পর্ব ২৪
স্মৃতিচারণ · · ৬ মিনিটের পাঠ

হঠাৎ দেখি, একটা কালো-সাদা-খয়েরি ছোপঅলা, মোটাসোটা লেজ ফোলা বিড়াল আমাদের সোফার পা ধরে মানুষের মতো দুই পায়ে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখ-মুখ সিরিয়াস। জিমে exercise শুরু করার আগে লোকজন যেভাবে স্ট্রেচিং করে, কিছুক্ষণ সে ঐভাবে স্ট্রেচিং করলো। তারপর অখন্ড মনোযোগে সোফার পা খামচাতে শুরু করে।
আমার সাথে চোখাচোখি হওয়ায় বিড়ালটা যেই লুকটা দিলো তার অর্থ, কী দ্যাখো?
যেহেতু তার সাথে আমার প্রায় টেলিপ্যাথিক কানেকশন ছিল, আমি মাথা নেড়ে বুঝালাম – কিছু দেখি না, এমনি তাকিয়ে আছি।
খামচাতে খামচাতে সে তখন চোখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু ততক্ষণে তার সেই নিবিষ্ট, নীলাভ-সবুজ দৃষ্টি আমার মনে গেঁথে গেছে।
এত বছর পর আজ সন্ধ্যায় আমি অবাক হয়ে দেখি, লীলার চোখে অবিকল সেই দৃষ্টিটা খিলখিল করে ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে।
জীবন কি তাহলে ইলাস্টিকের মতো? টান দিলেই অতীত জিনিসটা ভবিষ্যৎ হয়ে যায়?
সেই ইলাস্টিকের দড়িটা কার হাতে?
কিন্তু আমি আবারও ফাস্ট-ফরোয়ার্ড করে ফেলেছি। এখনো সেই বিড়ালটা কাঁঠাল বাগানে এসেই পৌঁছেনি। এইতো, এইমাত্র আমি আবিষ্কার করলাম, আমার দাদার ছোটবেলার নাম খোকা। আমি তাকে সেই নামে ডাকতে চাই, কিন্তু সে কিছুতেই রাজি না।
‘না! ঐটা আমার ডাক নাম। ডাক নামে ডাকা যাবে না।‘
‘What’s a ডাক নাম?‘
‘ডাক নাম means… pet name.’
‘Pet name? But you’re not a pet.’ তারপর সন্দিগ্ধভাবে যোগ করি, ‘Were you a pet when you were little?‘
(আফটার অল, কিছুই বলা যায় না – বুড়া মানুষদেরও যে ডাকনাম থাকে, কে জানতো!)
‘না, pet name না… nickname.’
‘Oh.’ এবার ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়। ‘What does it mean?’
‘What does what mean? খোকা?‘
‘হ্যা।‘
‘It means baby.’
আমি ফিক করে হেসে ফেলি। ‘You’re not a baby!’
বুড়া মানুষটা হাসে না। ‘Yes, but I was a baby when I was little. That’s when my mother gave me that name.’
‘She must have loved you a lot.’
‘Yes, she did.’
‘Well, I love you too. Can I call খোকা then?’
‘না। প্রশ্নই উঠে না।‘
আমি অবাক হয়ে বলি, ‘কেন?‘
‘I don’t want যে রাস্তার লোক শুনবে আমাকে ডাকতেছে, এই যে খোকা সাহেব, খোকা সাহেব…‘
‘But it’s your name.’
‘তাতে কী? বললাম না, খোকা মানে baby. তোমাকে যদি কেউ baby ডাকে তোমার কেমন লাগবে?‘
নেগোসিয়েশনের এই পর্যায়ে আমি একটা বিশাল ভুল করি – আমি আবারও হেসে ফেলি। দাদা তখন আরো গম্ভীর হয়ে বলে, ‘Anyway, ডাকনাম পার্সোনাল ব্যাপার। চাইলেই তুমি আমাকে আমার ডাকনাম ধরে ডাকতে পারো না।‘
‘But...’
‘No more ifs or buts. এখন আসো, অন্য কথা বলো।’
এরকমই ছিল মানুষটা। সাধারণত বন্ধুর মতো, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে একগুঁয়ে। তার জেনারেশনের আরো অনেককেই দেখেছি, একই রকম।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, দাদার জেনারেশনের কাছে তমিজ জিনিসটার অনেক গুরুত্ব ছিল। মুরুব্বিদের ডাকনাম ধরে ডাকাডাকি করার আবদার তমিজের বাজারে নিউক্লিয়ার বোমা ফাটানোর মতো ব্যাপার।
কৈশোরেই দাদা গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিল। চৌগাছির লোকজন তাকে চিনতো খোকা মল্লিক নামে।
নামটা ভয়াবহ কনফিউজিং, কারণ, যতদূর জানি, ঐ আমলে আমাদের ফ্যামিলির কারো নামের শেষে ‘মল্লিক‘ ছিল না (আগেই বলেছি আমাদের বংশে লাস্ট নেমের রেওয়াজ নাই।) তার উপর ‘খোকা‘ শুনলেই মনে হয় বাসার সবচেয়ে জুনিয়র মানুষ – সেটাও না, দাদা ভাইদের সিরিয়ালে মেজ। তার জীবনের বড় একটা অংশ – হয়তো সবচেয়ে বড় অংশটাই – কেটেছে কলকাতা, বোম্বে, করাচির মতো শহরগুলোতে। প্রফেশনাল জীবনে বহু কিছু ট্রাই করে সে অবশেষে স্থিত হয় এয়ারলাইন্সের চাকরিতে। সেই সুবাদে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিরন্তর ছুটাছুটি।
ঐ ছুটোছুটিটুকু বাদ দিলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সে পুরাপুরিভাবে ঢাকায়। নিজের মা মারা যাওয়ার পর সে কখনো দেশের বাড়িতে গেছে – আমার মনে হয় না। জননীর শেষকৃত্য উপলক্ষেই হয়তো তার শেষবারের মতো চৌগাছি যাওয়া।
কিন্তু দাদা গ্রাম ছাড়লেও গ্রাম তাকে ছাড়তে পারেনি। তার আশেপাশে সবসময় চৌগাছির একটা আবেশ লেগে থাকতো।
গোসল করতে যাওয়ার আগে যে মানুষটা মাথায় সর্ষের তেল মেখে, লুঙ্গি আর স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে খালি গায়ে ছপছপ শব্দ করতে করতে হেঁটে যেত – তাকে আর যাই হোক, জর্জ দ্য ফিফথের সাথে হ্যান্ডশেক করা, গান্ধীর সাথে মিটিং-মিছিল করা, ফিটফাট বড় অফিসার টাইপ পাবলিক বলে মনে হতো না।
একটু ঘরোয়া পরিবেশ পেলেই দাদার ভাষায় পূর্বপুরুষের আত্মার মতো যশোর অঞ্চলের অ্যাক্সেন্ট ভর করতো। বাড়ির কারো নাম মনে করতে না পারলে ‘অমুক‘ বা ‘তমুক‘ এর বদলে বলতো, ‘ঐ, ইডা!‘ কাজের মেয়ের নাম ভুলে গেলে হাঁক দিতো, ‘ঐ ছুড়িইইই!‘
প্রথমবার সেই হাঁক শুনে আমি দৌড়ে রান্নাঘর থেকে একটা বাটার নাইফ এনে দিয়েছিলাম।
আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কাঁঠাল বাগানের বাড়িটাকে ঘিরে একটা মিনি চৌগাছি বিচরণ করতো।
মাঝেমধ্যেই দেশ থেকে কেউ না কেউ দাদার সাথে দেখা করার জন্য হাজির হোতো। আমাদের বাসায় যারা কাজ করতো, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল চৌগাছির।
পাশেই ছিল হাসান দাদার বাড়ি। হাসান দাদা আমাদের চৌগাছির আত্মীয়। এত বছর পর তার কথা বলতে গেলে আমার মনেই নেই। দাদা মাছ ধরতে ভালোবাসতেন; ধানমন্ডি লেকের পাড়ে শৌখিন মৎস্যশিকারীদের ক্লাব বা এরকম একটা কিছু ছিল, উনি সেটার সাথে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল, আমাদের পাড়ার খাঁন হাসান স্কুলের স্থপতি আর হাসান দাদা একই লোক।
একদিন আমাদের দুই বাসার মাঝে চুলের সিঁথির মতো সরু পথটায় তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। স্কুল দিয়ে যে উনি কত ভালো একটা কাজ করেছেন, এডুকেশন জিনিসটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট – এসব গদগদ গলায় বললাম।
হাসান দাদা হাসিমুখে বললেন – ‘না, স্কুল যে দিছে সে আমি না, আরেক লোক।‘
আমি সরু চোখে তাকে এ বিষয়ে কিছুক্ষণ জেরা করে ব্যাপারটা শিওর হলাম। উনি খুব উৎসাহ নিয়ে স্কুল-বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন।
ছয় বছরের আমি সেই উৎসাহে পানি ঢেলে বুদ্ধি দিলাম, ‘তুমিও তাহলে একটা স্কুল স্টার্ট করো।‘
‘কেন? একটা স্কুল তো আছে!‘
আমি গম্ভীরভাবে বুঝালাম, ‘Because হাসান নামের লোকদের কম্পিটিশনে তুমি পিছায়ে আছো। অন্য হাসান লোকটা একটা স্কুল দিয়ে ফেলেছে। তুমিও একটা স্কুল দিলে আবার জিতে যাবা।‘
আমার কথায় উনি হোহো করে হেসে আমার মাকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে মা‘র কন্ঠ এগিয়ে আসে।
আমি হতাশ হয়ে হাসান দাদাকে পরামর্শ দিই – স্কুল না দিলেও উনি যেন অন্তত নিজের নামটা কপিরাইট করিয়ে রাখেন, ভবিষ্যতে যাতে এরকম পরিস্থিতিতে আবার পড়তে না হয়।
খোকা মল্লিকের যৌবনের শহরগুলির তুলনায় ঢাকা অনেক ছোট শহর। Infrastructureএর দিক থেকে পিছিয়ে, সুযোগ-সুবিধা কম। কোনদিকে থেকেই cosmopolitan বলা যাবে না।
তার ভালো লাগতো না। স্মৃতিচারণ করতে করতে প্রায়ই হা-হুতাশ করে বলতো, ‘ফ্যামিলির কারণে এই দেশে ফিরলাম, এত বড় বড় শহর থাকতি ঢাকায় পার্মানেন্ট হতি হবে… ভাবা যায়?‘
বলে আমার দিকে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো একটা লুক দিত।
অথবা খবরের কাগজ পড়ে রেগেমেগে ঝাড়তো, ‘এইটা একটা শহর হৈল? বস্তি কোথাকার!‘
কিংবা অন্য সময়ে জিভ কামড়াতে কামড়াতে বলতো – ‘কিসের ঢাকা শহর! গ্রাম আসলে। মফস্বল শহরও না, গ্রাম!‘
আমিও তাল দিতাম, ‘I wish you had moved to London.’
[ চলবে ]