দুর্মতি তাসনিম খলিল
স্যাটায়ার · · ৪ মিনিটের পাঠ

আমার জীবনে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের সাথে বহু সূত্রে পরিচয়। কবে, কিভাবে, কোথায় তাদের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল, সেটা সারাজীবন চেষ্টা করেও মনে করতে পারবো না।
দুর্ভাগ্যবশত Tasneem Khalil ঐরকম একজন।
শুরু থেকেই মনে হতো ছেলেটার মধ্যে একটা ‘কিন্তু’ আছে। নর্থ সাউথের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে হয়তো প্রথম হাই-হ্যালো। নাকি শের প্লাজার সামনে গ্যাঁজাতে গ্যাঁজাতে? একসাথে অনেক ক্লাস করেছি। দুজনই ভার্সিটিতে ইংলিশ ক্লাব করতাম। আবার বাংলাদেশের গুটিকয়েক ইংরেজি পত্রপত্রিকায় দুজনই কমবেশি লেখালেখি করতাম।
একটা সময়ে ওর সাথে দিনে তিন-চার বার করে দেখা হতো, ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। এত ঘনঘন কারো সাথে দেখা হলে এক সময় বন্ধুত্ব হয়েই যায়। কিন্তু একে তো মেয়েলি নাম, তার উপর সে মানুষ হিসাবে ঐ বয়স থেকেই মোটামুটি অসহ্য হওয়ায় আমার পক্ষে ফ্রেন্ডশিপ করা একেবারেই সম্ভব ছিল না।
ইংরেজি সাহিত্যের ব্যাপারে আমার ছিল গভীর প্যাশন, আর তাসনিমের ছিল উদাসীনতা। পড়ালেখা খুব একটা করতো না। একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা। ক্রিকেট খেলার দাওয়াত দিয়েও তাকে কোনদিন মাঠে নিতে পারিনি। খালি বলতো টাইম নাই – কারণ, ঐ যে, সাংবাদিকতা।
পড়াশোনা করা না-করা, ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে এদিক-ওদিক যাওয়া, আর বেশি বেশি সাংবাদিকতা করার পাশাপাশি তাসনিম প্রচুর পড়াশোনা করতো। সেই পড়াশোনার বিষয়বস্তুও, যথারীতি, সাংবাদিকতা। আন্ডারগ্র্যাজুয়েটে পড়া অবস্থায়ই একটা ছেলে ঠিক করে ফেলেছে সে জীবনে কী হবে – এর চেয়ে অসহ্য আর কী হতে পারে? তাই আমাদের বন্ধুত্বের দৌড় ছিল পত্রিকা অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা, মাঝেমধ্যে সাংবাদিকতা নিয়ে তার লেকচার শোনা, এবং দেশের নানা অনাচারের ব্যাপারে তার সিগারেট-খেকো জ্বালাময়ী কথাবার্তা শুনতে শুনতে বিরস ভঙ্গিতে মাথা নাড়া।
তারপর একদিন ডিপার্টমেন্টের একটা মেয়ে ফোন করে বললো, তাশফীন শুনছো? তোমার ফ্রেন্ড তাসনিমকে ডিজিএফআই উঠায়ে নিয়ে গেছে।
মানবিক কারণে আমি মেয়েটার বন্ধুত্ব-বিষয়ক ভুল ভাঙালাম না। ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো, কয়েক সপ্তাহ আগে তাসনিমের সাথে আমার ছোটখাটো একটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল। ওর একটা রিপোর্ট পড়ে বলেছিলাম, খামাখা এসব বিতর্কিত রিপোর্ট করতে যাস কেন? আহমদিয়ারা একটা পিচ্চি কমিউনিটি, তাদের কি হৈল না হৈল সেইটা নিয়ে ফ্রন্ট পেইজ নিউজ করার কোন মানে আছে?
এম্নিতেই সে হাউকাউ করা পাবলিক, শুনে বললো – মানে থাকবে না কেন? ওরা কি বাংলাদেশের সিটিজেন না?
– আরে আমি তো সেইটা বলি নাই। সিটিজেন তো আমরা সবাই।
– তাইলে?
– এত বড় বড় নিউজ থাকতে এইটা নিয়ে মাতামাতি করতে হবে কেন? এই তো সেইদিন বস্তিতে আগুন লাগলো, বন্যা হৈল, সেইগুলা নিয়ে রিপোর্ট কর।
– কেন, বেশি মানুষের দুর্ভোগ হৈলে কি সেইটা বড় নিউজ হয়? নাকি মাইনরিটিদেরকে নিয়ে বড় নিউজ করা জায়েজ না?
– …
– নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার…
– … …
– গণতন্ত্র, সংবিধান…
– … … …
– এথিক্স, সাংবাদিকতা…
– … … … …
– না তাশফীন, তুই আমারে বুঝায়া বল, আমি তোর কথা বুঝতে চাই।
– তোর প্রবলেম কি জানিস? তোর প্রবলেম হৈল গিয়ে তুই বেশি বুঝস। কিছু হৈলেই তোর বইয়ের ভাষায় কথা বলা লাগে।
– ভাগ হালা।
– তুই ভাগ।
– বিড়িটা শেষ কৈরা যাইতেসি।
সেটা কবেকার কথা? ২০০৬? ০৭?
১/১১ কবে হয়েছিল যেন? কেন হয়েছিল? এতদিন পর পুরানো অনেক কথারই কোন মানে নাই।
হাজতে থাকা অবস্থায় ডিজিএফআই’য়ের সাথে তাসনিমের ঠিক কীরকম রিলেশনশিপ হয়ে গিয়েছিল, আমার জানা নাই। সম্পর্কটা শুধুই মনে-মনে ছিল, নাকি শারীরিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল – কে বলতে পারবে? বাজারে এ নিয়ে নানান ধরনের অপপ্রচার আছে।
কিন্তু প্রাক্তন সাংবাদিক হিসাবে আমাকে গুজব না, তথ্য-নির্ভর বিশ্লেষণ করতে হবে। আর তথ্য থেকে যা আলামত পাচ্ছি, সেটা হচ্ছে তাসনিম শুধু অসহ্য না, নির্মমও। সেই যে সে দেশ ছেড়েছে, আর ফেরেনি। ডিজিএফআই’য়ের মানসিক অবস্থাটা সে একবার কখনো চিন্তা করেছে? আজও তারা তাকে ভুলতে পারেনি। বছরের পর বছর তারা তাসনিমের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আর তাসনিম? সে শুধু তাদেরকে ইগ্নোর না, রীতিমত কটাক্ষ করে। খুঁজে খুঁজে বদমাইশটা আস্তানা গেড়েছে ইউরোপের সবচেয়ে লুথা দেশটায়। সেখানে বসে বসে বানরের গু ছোঁড়াছুঁড়ির স্টাইলে সে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের দিকে ‘সাংবাদিকতা’ নিক্ষেপ করে।
এইতো গতকাল ডিজিএফআই তাসনিমের আম্মার খোঁজখবর নিয়ে আসলো। তাও আবার সিলেটে গিয়ে। এটা ভালো কথা না? করোনার মধ্যে আজকাল কে কার খবর রাখে? কিন্তু এই কথা শুনে হারামিটা কী করেছে জানেন? কি আর করবে, রিপোর্ট লিখতে বসে গেছে। দেখেন না, সরকারকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটা স্ট্যাটাসও দিয়েছে। খবিশ আর কাকে বলে।
যেহেতু তাসনিম নাস্তিক, তাই তার পরকালের আশা অনেক আগেই আমি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এই সরকারের এখনও আশা আছে। তার উপর এখন করোনায় দেশ কাহিল। তাই উপরঅলার কাছে আমি দুই হাত তুলে মোনাজাত করছি, তিনি যেন সরকার, ডিজিএফআই, এবং দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মন থেকে তাসনিমের স্মৃতি মুছে দেন। তাতে করে তাদেরও মঙ্গল, দেশেরও মঙ্গল।
কারণ ঐ হারামজাদা কোনদিনই লাইনে আসবে না।