পর্ব ১
স্মৃতিচারণ · · ৭ মিনিটের পাঠ

বাবাদেরকে নিয়ে নতুন করে কি-ই বা বলা যায়?
ছোটবেলায় আমি বাবাকে বলতাম – বাবা বলতো, তোমার জন্মদিন কবে? বাবা জন্মদিন বলতো।
তখন আমি খুব গর্বভরে বলতাম – উহু, হলো না। তোমার জন্মদিন হচ্ছে ছয়ই জানুয়ারি।
– কিভাবে?
– আমি না জন্মালে তো তুমি বাবা হতা না! তাই আমার জন্মদিনই বাবা হিসাবে তোমার জন্মদিন। তাই না?
শুনে বাবা হাসতো।
আমার মেয়ে লীলা জন্মানোর অনেক আগেই মনে মনে ওর নামটা পছন্দ করে রেখেছিলাম।
প্রমাণ হিসেবে লীলার জন্মের বছর দুয়েক আগে যে গল্পটা লিখেছিলাম, যেখানে একটা চরিত্রের নাম ওর নামের অনুকরণে, ঐ রেফারেন্স দেয়া যায়।
প্রেগনেন্সি কনফার্ম হওয়ার সাথে সাথে টিনার মধ্যে একটা মা পাখি টাইপ ভাব চলে আসলো।
সাবধানে পা ফেলে হাঁটে, খেয়াল করে খাওয়াদাওয়া করে। আনারস খাওয়া যাবে না, সুশি খাওয়া যাবে না, এইসব বুঝালো আমাকে।
মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম, সে নিজের সবগুলি ইন্দ্রিয় দিয়ে পেটের মধ্যে প্রায়-মানুষটাকে ফিল করার চেষ্টা করছে।
এসব দেখেও আমার তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। আমি আগের মতো ভিডিও গেম খেলা, ঘরের কাজে ফাঁকি দেয়া, এবং ইন্টারনেটে বিভিন্ন চামার-ছোটলোকের সাথে তর্কাতর্কি করে জীবন পার করছিলাম।
ভেতরে ভেতরে একটা টেনশন অবশ্য ছিল – বাচ্চা হওয়াটা রিস্কি একটা ব্যাপার। প্রায়ই শোনা যায়, অমুকে বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেছে। টিনা মরে-টরে যাবে না তো?
এমনিতে লীলার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের মধ্যে লেগে যায়।
সাড়ে তিন বছরের আমিটাকে তখন আমি অবাক হয়ে দেখি – এই বয়সেই সে এত ভালো প্যাঁড়া দেয়া কোথ্থেকে শিখলো? যেন সে আমার নাড়ি-নক্ষত্রের চুলচেরা মাপ-ঝোঁক জেনেই মায়ের পেট থেকে বের হয়েছে।
সারাদিন আমরা আঠার মতো একজন আরেকজনের সাথে লেগে থাকি। একসাথে খাইদাই, ঘুমাই, গল্প করি।
সকালে ঘুম ভাঙার পর লীলু কিছুক্ষণ নির্বাক থাকে, কোলে থাকতে পছন্দ করে। এই সময়টাকে আমি বলি ধ্যানকাল। কারণ বাকিটা দিন এর পুরা বিপরীত কাটে।
হৈচৈ, লাফালাফি, খিলখিল, ছুটাছুটি – এর মধ্যেই লকডাউন জীবনে অফিসের কাজ, এই কাজ, সেই কাজ। যতটা ওকে সময় দিতে চাই, হয়ে উঠে না।
গত তিন দিন ধরে এক মগ ঠান্ডা ওভালটিন খেতে ইচ্ছা করছে, সুযোগ করতে পারিনি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম মানে আসলে ডবল খাটুনি।
এসব কিছুর মাঝেও যখন হেডফোন কানে দিয়ে অফিসের মিটিং করতে করতে দেখি, আমার হৃৎপিন্ডের আসলে হাত-পা আছে, মাঝেমাঝে সে গান গায়, এবং তার হাসিটা ভীষণ মিষ্টি, তখন কিভাবে কিভাবে যেন ভুল সূত্র দিয়েও আমার জীবনের অ্যালজেব্রাটা মিলে যায়।
মেয়ের সাথে বসে কার্টুন দেখতে দেখতে যদি কোন এপিসোড পছন্দ না হয়, আপত্তি করি। যখন সে খুব দৃঢ়ভাবে ‘নো’ বলে, মানে ঐ কার্টুনই আমাদেরকে দেখতে হবে, তখন আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। আশ্চর্য তো, বাবা হয়ে কি আমি নিজেই আবার শৈশবেই ফিরে গেলাম?
নাকি শৈশব জিনিসটা আসলে কারো ব্যক্তিগত না, shared?
একদিন ছোট্ট একটা মনিটরে আমি আর টিনা দেখলাম, বড় বড় চোখ নিয়ে সে পেটের ভেতর থেকে আল্ট্রাসাউন্ড ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।
এরকম একটা দৃশ্যের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সনোগ্রাম মানে ঝিরঝির ছবি, কেঁচোর মতো একটা বাচ্চা দেখা যাবে – তাই না? সেরকম না হয়ে মনে হচ্ছিল, নতুন মানুষটা ভালোই পরিণত। এবং সে পৃথিবীতে আসতে ইচ্ছুক।
সেইদিন ভেবেছিলাম – ও আচ্ছা, আমি বাবা হতে যাচ্ছি। মানে আরেকটা মানুষের বাবা। একটা রেস্পন্সিবিলিটির ব্যাপার আছে।
তারপর যথারীতি আমার লেদারের জ্যাকেটের মতো স্বাধীন, গা-ছাড়া জীবনটা নিয়ে বাঁচতে থাকলাম।
আমি জন্মানোর আগে মা একদিন হুবহু আমাকে স্বপ্নে দেখেছিল। সেই গল্প শুনে মাকে বলেছিলাম, তুমি কিভাবে চিনলা যে ঐটা আমি?
মা তখন স্বপ্নে আমাকে কি কাপড় পরা অবস্থায়, কিভাবে দেখেছে সব ডিটেইলস বললো।
– আহা ঐসব না, ঐ বাচ্চাটা যে আমিই, সেটা কিভাবে বুঝলা?
– বাহ, তোমাকে আমি চিনবো না? তোমাকে তো আমি যেখানেই দেখি, চিনবো!
লীলা জন্মানোর আগে আমিও ঐরকম একটা স্বপ্ন দেখে ফেললাম। স্বপ্নে তার বয়স দেড় বছর, বা তার চেয়ে কিছু কম। যেই রঙের কাপড় পরা ছিল, পরে হুবহু ঐরকম কাপড়ই টিনা তার জন্য কিনে এনেছিল, আমার কোন ইনপুট ছাড়াই।
এমন কি স্বপ্নে আমার মেয়েকে যেখানে খেলতে দেখেছিলাম – সোফার পাশে – ঠিক ঐ জায়গাটাই লীলুর খুব প্রিয় একটা জায়গা হয়ে গেল। মজার কথা হচ্ছে, তখন পর্যন্ত ঐ বাসা তো দূরে থাক, ঐ শহরেই আমরা থাকতাম না।
স্বপ্নটা দেখে আমি টিনাকে বললাম, কনগ্র্যাচুলেশন্স, তোমার মেয়ে হচ্ছে।
টিনা ঝকঝকে একটা হাসি দিয়ে বললো – সত্যি?
– হু।
– তুমি কিভাবে জানলা?
– স্বপ্নে দেখলাম।
– ধুর, স্বপ্ন তো স্বপ্নই!
আমি হাসলাম।
আমি আমার জীবনে অনেক বিচিত্র, স্পিরিচুয়াল গোছের স্বপ্ন দেখেছি। সেসব স্বপ্নে সাধারণত আমার হুঁশ থাকে।
বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে lucid dreaming.
যেমন আমি দেড় বছর একটা এলিয়েন গ্রহের প্রাণী হিসেবে বেঁচে ছিলাম। সেই গ্রহে আমার সংসার ছিল, চাকরি ছিল, ফ্রেন্ড সার্কল, ঝুট-ঝামেলা, ইত্যাদি ছিল।
আরেকটা স্বপ্নে দেখেছিলাম, বিরাট একটা জলোচ্ছ্বাসে পৃথিবীর সভ্যতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই অদ্ভুত, গা ছমছম করা পরিবেশে আমি আর টিনা টিকে ছিলাম আট মাসের মতো।
আরেকটা স্বপ্নে দেখেছিলাম, এক দরবেশ আমাকে মুসা (আঃ) এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। মুসা (আঃ) আমাকে দেখে খুবই বিরক্ত হলেন। সেলিব্রেটিরা অটোগ্রাফ দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠলে যেমন, অনেকটা সেরকম বিরক্তি।
কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য স্বপ্ন হচ্ছে বাবা হওয়া। আমার মেয়ে জন্মানোর আগেই তাকে স্বপ্নে দেখেছি, সেই কথা বলছি না।
বলছি বাস্তবের খোয়াবটার কথা, জেগে জেগে দিনরাত যেটা এখন দেখছি।
লীলা হচ্ছে যাকে বাংলা সিনেমার পরিভাষায় বলে আমাদের “বেশি বয়সের সন্তান”। টিনা আর আমি দুজনই বাবা-মা হওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করতে চাইনি। সেজন্য যে কত মানুষের
উপদেশ
পরামর্শ
আর্তনাদ
বিহ্বলতা
শোক প্রকাশ
টেস্ট টিউব বিদ্যা
এবং আগ বাড়িয়ে ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট করে দেয়া সহ্য করতে হয়েছে…
সেই খোয়াবনামা বর্ণনা করা শুরু করলে এক হাজার এক রাত কেটে যাবে।
এখনো যখন দেখি, ঐরকম “পরোপকারী” কেউ
বিয়েবাড়ি
জন্মদিনের দাওয়াত
কুলখানি
খৎনার অনুষ্ঠান বা
অনলাইনে,
হাটের একদম মধ্যেখানের হাঁড়ির দোকানটার সামনে
কাউকে না কাউকে “বাচ্চা নিচ্ছ না কেন” টাইপ লেকচার দিচ্ছে
তখন মনে মনে বলি
.
.
.
ভাই থামবেন?
প্রথমত, আট বিলিয়ন মানুষের চাপে এমনিতেই পৃথিবীর ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশের মানুষও যদি সারাক্ষণ বাচ্চা বাচ্চা করতেই থাকে, তাহলে দেশ ও দশের ফিউচার অন্ধকার।
দ্বিতীয়ত, কেউ বিয়ে করে থাকলে সে যথেষ্টই অ্যাডাল্ট। মানুষটা লিঙ্গ ব্যবহার করতে জানে। লিঙ্গ ব্যবহার করেই যে বাবা-মা হওয়া যায়, সেটাও সে জানে। অতএব আপনি ইনিয়ে-বিনিয়ে তাকে আর যাই হোক, পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের ফ্যান্টাসি বিক্রি করতে পারবেন না। সে যা জানার জানে, যা করার করবে।
তাছাড়া সত্যি সত্যি কারো “প্রবলেম” থাকতে পারে। (আমি জানি, ঐ শব্দটা আপনার ভীষণ প্রিয়।) প্রবলেমটা শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, জেনেটিক – ইত্যাদি অনেক ধরনেরই হতে পারে।
সেই “রোগ নির্ণয়” আপনার দায়িত্ব না। আপনি ডাক্তার, সাইকোলজিস্ট, ইকোনমিস্ট, বা জিন/জ্বিন থেরাপিস্ট হলেও না।
আবার সক্ষম হলেই সবার বাবা-মা হওয়া উচিৎ না। কারণ সবার সেই ম্যাচিউরিটি থাকে না। আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করি যেখানে বিয়ে করা, পুকুরে মাছ ধরা, গাড়ি ড্রাইভ করা, ডাক্তারি করা, দোকান চালানো, ইত্যাদি প্রায় সবকিছুর জন্যই লাইসেন্স নিতে হয়।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পপুলেশনের ভারে নুয়ে পড়া পৃথিবীতেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটার জন্য কোন লাইসেন্স লাগে না।
এরকম একটা সিচুয়েশনে গড়পড়তা সবাইকে প্রজননে উদ্বুদ্ধ করাটা খুব দায়িত্বজ্ঞানহীন, প্রায় অমানবিক একটা ব্যাপার।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজে বাবা বা মা হয়েও যদি আপনি আরেকটা মানুষের সাথে এরকম আচরণ করতে পারেন, তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের প্রথম শিক্ষাটাই আপনি শেখেননি।
কী সেই শিক্ষা? অলরেডি আপনার ওষুধ, মানে লেকচার, আপনাকেই দিয়ে ফেলেছি। ঈশপের ভাষায় যাকে বলা হয়, a taste of your own medicine.
ওষুধ খেয়ে কেমন লাগছে আপনার? আমার নিজের তো হাত-পা ঘিনঘিন করছে।
তবু যেহেতু আমরা একই সমাজের লোক, এবং আপনাদের মতো মানুষদের জন্য কোন কোচিং সেন্টার থাকা উচিৎ, কিন্তু নাই, তাই শিক্ষাটার সারমর্ম বলছি –
Control is an illusion.
[ চলবে ]