বাংলাপ্রিয়বিভাগ
পাঁচফোড়ন · পর্ব ২

পর্ব ২

লেখার আকার

’৮৮ সালে মোটামুটি নুহের প্লাবন শুরু হয়ে গেল। দেশের বেশিরভাগ অংশ পানির নিচে তলিয়ে-টলিয়ে একদম একাকার অবস্থা।

তার উপর টিভি খুললেই দেখা যেত প্রেসিডেন্ট এরশাদের স্বরচিত গানের মিউজিক ভিডিও। সেই ভিডিওতে এরশাদ বুট পরে ত্রাণ বিতরণ করছেন, মিটিং করছেন, দুর্গত মানুষ উনার পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে, ইত্যাদি।

একে তো বন্যা, খাদ্য সংকট, রিলিফ চোরদের মামদোবাজি, তার উপর খারাপ পদ্য – এক কথায়, ঐ সময় জাতি কোন দিক দিয়েই শান্তিতে ছিল না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাবা একদিন আমাকে বললো, চল্‌ তোকে বন্যা দেখাই।

আমি তখন ক্লাস টু’তে পড়ি। আমার বোন হওয়ার পর থেকে বাবার কাছ থেকে একটু কম সময় পাচ্ছি। তাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম।

রিকশায় করে দুজন বেরিয়ে পড়লাম। হাতিরপুলে যেতে না যেতেই অথৈ সমুদ্র। বাজারটার সামনে বস্তির কিছু ছেলে ডাবের খোল দিয়ে হৈ চৈ করে ফুটবল খেলছে। তাদের সাথে একটা ঘিয়া রঙের কুকুর ডাবের খোলটার পিছনে পিছনে সাঁতার কাটছে। দেখে হিংসা লাগলো।

কিছুদূর এগোতেই পানি একটু কম। আবার কিছুদূর গিয়ে বেশি। এর মধ্যে আবার ঢাকা শহরের তাবৎ ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও, তাই দুর্ঘটনার ভয়ও আছে। মতিঝিলে পৌঁছতে পৌঁছতে রিকশার সিট অবধি বন্যার পানি উঠে আসলো। রিকশাঅলাটা হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।

বাবার অফিসের সামনে যেতেই বাবা একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে, দেখছিস কি অবস্থা!

আমি শক্ত করে হুড ধরে বললাম, হু।

– কত কষ্ট মানুষের, তাই না! ভাবা যায়?

– বাবা?

– কী, বল?

– আইসক্রিম খাবো।

– … তুই বন্যা দেখে-টেখে বলতেছিস আইসক্রিম খাবি?

– হু।

– এইটা কেমন কথা?

– কি করবো, খুব খেতে ইচ্ছা করতেছে।

বাবা আমাকে কিছুক্ষণ লেকচার-টেকচার দিয়ে শেষে হতাশ হয়ে বললো, ঠিক আছে বাসার কাছে গিয়ে খাইস।


কোন আশ্চর্য কারণে লীলুকে দেখে কখনো কখনো আমার বোনের কথা মনে পড়ে যায়। যদিও চেহারায়, ভাবে-ভঙ্গিতে, স্বভাবে, কোন কিছুতেই তাদের কোন মিল নাই।

আমার বোন তাশনুভা ছিল তুলার মতো তুলতুলে, একটু নরম স্বভাবের। তার কথা ভাবলেই অটোমেটিক যে শব্দটা মাথায় আসে, সেটা হচ্ছে ‘লক্ষ্মী’।

আমার মেয়ের লীলার বেলাতেও সেই ‘পুতুল’ কথাটা শুনি (যে কোন মেয়েশিশুর কমন উপমা বোধহয়)। তবে পুতুল হিসাবে সে যথেষ্টই আলাদা। তার কথা ভাবলে প্রথমেই যে কথাটা মনে হয়, সেটা হচ্ছে ‘দুর্গা’।

এর একটা কারণ হতে পারে আমার মেয়ের চোখদুটো অনেক বড়। দেখলে দেবীমূর্তির কথা মাথায় আসাই স্বাভাবিক। আরেকটা কারণ হচ্ছে ও জন্মানোর ঠিক দুই সপ্তাহ আগে আমি কালীকে স্বপ্নে দেখেছিলাম। কালী দুর্গারই একটা রূপ।

আর এখন? তিন বছর বয়সেই লীলার মধ্যে একটা অনতিক্রমণীয়তা আছে। শান্ত-শিষ্ট হলেও ওর নিজস্ব মতামত আছে। তার উপর ধরা-বাঁধা নিয়মে ওর আগ্রহ নাই। সবকিছু নিজের মতো করে নেড়ে-চেড়ে, দেখে-বুঝে আয়ত্ত করার চেষ্টা করে। পুঁচকি হলেও মিনিটে মিনিটে মানুষটা মনে করিয়ে দেয়, সে স্বতন্ত্র, একদম স্বতন্ত্র।

কিংবা কে জানে, হয়তো সব বাচ্চাদের মধ্যেই সেই প্রতিভাটা থাকে।

তাহলে বড় হতে হতে আমাদের দুঃখ-কষ্টগুলি একাকার হয়ে গেল কিভাবে? কোন্‌ বয়স থেকে?


বিশাল পেট নিয়ে হাসপাতালে টিনা নিজেই ড্রাইভ করে গিয়েছিল। ও জানে আমার ড্রাইভ করতে একদম ভালো লাগে না, তাছাড়া ওর নিজের মধ্যে একটা সুপারহিরো ভাব তো আছেই – তাই সময়মতো বললো, চলো রওনা হই।

পুরাটা পথ আমি টেনশনে থাকলাম। হাসপাতালে গিয়েও টেনশন। যেই কাজে আসা, মানে দুইজন এসে তিনজন ফিরে যাওয়া – সেটা নিয়ে এতদিন আমার কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। এমন কি যেই টেনশনের কথা বলছি, তার কারণ আমার বাবা হওয়ার উত্তেজনা, বা লীলার সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসা না – বরং টিনা ঠিক থাকবে কিনা, সেই দুশ্চিন্তা।

এত এত দিনের সংসার। ঠাস করে বউটার কিছু হলে তো পানিতে পড়ে যাবো! বললামও টিনাকে সে-কথা। শুনে সে লেবার পেইন, ভয়, উৎকন্ঠা, হাসপাতালের ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধ, ডাক্তার-নার্সদের অস্থির বিচরণ… সবকিছু উপেক্ষা করে আমাকে একটা রাম ঝাড়ি দিলো।

ঝাড়ি খেয়ে কিছুটা মন খারাপ করে আমি ভাবলাম, আমি কি বলি, আর আমার সারিন্দা বলে কি! আবার নিজেকে মনে মনে সান্ত্বনাও দিলাম, থাক, মেয়েটার বাচ্চা হচ্ছে।

বলা বাহুল্য, তখনো আমি বাবা হইনি। কিন্তু আমি ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে ফেলছি। অফিশিয়ালি জন্ম-প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল; হঠাৎ একটা রিডিং দেখে টিনাকে বড় একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। মুহূর্তের মধ্যেই ডাক্তার-নার্সে ঘরটা ভরে গেল। একটু পরে আবার সব ঠিক।

আমি একটা ইন্টার্ন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, এখন ঠিক কী হয়েছিল?

ইন্টার্নটা অল্পবয়েসী একটা মেয়ে। কতই আর বয়স হবে, তেইশ? পঁচিশ? যাই হোক, সে হড়বড় করে একগাদা মেডিকাল টার্মসহ একটা লম্বা প্যারাগ্রাফ আমার উপর ছেড়ে দিলো।

শুনে-টুনে আমি বললাম, থ্যাংক ইউ, এবার প্লিজ ইংরেজিতে বলো।

সে হেসে বললো – আসলে বাচ্চা হতে গেলে এরকম একটু-আধটু হয়ই! তুমি টেনশন কোরো না।

– বুঝলাম, কিন্তু আমার স্ত্রীর একটু আগে আসলে কী হয়েছিল?

– ও, দ্যাট! (ঝকঝকে হাসি) আমরা জানি না।

– এইটা তুমি কি বল্লা? তোমরা জানো না? এটা না এত ভালো হাসপাতাল?

– এটা হাসপাতালের ব্যাপার না, মিস্টার (কাগজ দেখে)… ম্যাহ্‌মুড। তোমার নামটা ঠিকমতন বলছি তো?

– হ্যা চলবে।

– জন্ম দেয়ার সময় অনেক কিছু এক সাথে ঘটে। খুবই জটিল একটা প্রসেস। কখন যে কি হয়ে যায়, কিছুই বলা যায় না।

– হায় হায়, এইটা তুমি…

– নো নো নো, আমি কথাটা ঐভাবে মিন করি নাই! আই অ্যাম সো স্যরি, আজকে পুরা দিনটাই আমার ওলটপালট যাচ্ছে! তোমার স্ত্রী, সন্তান দুইজনই ঠিকঠাক আছে। তুমি কোন টেনশন কোরো না।

হঠাৎ কি যেন হলো। মেয়েটার কথা শুনতে শুনতে আমি ভাবলাম, আচ্ছা, লীলাও কি একদিন বড় হয় কোন হাসপাতালে ইন্টার্নি করবে?

ভেবেই চমকে উঠলাম।


এখন আমার একটা জীবন্ত ঘড়ি আছে। প্রতিদিন সকালে সে আমার আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়।

তারপর আমার চোখের পাতায় ছোট্ট একটা আঙুল বুলাতে বুলাতে বলে, গুড মর্নিং।

আমার বেশিরভাগ লেখালেখিই চলে সারারাত ধরে। ঘড়িকে ফাঁকি দেয়ার জন্য প্রায়ই বলি– মা, প্লিজ, আরেকটু… অবিকল ছোটবেলায় মাকে যেমন বলতাম, স্কুলে যেতে যখন ইচ্ছা করতো না।

লাভ হয় না, ঘড়িটা বড়ই নাছোড়বান্দা।

ইদানিং তার প্রিয় অভ্যাস হচ্ছে বিভিন্ন নার্সারি রাইমের লিরিক্স বদলে ড্যাডি সংগীত বানিয়ে ফেলা। যেমন:

Five little daddies went out one day

Over the hill and far away

Mother duck said quack, quack, quack, quack

But only four little daddies came back

যতবারই শুনি খালি মনে হয় – এত সুন্দর অ্যালার্ম আমি আগে কখনো শুনিনি।


লীলা হওয়ার আগে কিন্তু আমি কাচ্চা-বাচ্চা খুব একটা পছন্দ করতাম না। অপছন্দ করতাম সেটা বলছি না; মানে, বাচ্চা দেখলেই কোন কোন ছেলে যেমন আহালু-উলুলু করতে করতে মাখনের মতো গলে যায়, আমি কস্মিনকালেও ঐরকম ছিলাম না।

এক কথায়, আমার মধ্যে শিশুপ্রীতি জিনিসটাই ছিল না।

আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড বিয়ের ঠিক দশ মাস পরেই বাবা হয়ে গিয়েছিল। খবরটা শুনে ছুটে গেলাম। সেই মনোয়ারা বা নিবেদিতা বা বাংলা সিনেমার মা-খালার নামে নাম রাখা ক্লিনিকটার কাছে গিয়ে দেখি… শালা বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।

আমি বিড়াল মারা-বিষয়ক যাবতীয় ফাজলামি শেষ-টেষ করে বললাম – কনগ্র্যাচুলেশন্স! তা নতুন বাবা হিসাবে তোর প্রতিক্রিয়া কি?

– এটা নিঃসন্দেহে আমার লাইফের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। ঠিক ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। পৃথিবীর কোন ভাষাতেই মনে হয় এই অনুভূতি প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট শব্দ নাই। আকাশে, বাতাসে কেমন যেন একটা আনন্দের লেয়ার। খুব খুশি লাগতেছে, আবার ভয়ও হচ্ছে। সন্তানকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারবো তো? আবার মনে হচ্ছে…

আমি ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত তুলে বললাম – মুখস্থ করছস?

বন্ধু কিছুটা চুপসে গিয়ে বললো, হু, বুঝলি কেম্নে?

– তোরে ম্যালাদিন ধরে চিনি তো।

– আগে বলবি না? খামাখা লেকচার খরচ করলাম।

– বাইরে খাড়ায়া বিড়ি ফুঁকতেছস ক্যান?

– এমনি। মা-ছেলে দুইজনই ঘুমাচ্ছে, ভাবলাম একটু পালাই।

– আচ্ছা, বিড়ি খেয়ে আবার ওদের কাছে যাবি? জার্ম-টার্মের ব্যাপার আছে না? ফালা, বিড়ি ফালা।

সে অন্যদিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। কাহিনী কি? আসল ঘটনাটা বুঝতে আমার কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। বোধোদয় হওয়ার পরে বললাম – বাচ্চা পয়দা কৈরা তুই কিসের মধ্যে পড়ছস, তোর কোন ধারণা নাই। তাই না?

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বন্ধু বললো – হ্যা দোস্ত, আই হ্যাভ অ্যাবসলুটলি নো আইডিয়া।


শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আমার সেই ফ্রেন্ড একজন অসাধারণ বাবা। কিন্তু তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।

ইন ফ্যাক্ট, আমার ধারণা জগতের বেশিরভাগ বাবারই ‘অ্যাবসলুটলি নো আইডিয়া’ অবস্থা। সেটা আনকোড়া নতুন বাবা, কয়েক বাচ্চার বাবা, দাদা-নানা হয়ে যাওয়া বাবা – সবার বেলাতেই প্রযোজ্য। কারণ মানবসন্তান মানুষ করাটা চাট্টিখানি কথা না।

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের ফ্যামিলি স্ট্রাকচারে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রজাতি হচ্ছে বাবা। পিতা পরিবার-প্রধান; তিনি কমবেশি গুরুগম্ভীর, সন্তানকে পাশে থেকে শাসন ও দূর থেকে স্নেহ করেন, পরিবারের ভালোর জন্য নীরবে নিজেকে বিলিয়ে দেন, নিজের সাধ-আহ্লাদ সংসারের উন্নতির জন্য ত্যাজ্য করেন, ইত্যাদি। এখনো নাটক-সিনেমায় আমরা বাবা বলতে এরকম কাউকেই দেখি, “বাবা” নামের কোন গানে এরকম কোন বাবারই গল্প শুনে চোখ মুছি।

প্রবলেম হচ্ছে, এই বাবা চরিত্রটা বাই ডিফল্ট একা। সে গোপনে ফ্যামিলির জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যায়, এমন কি নিজের স্ত্রীকেও ঝড়-ঝাপ্টা খুব একটা বুঝতে দেয় না। একটা বয়সের পর (বা হয়তো বাবা হওয়ার পর থেকেই) তার আর নিজস্ব কোন জগৎ থাকে না। নতুন কোন বন্ধুবান্ধবও হয় না। যেই লোকটা এক কালে খেলার মাঠে পড়ে থাকতো, প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিতো, ছুটি-ছাটায় বন্ধুদের নিয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়তো, বা রেগুলার বেইলি রোডে নাটক দেখতো – তার জীবনটাই হয়ে যায় ভয়াবহ ডিপ্রেসিং।

তার চেয়ে ভয়ংকর কথা, সে যে বিষন্ন এটা সে নিজেই সাধারণত বুঝতে পারে না। কারণ সমাজের গৎবাঁধা ডেফিনিশন অনুযায়ী বাবাদের বিষন্ন হতে নেই।

একটা বয়সের পর বিভিন্ন অসুখে পড়াটা তাই বাবাদের জন্য একরকম অবধারিত। তবে তার আসল চ্যালেঞ্জটা শুরু হয় স্ত্রী বিয়োগের পর। সারাজীবন নীরবে লড়ে যাওয়া মানুষটার তখন সত্যি সত্যি আর মন খুলে কথা বলার কোন অপশন থাকে না…

বুঝলেন তো বাবারা? পুরুষতান্ত্রিকতায় শেষমেষ ছেলেদের আম-ছালা কোনটাই থাকে না।


– আচ্ছা, বাবা হতে কি সত্যি সত্যি বাবা হওয়া লাগে? নাকি নিজের সন্তান না হলে বাবা হওয়া যায় না?

– না, নিজের সন্তান হওয়া লাগে না।

– এইটা কেমন কথা শুনাইলেন?

– সত্যি কথা, তবে সেটা সবার বুঝতে পারার কথা না।


কয়েক বছর আগে আমার এক এশিয়ান বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। তার বউ প্রেগনেন্ট শুনে বললাম, চলো এই উছিলায় তোমাকে হটপট খাওয়াই।

রেস্টুরেন্টে বসতে বসতে সে বললো – আমি চায়নিজ, আমারে হটপট খাওয়ায়ে কি লাভ? সারাক্ষণই তো খাই।

– শেষ কবে খাইছো?

– মাসখানেক…

– হৈছে, খাও এখন। হাফ তোমার, হাফ আমার। আচ্ছা বাবা হওয়ায় তোমার কি প্রতিক্রিয়া?

– এইতো, এখনো বুঝতেছি না।

– একদম কারেক্ট অ্যান্সার।

– কিন্তু জানো, আমার বউ এখন আর আমার মায়ের সাথে একদমই কথা বলতেছে না।

আমি দুঃখ প্রকাশ করে-টরে বললাম, কাহিনী কি?

– আমার মা ডেবি’কে (ওর বউ) বাচ্চা নেওয়ার জন্য আগে খুব প্রেশার দিতো।

– গো অন…

– একবার আমার মা ওকে বলেছিল, আমরা ‘ইয়ে’ করার পর সে যেন আধা ঘন্টা হেডস্ট্যান্ড করে থাকে।

– মানে?

– মানে মাথা নিচে, পা উপরে…

– আহা ‘হেডস্ট্যান্ড’ মানে আমি জানি। তোমার মা ডেবি’কে এরকম একটা কথা বলতে গেল কেন?

ও চশমা মুছতে মুছতে বললো, তাহলে নাকি স্পার্মের কাজটা সহজ হয়ে যায়।

আমি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ পরে বললাম, অ।

– ঐটা এখন আমার বউ আর ভুলতে পারতেছে না… এতদিন ধামাচাপা দিয়ে ছিল।

– আই সি।

– বাংলাদেশে নিশ্চয়ই শ্বাশুড়িরা এরকম অদ্ভুত কাজ কখনো করে না?

– সেটা বলতে পারবো না, কিন্তু তারাও অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করে।

– পৃথিবীর সব কালচারেই কি এইসব হয় তাহলে, তাশফীন?

– আনফর্চুনেটলি ইয়েস, যদিও দিন বদলাচ্ছে।

– আসলে কি বদলাচ্ছে?

আমি হটপটের মধ্যে চামচ নাড়তে নাড়তে চিন্তায় পড়ে যাই। কী বলা যায় তাকে? ছেলেটা মায়ের আঁচলের নিচে বড় হওয়া টাইপ। আবার তার বাচ্চা হচ্ছে, মানে সেনসেটিভ সময়। আবার এই মুহূর্তে তার মন খারাপ ভাব। কি মুশকিল!

বলক ওঠা সিচুয়ান স্যুপের মধ্যে ভেড়ার মাংস, লেটুস, আর কোয়েল পাখির ডিম ভাসতে থাকে। সত্যি সত্যি কি সমাজ বদলাচ্ছে? আমাদের পাড়ায় একটা লোক ছিল, মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। উনার দুই নাতি ছিল; যখনকার কথা ভাবছি, তখন তাদের একজনের বয়স বোধহয় তিন, আরেকজনের পাঁচ। দুজনই ভীষণ হৃষ্টপুষ্ট টাইপ। মানে ঐ বয়েসী বাচ্চাদের অন্তত ডাবল সাইজ।

নাতিদ্বয়কে দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল পাখির বাচ্চার মতো ছোটখাটো, লিকলিকে, খুবই মিষ্টি স্বভাবের একটা কাজের মেয়ে। কতই বা বয়স ছিল মেয়েটার? বড়জোর নয় কিংবা আট।

সারাক্ষণ ছেলে দুইটা তার কোলে থাকতো, ঝুলে ঝুলে আইসক্রিম খেতো, আর মাঝেমধ্যে মেয়েটাকে ঘুষি মারতো। একটা বাবা হয়েও, একজন নানা হয়েও সেই লোকটার (বা তার ফ্যামিলির অন্য কারো) কাজের মেয়েটার জন্য একটুও মায়া হতো না? সেটা কীভাবে সম্ভব? আজো যখন মেয়েটার মেরুদন্ডের এক্স-রে রিপোর্টটা কল্পনা করার চেষ্টা করি, ভয় পাই।

প্রসংগটা আস্তে আস্তে অন্যদিকে নেয়ার জন্য ডেবি’র স্বামীকে উল্টা জিজ্ঞেস করলাম – তা তোমার কি মত? যোগাযোগ কাট-অফ করে কি ডেবি কাজটা ঠিক করেছে?

অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে বললো, আগে হলে বলতাম না, ডেবি আরেকটু কাইন্ড হতে পারতো। কিন্তু আজকাল মনে হয়, ঠিকই আছে। আমার মায়েরই ডেবি’র কাছে অ্যাপলোজাইজ করা উচিৎ।

– ইন্টারেস্টিং। তোমার এই উপলব্ধির কি কারণ?

– আমি ইদানিং বুঝতে পারতেছি, আমার মা আমাকে একা মানুষ করায়, আমার জন্য অনেক স্ট্রাগল করায় আমি সবসময় তার সাইডটাই দেখতাম। তার দোষ থাকলেও তাকে প্রোটেক্ট করার চেষ্টা করতাম। ব্যাপারটা যে সবসময় আমি বুঝে করতাম, তাও না। কিন্তু তাতে করে ডেবি মানুষটা চাপা পড়ে গেছে। এখন ডেবি মা হচ্ছে দেখে আমি অন্যভাবে চিন্তা করতে পারছি। আসলে আগে থেকে এরকম ভাবতে পারলে অনেক ভালো হতো।

শুনে আমি হাসিমুখে ওর পাতে মাংস বেড়ে দিলাম।

– আরে আরে, তুমি তোমার ভাগ থেকে আমাকে মাংস দিচ্ছ কেন?

– দিন বদলাচ্ছে দেখে।


কেমন দেখতে হবে বৃদ্ধ লীলা? টিনএজ বয়সে কি সে চুল ছোট করে ছেঁটে রাখবে?

জোরে জোরে গান শুনতে শুনতে গাড়ি চালাবে? যখন যেখানে যাই, যাদের সাথেই দেখা হয় – অনলাইনে, বাসে, বাসার কাছে হাঁটতে গিয়ে, বা অফিসে – তাদের জায়গায় আমি আমার মেয়েটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করি। আমার চোখে তাই চারপাশের সবাই লীলা বা লীলার কোন ভার্সন। এটা কি ভালো, মন্দ, সু্স্থ, নাকি বাড়াবাড়ি? এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত ছোট্ট মানুষটাকে নিয়ে আমি নির্ভার।

আমার এক কলিগ একটা কথা বলেছিল। লোকটা তখন ডিভোর্সের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে দিয়ে হাসি-খুশি থাকলেও ঠিকই বুঝতাম, বেচারার হালুয়া টাইট। সতের বছরের সংসার ভেঙে যাওয়া মুখের কথা না।

বলেছিল – জানো ট্যাশ (আমার নামের অপভ্রংশ), আগে আমি কোনদিন কাউকে খুন করার কথা প্রসেসই করতে পারতাম না। কিন্তু আমার বাচ্চাদের জন্য আমি হাসিমুখে খুন করতে পারবো।

যেহেতু ব্যাটার মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না, আমি আমতা আমতা করে বললাম – তুমি কি কাউকে খুন করার কথা চিন্তা করতেছ?

– আরে না! কিন্তু আমি খুন করতে পারবো, সেই কথাটা তোমার সাথে শেয়ার করলাম।

– ও…

একদিন আবিষ্কার করলাম, আমাদের কম্পানির Chief Technology Officer হয়েও সে থাকে একটা ঘুপচিমার্কা বেইসমেন্টে।

আমি ইংরেজিতে তাকে বললাম, বাহে, কেনে?

– কারণ আমার এক্স-ওয়াইফকে আমি বাসাটা দিয়ে দিয়েছি।

– কিন্তু তোমাদের না সম্পর্ক খারাপ? একটা আস্ত বাসা এমনি এমনিই দিয়ে দিলা?

– আস্ত না আসলে। অর্ধেকটা আমার ছিল, আর বাকিটা ওর। আমার বাচ্চারা অর্ধেক সময় তাদের মা’র কাছেই থাকে, তো ঐটুকুন সময় তারা যাতে আরামে থাকে, সেজন্যে।

ঠাস করে কেন যেন মনে পড়ে গেল, অনেক ছোটবেলায় একবার আমার খুব অসুখ করেছিল। জ্বর অনেক বেড়ে যায়, তারপর একটু পরেই টেম্পারেচার পড়তে পড়তে থার্মোমিটারের পারদই নড়তে চায় না এমন অবস্থা।

একদিন আমার শরীর খুব খারাপ হয়ে গেল। বাবা তখন স্যান্ডেল-ফ্যান্ডেল ভুলে, খালি পায়ে অনেক দূর দৌঁড়ে গিয়ে ডাক্তার নিয়ে এসেছিল।

কলিগটাকে শুধু বললাম, আই আন্ডারস্ট্যান্ড।


বাইবেল অনুযায়ী লেবার পেইন হচ্ছে গন্ধম ফল খাওয়ার শাস্তি।

টিনা খুবই শক্ত টাইপের একটা মানুষ। কিন্তু সে যে কোন্‌ পর্যায়ের শক্ত, সেটা বুঝেছিলাম লীলা হওয়ার লেবার পেইনের সময় তার পাশে থেকে।

সেই যন্ত্রণার সাক্ষী হওয়া, তার উপর টিনা মরে যাবে কিনা সেই ভয়টা, এবং ফাউ হিসাবে একটা খারুস টাইপের নার্সের আচরণ – সব মিলিয়ে আমিই বিধ্বস্ত হয়ে মোটামুটি কাঁপতে কাঁপতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম ভাঙলো একজনের ধাক্কাধাক্কিতে।

– তোমার তো বাচ্চা হচ্ছে, উঠ উঠ!

কোন বিচিত্র কারণে ঠিক ঐ মুহূর্তে আমি স্বপ্নে দেখছিলাম, আমাকে ছাড়াই টিনাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছে। ধড়মড় করে উঠলাম, তারপর টলতে টলতে তার সাথে দিলাম দৌড়।

OTতে ঢুকে দেখি সবাই রেডি, সবকিছু রেডি – কয়েক মিনিটের মধ্যে লীলাও চলে আসলো। আমি তখন খালি উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছি, টিনা ভালো আছে তো? ততক্ষণে কয়েক হাত ঘুরে লীলা একটা নার্সের কোলে। সেই খারুস নার্সটা।

পর্দার এদিকে এসে নার্স বেটি খালি বিরক্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকায়, আর জোরে জোরে বলতে থাকে, আমাকেই কেন বেবিটাকে নিতে হচ্ছে? কি ঝামেলা!

তখন নিজেকে নিজেই বলতে শুনলাম – ওকে আমার কাছে দাও।

যদিও তার আগে কখনো আমি ছোট বাচ্চা কোলে নেইনি। কোন নবজাতককে তো নেই-ই নি। লীলাকে কোলে নিয়েই আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম।

দেখি, আমি আর আমার মেয়ে ঠিক ঐভাবেই দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আর সবকিছু পাল্টে গেছে। OTর বদলে আমরা একটা নতুন বিল্ডিংয়ে। নতুন মানে একদমই নতুন, কনস্ট্রাকশন চলছে।

দেয়ালগুলি রংহীন। এখানে সেখানে চুন-সুরকি পড়ে আছে। যেই ঘরটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটার ছাদ থেকে ইলেকট্রিকের তার ঝুলছে। লাইট আছে, কিন্তু এখনো সংযোগ করা হয়নি।

আশপাশ থেকে ড্রিল মেশিন, লোহা কাটার মেশিন, ইত্যাদির শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। শুধু টের পাচ্ছি, অশরীরী শ্রমিকরা কাজ করছে। তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা করছে। মানুষ-মজুররা যেমন করে।

আমার অবশ্য তখন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে আমার মেয়েকে দেখছি। আর ভাবছি: এই এখুনি-হওয়া মানুষটাকে আমার এত পরিচিত লাগছে কিভাবে? এই তো মনে হলো, ওর চোখের তারায় অনেকগুলি প্রিয় মানুষকে দেখলাম। এটা কি ম্যাজিক, নাকি মনের ভুল? ইত্যাদি।

হঠাৎ টের পেলাম, ঘরের মধ্যে কে যেন হাঁটছে। শরীরী, কিন্তু অশরীরী। খুব সম্ভবত কালো বুট এবং ওভারকোট পরা। তিনি এখানে, কিন্তু সবখানে।

ঈশ্বর।

আমি শ্রদ্ধায়, এবং কিছুটা লীলাকে দেখার মুগ্ধতায় তার দিকে সরাসরি তাকালাম না। কাছে এসে তিনি বললেন – কী, মেয়ে পছন্দ হয়েছে?

আমি ঘাড় কাত করে বুঝাই, হয়েছে।

– জানতাম তোমার পছন্দ হবে। তোমার সবসময়ই মেয়ের শখ ছিল।

– বুঝতে পারছি।

– প্রাণ জিনিসটা কিন্তু বিশাল একটা ব্যাপার। তোমার মেয়েকে আগলে রেখো, ভালো রেখো।

– রাখবো।

– তুমি যেটা জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছ, করতে পারো।

– চারদিকে কনস্ট্রাকশন কেন?

– কারণ বিল্ডিংটা আসলে তুমি। তুমি এই মেয়ের জন্য রেডি ছিলে না, তাই তোমাকে আপগ্রেড করা হচ্ছে।

– আর কতক্ষণ এখানে থাকতে হবে?

– তোমার মধ্যে অনেক অসংগতি ছিল। সেগুলির কাজ চলছে, একটু টাইম লাগবে।

আমি মোবাইলে সময় চেক করলাম; দশ মিনিট পার হয়ে গেছে।

ঈশ্বর বলতে থাকেন, ঐ যে শুনছো না? ঐ ঘরে তোমার পুরানো কিছু চিন্তাভাবনা কেটে নতুন করে সাইজ করা হচ্ছে।

– থ্যাংক ইউ।

– ওয়েলকাম। আর কি জানতো চাচ্ছ, বলো?

– আমি কি ভালো বাবা হতে পারবো?

শুনে পরম পিতা হেসে ফেললেন। তারপর লীলার দিকে ইশারা করে বললেন – একমাত্র সময় এবং সে-ই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। তবে এখন তোমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে। কেমন লাগছে?

– ভালো, কিন্তু কেমন যেন একটু অন্যরকম…

– ওকে। থ্রি, টু, ওয়ান

ঘোর ভেঙে দেখি, আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে আবার অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে আছি। সাথে সাথে মোবাইল বের করে সময় চেক করলাম। কোন টাইম লস-ই হয়নি। তাহলে আমরা দশ মিনিটের উপর যেখানে ছিলাম, সেই জায়গাটা কি –

নার্সটা নাকি সুরে বলে উঠলো, বেবিটাকে আমার হাতে দিতে গেল কেন! আমি কি ওকে নিতে চেয়েছিলাম!

শুনে আমি আর আমার মেয়ে একযোগে কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

আর আমি মনে মনে প্রাণ খুলে হাসলাম – ভালোই জমবে আমাদের বাবা-মেয়ের টিম।


Rain, rain, go away

Come again another day

Little daddy wants to play

Rain, rain, go away

[ সমাপ্ত ]


পাঁচফোড়ন · ২ পর্ব

পরের পর্বএটিই শেষ পর্ব
সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন