বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ০১

পর্ব ০১

লেখার আকার

পাঁচ বছর বয়সে একদিন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।

আমরা তখন লন্ডনে থাকি, বাবার সোনালী ব্যাংকের পোস্টিংয়ের সুবাদে। মা সাবধানে সোফায় বসতে বসতে হাসি হাসি মুখ করে বললো – ‘আব্বুসোনা, এদিকে আসো তো, তোমার সাথে আমার ইম্পর্টেন্ট কথা আছে!‘

বাইরে তখন পড়ন্ত দুপুর। ব্যাকইয়ার্ডে গাছের ছায়াগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বাসার সামনের রাস্তা থেকে গাড়ি যাওয়া-আসার শব্দ ভেসে আসছে। বিলেতের শীতকালে দুপুর আর সন্ধ্যার বিরতি সামান্যই; সেমিকোলনও না, বড়জোর কমার মতো। সবকিছুতে ঢুলুঢুলু একটা ভাব। দীর্ঘ বাক্য যেমন সমাপ্তি খোঁজে, বা দিনশেষে ক্লান্ত পোস্টম্যানরা যেভাবে বাড়ির পথ ধরে, অনেকটা সেরকম।

আমি স্কুল থেকে ফিরেছি কিছুক্ষণ আগে – নাকি সেদিন স্কুল ছিল না? মনে করতে পারছি না। ঘটনাটা ঠিক কবে, কোন মাসে ঘটেছিল, এতদিন পর সেটাও মনে পড়ছে না। তবে ১৯৮৫ সালের শুরুর দিকের কোন একদিন, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত।

পাঁচ বছর বয়েসী পোলাপান এই জাতীয় পরিস্থিতিতে বাসায় থাকলে যা করে, আমিও তাই করছিলাম – ঘরময় ছোটাছুটি। একমাত্র সন্তান হিসেবে আমার গর্ভধারিনীর জীবনে আমার চেয়ে ইম্পর্টেন্ট কিছু থাকতে পারে না। অতএব, তার ‘ইম্পর্টেন্ট‘ কথাকে পাত্তা দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছিলাম, আমার বাবা-মা‘র ভাবভঙ্গি বেশ সন্দেহজনক। প্রায়ই তারা নিজেদের মধ্যে হাসি-হাসি মুখ করে ফিসফিস করে। ছুটোছুটির মধ্যে মাকে জাপটে ধরতে গেলে মা আর আগের মতো খুশি হয় না, উল্টা বলে – ‘আব্বু, কেয়ারফুল, কেয়ারফুল!‘

কাহিনী কী? জানতে চাইলে দুজনই আমাকে ভুজুংভাজুং বোঝায়। যেন আমার বয়স পাঁচ না, দুই। যেন আমাকে একঘরে করার একটা সূক্ষ্ম চক্রান্ত চলছে।

এখনো ৪৯ ফ্রবিশার রোডে আমাদের সেই বাসাটা, সেই ঘুমঘুম দুপুরটা আমার মনে জ্বলজ্বল করে। জলোচ্ছ্বাস বা সাইক্লোনের স্মৃতি যেভাবে মনে গেঁথে থাকে, অনেকটা সেরকম। আমি মনের আনন্দে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ঘরময় খিলখিল করছি, সোফা থেকে লাফ দিয়ে কার্পেটে পড়ছি, তারপর কার্পেটে গড়াগড়ি করতে করতে একাধারে সুপারহিরো ও সুপারভিলেন হিসেবে আশেপাশের খেলনা, জুতা-স্যান্ডেল, হাতের কাছে যা পাচ্ছি তার সাথেই ঢিশুম-ঢাশুম করছি….

এমন সময়ে গর্ভধারিনী আবার বলে উঠে, ‘আব্বু, এদিকে আসো তো, মামির সাথে সোফায় বসো। তোমার সাথে ইম্পর্টেন্ট কথা আছে।‘

সোফায় বসে শুনতে হবে? মানে স্থির হয়ে? কি এমন কথা? আমি প্রলয় ভুলে কৌতূহলবশত তার পাশে গিয়ে বসি।

‘তোমার জন্য গুড নিউজ আছে।‘

‘ওয়াট, মামি?‘

‘মামির একটা বেবি হবে।‘


আমি সোফায় বসে হা করে বিষয়টা হজম করার চেষ্টা করি।

আমার মোট খেলনা গাড়ির সংখ্যা ১৬ (রোবট গাড়িসহ)। তার মধ্যে ২টা গাড়ি বেশ পুরানো, তাই কার্যত সংখ্যাটা ১৪। পুরানো ২টা গাড়ি নিয়ে নতুন বেবি খেলতে চাইলে খেলতে পারে। কিন্তু মূল ১৪টা গাড়ির সবগুলিই আমার প্রিয়, বিশেষ করে লাল স্ট্রাইপঅলা গাড়িটা। ঔ নৌ, সেগুলিও এখন আমাকে শেয়ার করতে হবে? বাসায় আরেকটা বাচ্চা থাকলে তো শেয়ার করতেই হবে, না করলে খারাপ দেখায়…. কিন্তু কেন? আমার সাথেই কেন এরকম ঘটতে হবে?

হসপিটাল থেকে আরেকটা বেবি আনার ডিসিশন নেওয়ার আগে কেউ তো আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করলো না। সবচেয়ে বড় কথা, আরেকটা বেবি কেন লাগবে – আমি কি এনাফ না?

আমি শীতল গলায় মাকে বলি, ‘ওয়াই?‘

শুনে মা হিহি করে হেসে উঠে, যেন আমি খুব ফানি কিছু বলে ফেলেছি। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে যায়। আমি তার শঠতায় বিভ্রান্ত না হয়ে শীতল দৃষ্টি বজায় রাখি।

‘ওয়াই মানে? তোমার জন্য, আবার কী! আরেকটা বেবি ব্রাদার বা সিস্টার হলে কত ভালো না? তোমরা একসাথে টয় নিয়ে খেলবা, কত মজা করবা!‘

‘বাট আই ডোন্ট নিড আ বেবি ব্রাদার অর সিস্টার।‘

(আবার হাসি।) ‘আচ্ছা বাবা, এরকম বলতে হয় না। ভাইবোন থাকলে কত ভালো না! আর বেবিটা তো মামির পেটে চলে আসছে, ওকে কি আমরা হওয়ার পর হসপিটালে রেখে আসবো?‘

সেটা তো মোটেও উচিত না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি মাথা নেড়ে বলি, না, বেবি হলে তাকে বাসায়ই আনতে হবে। কিন্তু একটা শর্ত আছে, বেবিটা ছেলে হতে হবে। মেয়ে বেবিরা গাড়ি নিয়ে খেলে না।

হাসতে হাসতে মা তখন বলে, ‘কিন্তু আব্বু, এটা তো আমার ইচ্ছার উপর না – বেবিটা মেয়ে হলে আমি কি করবো?‘

এই পর্যায়ে জগৎ-সংসারের সীমাহীন নির্মমতায় আমার চোখ ভিজে আসে। আমি কাকুতি-মিনতি করে বারবার বলতে থাকি, ‘মামি, প্লিজ ট্রাই টু ব্রিং আ বেবি ব্রাদার! প্লিজ মামি!‘

শুনে মা হাসতে হাসতে সোফায় প্রায় গড়াগড়ি খায়। হাসতে হাসতে তার চোখে বন্যা শুরু হয়ে যায়। অবশেষে হাসি কমলে সে বলে – ‘আচ্ছা আব্বু! আই প্রমিজ, তোমার একটা বেবি ব্রাদারই হবে! তুমি মন খারাপ কোরো না, তাই হবে! আই প্রমিজ!‘

সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ফেরার পর মা তাকে প্রমিজের ব্যাপারটা হাসিমুখে রিপোর্ট করে। শুনে বাবাও খুব হাসাহাসি করে, তারপর হোহো করতে করতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে – ‘আমার পাগল ছেলেটা!‘

আমি শোকে পাথর হয়ে সেই আদর সহ্য করি।


বুঝতেই পারছেন, শেষ পর্যন্ত আমার একটা বোনই হয়েছিল। কিন্তু আমি ফাস্ট-ফরোয়ার্ড করে ফেলছি।

সময় জিনিসটা পিচ্ছিল; বড়ই পিচ্ছিল।

তবে আমরাও কম ধুরন্দর নই – আপনার, আমার মতো স্মৃতিভুক মানুষরা – তাই না? হাজার হাজার বছর ধরে নস্টালজিয়া প্র্যাকটিস করতে করতে আমরা বুঝে গেছি, সেই নদীর মতো বয়ে চলা, কারো জন্য অপেক্ষা না-করা, ছ্যাঁচড়া, পিছলা, সময় নামের জিনিসটার সূক্ষ্ম একটা গন্ধ আছে। অতএব তার পিছু নেয়া যায়। কখনো কখনো তাকে ধরেও ফেলা যায়।

কারো কারো কাছে এসব কথাবার্তা রহস্যময় শোনালেও ব্যাপারটা আসলে সরল। আমাদের যত সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা, ছুটির ঘন্টা বাজতেই খেলার মাঠের দিকে ছুটে যাওয়া – সবই ঘটে শ্বাস-প্রশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে। আর সেই সুযোগে, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে, ঘ্রাণ নেওয়া তো হয়েই যায়। জীবনের একেকটা পর্বের একেক রকম ঘ্রাণ; এবং ঘ্রাণে যেহেতু অর্ধ-ভোজন, একেক বয়সের একেক রকম স্বাদ।

তাই স্মৃতি হাতড়াতে গেলে আমি কবি-সাহিত্যিকদের মতো শব্দ বা বর্ণ খুঁজতে যাই না, অতীতের মেঝেতে নাক গুঁজি। ছোটবেলায় কার্টুনে-দেখা কুকুর যেভাবে গন্ধ তালাশ করতো, আমিও তাই করি। নাকের পিছু পিছু আমার বাকি ইন্দ্রিয়গুলি এক সময় পৌঁছে যায় প্রাচীন কোন শহরে – শৈশবের লন্ডনে, বড় হয়েছি যে ঢাকায়, কলেজের পর ঘুরতে যাওয়া বর্ষাস্নাত সেই কোলকাতায়।

সেই শহরগুলি, এবং শহরগুলিকে ঝলমলে করে রাখা মানুষগুলির প্রায় কেউই আর বেঁচে নাই। তাদের জায়গায় এখন নতুন জিওগ্রাফি, নতুন জেনারেশন, ইউটিউব, মোবাইল ফোন। ঐ যে মহল্লার খাঁজে খাঁজে নাইটগার্ডের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছ, চৌরাস্তার খোঁজে মুষড়ে পড়া ধুলামাখা গলি, গলির মুখে হা করে তাকিয়ে থাকা চায়ের টং, ঘুপচির ভেতর থেকে গোয়েন্দার মতো চাহনি নিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে তাকানো বিড়াল – এসবেরই কি আদৌ কোন অস্তিত্ব ছিল?

ছিল তো, এখনো ঐ সময়গুলির গুটিকয়েক সাক্ষী টিকে আছে। তাদের একজনের সাথে আমার নিয়মিত দেখা হয়, আয়নায়। আয়নার মানুষটা গম্ভীর, কিছুটা অসামাজিকও। কিন্তু প্রায়ই তাকে দেখে আমি আর কৌতূহল চাপতে পারি না – জিজ্ঞেস করে বসি, ‘কেমন ছিল, কে ছিল তাশনুভা?‘

কিন্তু ঐ যে বললাম, আমি ফাস্ট-ফরোয়ার্ড করে ফেলছি। গল্পের এই পর্যায়ে এখনো তার জন্মই হয়নি। সময় জিনিসটা পিচ্ছিল, বড় পিচ্ছিল।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

আগের পর্বএটিই প্রথম পর্ব
সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন