আশুতোষ মুখার্জির পাশের বাসায় দাদা ভাড়া থাকতো (তার ব্যাপারেও তার ইম্প্রেশন খুব একটা ভালো ছিল না)।

– তাইলে বোম্বের হিন্দুরা ভালো?

– অবশ্যই। ইন জেনারেল তারা মোসলমানদের চেয়েও ভালো। মোসলমানরা অলস।

– আর আমাদের দেশের হিন্দুরা?

– আমাদের দেশের কথাই তো বলতেছি।

– আহা দাদা, আমি বাংলাদেশ মিন করতেছি। বোম্বে তো এখন ইন্ডিয়ায়।

– ও আমাগের দেশের হিন্দুরা তো আমাগের মতোই, ওগেরে কে খারাপ কতি যাবে...


ইন্টারের পর একটা অপারেশন করাতে কোলকাতায় গিয়েছিলাম। অপারেশনের আগের দিন আমি, বাবা, মা, মুসা ফুফা আর উনার এক ভাইপো – সবাই অলস মুডে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

বেশ গরম ছিল সেইদিন। ফুফা পানি খাবেন, কিন্তু আশেপাশের কোন দোকানে পানির বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে ফুফা র‌্যান্ডম দোকানে দোকানে গিয়ে বলতে শুরু করেন – দাদা, একটু জল হবে?

আশ্চর্যজনকভাবে কোন দোকানেই জল নাই। এটা কিভাবে সম্ভব? যাই হোক, একটা দোকানদার অবশেষে জল দিতে রাজি হলো। কিন্তু আমাদেরকে দাঁড়িয়ে রাখলো অনেকক্ষণ।

আমরা তাড়া দেয়ায় দোকানদারটা লজ্জিত ভঙ্গিতে বললো – মাটির ঘড়া আনতে দেরি হচ্ছে দাদা, আপনাদেরকে আমাদের গেলাসে জল দিলে যে জাত থাকবে না…

সেই দাদার কথা শুনে ঝট করে নিজের দাদার চেহারাটা মনে পড়ে গেল।

তার সাথে গল্পে গল্পে আমি যে বোম্বে, মানে আজকের মুম্বাই শহরে কত হেঁটে বেড়িয়েছি, তার হিসাব নাই। জুহু বিচ, এই বিচ, সেই বিচ। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, মেরিন ড্রাইভ, জিপি অফিস। বান্দ্রা, চৌপট্টি, দরগাহ, ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস… আরো কত কি!

সেই বিশাল শহরের নাড়িনক্ষত্র শেষ বয়েসেও দাদার মনে ছিল। বোম্বে-স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে তার চোখের তারায় যৌবন ঝিলিক দিয়ে উঠতো। ঢাকার প্রতি তার ইম্প্রেশন ছিল খুবই খারাপ – বলতো, এইটা একটা শহর হৈল! বস্তি একটা। কোথায় বোম্বে, আর কোথায় ঢাকা!

শুনে আমার রাগ হতো, মাঝেমধ্যে আমাদের ঝগড়াও লেগে যেত।

মাঝেমধ্যে দাদা অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলতো।

হঠাৎ একদিন খুব ইমোশনাল হয়ে বললো, তুই-ই আমার বংশ, বুঝলি! আমি হাই তুলে বললাম – দরকার নাই বাবা, যেই ভেজাইল্লা ফ্যামিলি!

– আহা এমন করিস কেন! কত ফিলিংস নিয়ে কথাটা বলতিছি!

– বুঝলাম, কিন্তু কথাটার মানে কী? আর কেউ না, শুধু আমিই তোমার বংশ?

– হু।

– কি যে বলো না বলো, দাদা। একটু এক্সপ্লেইন করবা?

- (চুপ।)


আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন সরদার জয়েনউদ্দীন। আমার শৈশবের বেস্ট ফ্রেন্ড নিহানের নানা।

আমি ডাকতাম সরদার নানা।

দাদা আর সরদার নানা এলাকায় সমাজসেবামূলক কিছু কাজটাজ করতেন। পাড়ার আরো কিছু সিনিয়ার লোকজনের সাথে তাদের একটা চা-চক্র ছিল, নিয়মিত আড্ডা হতো। আমরা বলতাম “দাদাদের পার্টি”।

দাদা আর সরদার নানার সম্পর্কটা ছিল বেশ অদ্ভুত। একদিন নানার বাসায় গেলাম (তখন প্রতিদিনই যেতাম)। হঠাৎ উনি আমাকে বললেন – এই শোন, তোমার দাদাকে গিয়ে বলবা, সে লোক ভালো না।

আমার গায়ে তখনো বিলেতের গন্ধ। আমি ভয়াবহ টেনশনে পড়ে গেলাম। নিহানকে বললাম – বাট হোয়াই? কেন ও আমার দাদা সম্পর্ক এটা বললো? দাদা তো একটা গুড গাই।

নিহান সন্ন্যাসীর মতো হাত উঁচু করে বললো – উনারা এরকম করেই, এইসব নিয়ে চিন্তা কোরো না।

– আমার কি দাদাকে কথাটা বলা উচিৎ?

– না কোন দরকার নাই।

আমি তবু বাসায় গিয়ে দাদাকে ঘটনাটা রিপোর্ট করলাম। শুনেই দাদা হুংকার দিলো, তুমিও তাকে গিয়ে বলবা, সে একটা ছোটলোক। আমি অবশ্য কথাটা সরদার নানাকে আর বলি নাই।

আরেকদিনের ঘটনা। কি কারণে যেন তাদের দুইজনের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেল।

‘ঝগড়া’ মানে পাশের বাসা থেকে সরদার নানার রাগী কন্ঠ শোনা যাচ্ছে, আর এদিকে দাদাও যুদ্ধাংদেহী মেজাজে। একটুপর দাদা বাসা থেকে বের হয়ে গেল। ঐদিক থেকে সরদার নানাকেও ঘর থেকে বের হতে শুনলাম।

আমি তো চরম উত্তেজিত। অবশেষে মিমাংসা হবে, কে গুড গাই। কিন্তু কিভাবে হবে? শুধু ঝগড়া করে? নাকি দুই বুড়া তলোয়ারের মতো লাঠি উঁচিয়ে মারামারি করবে?

আমি বারান্দার সাথে আঠা হয়ে থাকলাম। মিনিট পাঁচেক চলে গেল, কিন্তু কোন ঝগড়ার আওয়াজ নাই। আশ্চর্য?

টুপ করে বাসা থেকে বের হয়ে দেয়াল বেয়ে আমি সানশেডে উঠে গেলাম। রণক্ষেত্র থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে গিয়ে দেখি, একজন উত্তরমুখী, আরেকজন দক্ষিনমুখী হয়ে নিচু গলায় কথা বলছে। সেই কথা বলায় কোন ঝগড়া নাই, এমন কি গাম্ভীর্যও নাই। একদম নর্মাল আলোচনা, শুধু দুইজন দুইদিকে তাকিয়ে।

আমি হতাশ হয়ে বাসায় ফিরে আসলাম। একটু পরে দাদা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে খুশি খুশি গলায় বলে, খুব সাইজ করিছি!

আমি বললাম, হ্যা, গুল মারার আর জায়গা পাও না!


তারপর একদিন সরদার নানা মারা গেলেন।

শুনে দাদা খালি নামাজ পড়ে, আর একটু পরপর “দোয়া গঞ্জল আরশ” পড়তে পড়তে চোখ মোছে। এক পর্যায়ে আমি বিরক্ত হয়ে বললাম – বেঁচে থাকতে লোকটাকে পচা কথা বল্লা, হোয়াই আর ইউ ক্রায়িং নাউ?

দাদা রেগে বলে – কক্ষনো না! আমি কবে খারাপ কথা বলিছি তার সম্পর্কে?

– তুমি তাকে ‘ছোটলোক’ বলো নাই?

– (নাটকীয়ভাবে শান্ত হয়ে) তা তো বলিইছি।

– তাহলে? ‘ছোটলোক’ তো খারাপ কথা।

– ধুর, এদেশে তো সবাই ছোটলোক! তুমি, আমি, সবাই এই দেশে ছোটলোক।

– তাহলে কান্তেছো কেন?

– কান্দবো না? ছোটলোক হলি কি হবি, বন্ধু ছিল তো…

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, দাদার গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। অশ্রুধারায় “দোয়া গঞ্জল আরশ” ভিজে যাচ্ছে।

(এম্নিতে দাদা সরদার নানাকে ডাকতেন “সরদার সাহেব” বলে। এখন বুঝি, এক রকম সমীহ ছিল ডাকটার মধ্যে।)


সরদার নানাকে নিয়ে সাইডনোট: আমার দুর্ভাগ্য, আমি অনেক ছোট থাকতেই উনি মারা গিয়েছিলেন। বেঁচে থাকলে অবশ্যই আমি তার কাছে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করতাম।

বাংলাদেশে গ্রন্থমেলা জিনিসটা সরদার জয়েনউদ্দীনই প্রবর্তন করেছিলেন। সোজা বাংলায়, এই মানুষটা না থাকলে একুশের বইমেলা হতো না। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। টিভিতে তার লেখা গল্প নিয়ে সিনেমা দেখেছি। খুব সম্ভবত কোন একটা জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকও ছিলেন (বা খুব সিনিয়র পোস্টে ছিলেন; উনাদের বাসায় ফ্রি পেপার আসতো)।

কোন আশ্চর্য কারণে এই অসম্ভব কৃতী মানুষটাকে নিয়ে এখন বলতে গেলে কেউই লিখে-টিখে না। ঐ বয়সে অবশ্য আমার কাছে উনার পরিচয় ছিল স্রেফ নিহানের গম্ভীর নানা হিসাবে, যে কিনা খুব সম্ভবত আমার দাদার শত্রু, অতএব আমারও শত্রুপক্ষ।

অতএব আমি তাকে খুব একটা ঘাটাতে যেতাম না। একদিন উনাদের বাসায় গিয়ে দেখি, সরদার নানা অনেক বইপত্র ছিটিয়ে গভীর মনোযোগে লেখালেখি করছেন। আমি ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বই দেখতে থাকি।

হঠাৎ আমাকে খেয়াল করে উনি বলে উঠলেন – তুমি কে? কখন আসলে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি নিহানের ফ্রেন্ড। আমাকে চিন্তে পারছো না?

– ও তাই!

– হু।

– কী নাম যেন তোমার?

– অভি… তুমি কি আসলেই আমাকে চিনতে পারছো না?

– আমার আসলে লিখতে বসলে কিছু মাথায় থাকে না, কিছু মনে করো না।

– কি লিখছো?

ঝাড়া পনের মিনিট ধরে উনি আমাকে তার নতুন উপন্যাসের প্লট বর্ণনা করলেন। এক জায়গায় আটকে যাচ্ছেন, চরিত্রগুলি নিয়ে কি করবেন বুঝতে পারছেন না, সেটাও বললেন।

এদিকে নিহান আমাকে দরজার কাছ থেকে বারবার খেলতে ডাকছে। আমি নানাকে বললাম – গুড লাক, আমি নিহানের সাথে খেলতে গেলাম।

উনি ‘আচ্ছা এসো’ বলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার লেখায় ডুবে গেলেন। আমি আজো জানি না উনি কি আমার সাথে দুষ্টুমি করছিলেন, নাকি সিরিয়াস ছিলেন! যেটাই হোক – উনাকে দেখে আমার সবসময়ই মনে হতো, গাম্ভীর্যের আড়ালে মানুষটা আসলে অন্যমনস্ক। সারাক্ষণ তার মস্তিষ্কে জোনাকিরা খেলা করে।

হয়তো ঐদিন আমি সত্যি সত্যি জোনাকিগুলির আস্তানায় একবার ঢুঁ মারতে পেরেছিলাম।

অনেক বছর পর একদিন শেভ করতে গিয়ে আয়নায় নিজের চোখে সেরকম জোনাকি দেখে চমকে উঠলাম। গাল কেটে রক্ত পড়তে শুরু করলো, কিন্তু দেখে ভালো লাগলো, উত্তরাধিকারী হতে হলে রক্তসম্পর্কের কেউ হওয়া লাগে না।


সাধারণভাবে বাংলাদেশ নামক দেশটার প্রতি দাদার আগ্রহ জন্মানো শুরু করে ’৮৮ সালে। তার আগে পর্যন্ত সে ছিল “ফ্যামিলির সবাই এইদেশে, তাই ফিরে হলো” টাইপ চিন্তা-চেতনার লোক।

বন্যায় কাঁঠাল বাগান প্রায় ডুবে গিয়েছিল। আমাদের বাসার গেট দিয়ে পানি ঢুকবে ঢুকবে, এমন ভাব তখন। একদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আমি আর দাদা বারান্দায় বসে আছি, এমন সময়ে একটা জিপ এসে ঠাস করে বাসার গেটের সাথে ধাক্কা খেলো।

দাদা তো রেগে অস্থির। দোতলার গ্রিল ধরে সে এমনভাবে টানাটানি করতে শুরু করলো, যেন পারলে এক্ষুনি লাফ দিয়ে নিচে চলে যায় ঝগড়া করতে। রেগেমেগে সে জিপের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে থাকলো।

কয়েক মিনিট পর ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে বের হয়ে সাফারি পরা একটা লোক “চাচা অনেক স্যরি, বন্যা দেখতে এসেছি, ড্রাইভার কন্ট্রোল করতে পারেনি” ইত্যাদি বলে অনেকবার হাত জোড় করে মাফ চাইলো।

দাদা তবুও বিস্ফোরণরত। হঠাৎ লোকটাকে চিনতে পেরে আমি আঁতকে উঠে বললাম – দাদা, থামো থামো, এটা এরশাদ!

– কোন্‌ এরশাদ? আমাদের রংমিস্তিরি?

– আরে না, রাষ্ট্রপতি এরশাদ!

স্বৈরশাসকের ক্ষমাপ্রার্থনায় বিগলিত হয়ে দাদা সিদ্ধান্ত নেয় – নাহ, দেশটার সবাই হয়তো ছোটলোক না। তারপর থেকে রাজনৈতিক খবরের ব্যাপারে তার কিছুটা আগ্রহ দেখা যায়।

এরশাদ পতনের পর তার কিছুটা মন খারাপ হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, সারাক্ষণ খবরের কাগজে ডুবে থাকার সুবাদে দাদার লাঙল-প্রীতি লোপ পায়। তার নতুন অবসেশন শুরু হয় শেখ মুজিবকে নিয়ে।

মারা যাওয়ার আগে সে আওয়ামী লীগের এমনই ফ্যান হয়ে গিয়েছিল, যে শেখ মুজিবকে আমি “বঙ্গবন্ধু” না বললে রীতিমত খেপে যেত। আমাকে জাতির জনকের আত্মজীবনী জোগাড় করে দিতে বলেছিল। সেটা আর হয়ে উঠেনি।

মুজিব-ঝড়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন পুরাপুরি বদলে যায়। দাদা বলতে শুরু করে, বাংলাদেশ হওয়াতে আমরা বেঁচে গেছি। শেখ সাহেব না থাকলি এই জাতির কোন আশা ছিল?...

আমি প্রায়ই ঠাট্টা করে বলতাম, অবশেষে তুমি স্বাধীন হৈলা দাদা!

দাদা তখন উল্টা ঝামটা দিতো – তা স্বাধীন হওয়াটাই তো ভালো, নাকি?


দাদার ইচ্ছাই শেষপর্যন্ত সত্যি হয়। আমার হাতেই, মানে আমার হাতের উপরেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

হাসপাতালে গিয়ে আমি দেখলাম, সেন্স নাই। সাইড হয়ে শোয়া। শুধু শ্বাস নিচ্ছে।

পাশে বসতে বসতে কেন যেন মনে হলো, দাদা বুঝতে পেরেছে আমি এসেছি। আমি তার গায়ে একটু হাত বুলালাম। নার্সের সাথে কথা বললাম। পেশেন্টের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ, এসব কথা শুনতে শুনতেই হঠাৎ টের পেলাম, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাদা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল। সেই দীর্ঘশ্বাসে একটুও কষ্ট ছিল না। বরং হয়তো খানিকটা স্বস্তি ছিল।

কত বছর হয়ে গেছে? ১৯? নাকি ২০? এই তো সেইদিন ঢাকায় করোনা ছড়াতে শুরু করেছে শুনে প্রথমেই যে কথাটা মনে হলো, সেটা হচ্ছে – করোনা সম্পর্কে দাদার মতামত কি? সে ঠিকঠাক আছে তো? তখন মনে পড়লো, দাদা তো মারা গেছে সেই কতকাল আগে!

শৈশবের আগে কি মানুষটার সাথে আমার দেখা হয়েছিল? বা মৃত্যুর পরে হবে? আমি জানি না, কিন্তু জীবনে যখনই আমি এরকম পরিস্থিতিতে পড়ি তখন কল্পনার আশ্রয় নিই।

জীবনে ভালোভাবে চললে মরার পরে চৌদ্দগুষ্টির সাথে আবার সুখে শান্তিতে বাস করতে পারবো – এমন পরকাল আমার কাছে বোরিং লাগে। পরকাল জিনিসটা বরং হওয়া উচিৎ এডভেঞ্চারের মতো। যে যার মতো ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়বো। জীবনের যেই স্বাদ ইহকালে নেয়া হয়নি, সেই স্বাদ নিতে।

সৃষ্টিকর্তার সায় থাকলে তো যে-কোন কিছুই সম্ভব! ঐরকম একটা পরকালে আমি ঠিকই দাদাকে খুঁজে নিবো।

দেখবো, আমি একটা মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি। প্রচন্ড গরমেও আমার পরনে কালো ওভারকোট, চোখে সানগ্লাস। পরকাল বলে গরমে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। ভাব নেয়ার জন্য কথাও বলবো একটু শুদ্ধ করে।

জায়গাটা একটা গ্রাম। কিছু কুঁড়েঘর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মানুষজন ধান কাটছে। আমাকে দেখে তারা হা করে তাকায়, কারণ এরকম চিজ তারা আগে কখনো দেখে নাই।

আমি অবশ্য আগেভাগেই জানি দাদাকে কোন ক্ষেতে গেলে পাওয়া যাবে। এটাও জানি, দাদার মধ্যে একটা শিশু লুকিয়ে ছিল, অতএব এই জগতে সে বড়জোর কিশোর।

হলোও তাই। আমি কাছে গিয়ে ডাকি – খোকা মল্লিক, এদিকে আসো।

দাদার হাতে কাঁচি। আশেপাশের লোকজন নানা বয়সের, তারা সন্দিগ্ধভাবে আমাকে দেখতে থাকে। একজন ঝাড়ি দেয়ার মতো করে আমাকে জিজ্ঞেস করে – কে আপনি?

– আমি ওকে নিতে এসেছি।

– খোকা, তুই কোথাও যাবিনে। কে আপনি, কোথ্থেকে আসতেছেন?

আমি এই মাতবর গোছের লোকটাকা দুই পয়সার পাত্তাও দিবো না। বরঞ্চ তাকে পাশ কাটিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াবো আমার দাদার সামনে।

বলবো – খোকা মল্লিক, আমি বহু দূর থেকে হেঁটে এসেছি। আগের জীবনে আমাদের পরিচয় ছিল, কিন্তু বিস্মৃতির জল খেয়ে সে-কথা তোমার মনে নাই। তুমি আসলে খুব বংশীয় লোক। ধান কাটার জন্য তোমার জন্ম হয় নাই। ছাড়ো এসব, আমার সাথে চলো, এডভেঞ্চারে যাই।

পাশ থেকে লোকজন ধমকাধমকি করবে – থামেন আপনি, পাচারকারী, ইত্যাদি। আমি জানি দাদা অল্প বয়সে একটু একটু ভীতু ছিল, তাই সে বলে উঠবে – কিন্তু আপনি কে, আমি তো ঠিক চিনলাম না…

আমি বলবো, অসুবিধা নাই, তোমাকে আমার চিনতে ভুল হয় নাই।

এর মধ্যে আশেপাশের লোকজন আমাকে ধাক্কাধাক্কি শুরু করবে। কিন্তু আমিও এসবকিছু জেনেই এসেছি।

তখন আমি আমার তুরুপের তাশটা খেলবো। দাদার কানে কানে শুধু একবার বলবো – বোম্বে যাবা খোকা মল্লিক, বোম্বে?

তারপর মেঠোপথ ধরে আবার হাঁটা শুরু করবো। কোন এক মুরুব্বি আমাকে খিস্তি গালি দিয়ে হয়তো বলে উঠবে – যান যান, আর যেন এইখানে না দেখি!

তাতে আমার কিছু আসবে-যাবে না। আমি জানি, এই তল্লাটে আর ফিরছি না।

সিনা টান করে আমি হাঁটতে থাকবো। এক সময় হাল্কা বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। আমার সানগ্লাস আর্দ্র হয়, কাদার রঙতুলিতে জুতায় নানারকম ছোপ পড়ে। একটু পরই শোনা যায় পেছন থেকে খশখস শব্দে পরিচিত পদধ্বনি এগিয়ে আসছে।

আগেই জানতাম সে বোম্বের টান উপেক্ষা করতে পারবে না।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

[ সমাপ্ত ]


পিতামহ · ২ পর্ব

পরের পর্বএটিই শেষ পর্ব
সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন