পর্ব ০৯
স্মৃতিচারণ · · ৫ মিনিটের পাঠ

‘But why? Why do we have to go back to Bangladesh?’
‘Because it’s home!’
‘But this is home.’
‘না আব্বু, Bangladesh is our real home.’
আমি হা করে মা’র দিকে কিছক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ঐ বয়সে মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে খুব একটা চেনে না – প্লে-গ্রাউন্ডে হঠাৎ ব্যথা পেলে সে আল্লাহকে ডেকে উঠে না, ডাকে নিজের মাকে। সেই মা কিংবা ঈশ্বরই যখন বলে বসে, এখানে না, ঐ যে দূরে ব-দ্বীবটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে তোমার ঘর – তখন কী বা করার থাকে?
কিন্তু ঘর মানে স্মৃতি, আর স্মৃতি মানে জীবন। আর তখন পর্যন্ত আমার জীবনের প্রায় পুরাটাই কেটেছে বিলেতে। রাতে তাই বাবার কাছেও লবিয়িং করলাম, যদি কোনভাবে ইংল্যান্ডে থেকে যাওয়া যায়:
‘But daddy, this is our home. We live here.’
বাবা ভালো হাত দেখতে পারতো, ভূত-ভবিষ্যৎ তার আগেভাগেই জানা। আমার কথা শুনে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সে ডিপ্লোম্যাটিকালি বললো, ‘হ্যা, এটা হোম, কিন্তু ঐটাও হোম।‘
‘Why?’
‘…’
‘I don’t understand. Help me understand.’
‘Because our family is there.’
‘No daddy, our family is here. Me, you, and mummy.’
আমার কথা শুনে বাবা ভাবতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। ‘Our extended family is there. You have your dada, your aunties and uncles, lots of people. ওরা সবাই তোমার অপেক্ষায় আছে।‘
‘But I don’t want to go.’
বাবা হাসে।
দেশে ফেরার ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতে আমার আরো কয়েক বছর লেগে যায় – বাবার পোস্টিংয়ের সময় ফুরিয়ে এসেছিল। তাছাড়া আমার মা‘র খুব ইচ্ছা ছিল, তার ডেলিভারি বাংলাদেশে হবে, তার বাচ্চারা বাংলাদেশে বড় হবে।
আরো বড় হয়ে বুঝি, মায়ের সেই বাংলাদেশ আসলে দেশটা না – তার ফ্যামিলি ঢাকার যে অংশটুকুতে থাকে, মূলত সেটা এবং তার আশেপাশের কিছু এলাকা। (আমার ধারণা, এটা মা কনশাসলি করে নাই।) অন্যভাবে বলতে গেলে, দিনের শেষে বেশিরভাগ বাংলাদেশির জন্য ‘দেশ‘ মানে আসলে ফ্যামিলি।
শেষ পর্যন্ত দেশেই মা‘র ডেলিভারি হয় – হলি ফ্যামিলি হসপিটালে। কিন্তু লং রানে আমার ফ্যামিলির দেশে থিতু হওয়ার প্ল্যানটা খুব একটা সফল হয় নাই।
আমার জেনারেশনের আরো অনেকের মতো এতদিনে প্রবাসেই আমার নিবাস। কৈশোরে যাদের সাথে একসাথে পড়তাম, কোচিং করতাম, সন্ধ্যায় ক্রিকেট-ফুটবল খেলে-টেলে আড্ডাবাজি করতাম, তারপর সবাই মিলে হৈ হৈ করতে করতে ক্যাম্পের বাজার বা স্টার কাবাব বা এরকম কোন একটা স্মৃতির কারখানায় ঢুকে পড়তাম – ঐ সমস্ত পোলাপানের সিংহভাগই এখন বিদেশে।
অতএব, আমাদের বাবা-মা‘র জেনারেশনের অনেকেরই জীবন কাটে প্রবাস-নিবাসের ট্রানজিটে। সন্তানকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে তাদেরকে এয়ারপোর্টে হাইফেনের মতো বসে থাকতে হয়। মনে মনে অবশ্য তাদের মহাভ্রমণটা সার্বক্ষণিক – স্মৃতির হ্যান্ডব্যাগ আর নিঃসঙ্গতার স্যুটকেস নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা এক দেশে হেঁটে-ফিরে-খেয়ে-দেয়ে ক্লান্ত হয়ে একসময় তারা আরেক দেশে ঘুমোতে যায়।
আবার বিদেশে এলে উল্টা চিত্র – তাদের মন পড়ে থাকে হাজার হাজার মাইল দূরের সেই দেশ বা ফ্যামিলির ভৌগলিক সংজ্ঞায়।
একটা দেশ স্বাধীন হওয়ার এক জেনারেশনের মধ্যেই কীভাবে এরকম একটা সিচুয়েশন একদম নর্মাল হয়ে যায়? এবং তাতে শান্তিপূর্ণভাবে ফেয়ার ইলেকশন করার পৌনঃপুনিক ছেলেমানুষী আবদারটা পূরণ হওয়া-না হওয়ার কোন ভূমিকা আছে কিনা?
সেসব বিষয়ে কিছু বলতে পারলে ভালো হতো।
কিন্তু সেই কাজের জন্য আগে থেকেই অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ সেট হয়ে আছেন। তারা বিবৃতি দেবেন, টক শো‘র টেবিল চাপড়াবেন, লোডশেডিংয়ের মধ্যেও আলোকবর্তিকার মতো সমাজকে পথ দেখাবেন।
আমি তো স্রেফ স্মৃতিকাতর, তাশফীন মাহমুদ-টাইপ একটা মানুষ। ছোটবেলায় বিলেত থাকা না হলে… না, ’৯৬ সালের সেই দিনটায় শিশু হসপিটালে যেতে না হলে আমি হয়তো দেশেই কোথাও, রঙ্গন গাছঅলা কোন একটা পুরানো বাড়িতে হাসিমুখে জীবন পার করে দিতাম।
হে প্রবাসী, আপনি?
টিপটিপ বৃষ্টি। প্লে-গ্রাউন্ড।
স্কুলের সেই লাইব্রেরি।
McDonald’s-এ বাচ্চাদের জন্য হ্যাপি মীল। Asterix ধার চাইতে গিয়ে শিবলীর হাতে-পায়ে ধরা। কাঁচের একুয়েরিয়ামে ট্যাডপোল, ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চের লম্বা লাইন।
সেই ট্রি-হাউজটা। উইন্টারে শহরজুড়ে বরফের সাদা চাদর। চান্স পেলেই পাউডারের মতো নরম তুষারগুঁড়া দিয়ে স্নো-ম্যান বানানো।
বন্ধুদের সাথে হৈচৈ করতে করতে স্নো-বল যুদ্ধ।
নেহাল যেদিন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একটা জার্সি পেয়ে আনন্দে সারা বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করেছিল। ইস্ট লন্ডনের মেলায় নিউজপেপারে মোড়ানো তেল চিটচিটে ফিশ এন্ড চিপস – মল্ট ভিনিগারের কি যে বিচ্ছিরি স্বাদ!
ক্রিসমাস ইভ‘এ স্যান্টা ক্লজ আসার অপেক্ষায় অপেক্ষায় একসময় ঘুমে ঢলে পড়া। ইশ, একবার যদি রুডলফের সাথে আকাশে ঘুরে বেড়াতে পারতাম!
বাবার কাছ থেকে যখন ডিকশনারি ব্যবহার করা শিখলাম। শুটকি মাছের গন্ধ থেকে বাঁচতে সেই লম্বা, গোলাপি ক্যানের (এবং আজকালকার স্ট্যান্ডার্ডে সম্ভবত টক্সিক) এয়ার ফ্রেশনার।
মা‘র সাথে গল্পের বই পড়া, বইয়ের দোকানে ঘুরে বেড়ানো, হাঁটতে হাঁটতে গল্প করা।
টাইরানের সহজ-সরল হাসিটা, ওর মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল – শেষপর্যন্ত একটা ভাই-ই হয়েছিল ওর।
ভবনীতা নামের সেই শাড়ির দোকানটা, যার উপরতলাতেই দোকানমালিকের ছেলেটার সাথে একদিন খেলেছিলাম।
প্রতিবেশী সেই বুড়ি মহিলাটা, নিজের বাগানের স্ট্রবেরি গাছ উজাড় করে যে আমাকে খেতে দিত। (কি যেন নাম ছিল? এলিজাবেথ? মার্গারেট?) আমার স্ট্রবেরি খেতে ভালো লাগতো না, তবু তাকে খুশি করতে এক-দুই কামড় দিতাম – বুড়িটা ঘোলাটে নীল চোখে তৃপ্তি মেখে হাসতো।
হলিডে করতে প্যারিস ঘুরতে যাওয়া – এখনো কি hovercraft বলে কিছু আছে? লোক চড়ে তাতে? বদলি লাঞ্চলেডির ভুলে স্কুলে একবার পর্ক সসেজ খেয়ে ফেলেছিলাম।
জোরে বাতাস হচ্ছিল একদিন – খেলার মাঠে উড়ে আসা Mars চকলেটের একটা মোড়কে বেখেয়ালে পাড়া দিলাম। দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে কেন যেন ভাবলাম, চকলেট নাই, তার মানে কি মোড়কটা মরে গেছে? আমি কি একটা চকলেটের লাশে পাড়া দিয়ে ফেললাম?
মাঝেমাঝে বয়সের দোষে একদম সিলি কোন কারণে হাহাহিহি করে গড়াগড়ি যেতাম।
এখনো, এই বয়সে চান্স পেলে তা-ই করবো মনে হয়।
কিন্তু সেরকম চান্স আর পাই না।
এত স্মৃতির ভিড়েও আমার আমার লন্ডন জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলি বাস্তবের না, অবাস্তবের – আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যে স্বপ্নগুলি দেখতাম, সেসবের। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, একদম জীবন্ত সব স্বপ্ন দেখতাম।
মাঝেমধ্যে আবার স্বপ্ন মিলেও যেত। (বড় হয়ে ঘাটাঘাটি করে দেখলাম, ব্যাপারটা বেশ কমন।)
কিন্তু তখন, ঐ বয়সে লন্ডনে বসে আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি – বাংলাদেশে আমার জন্য রাক্ষস-খোক্ষস অপেক্ষা করছে। তাদের উপদ্রবে আমার মনে হবে, আমি কোন দুঃস্বপ্নে বাস করছি।
আমার মায়ের পেটটা আরো স্ফীত হয়।
আমাদের রিটার্ন ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে আসে….
[ চলবে ]