বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ১৭

পর্ব ১৭

লেখার আকার

বাচ্চাদের ভালোবাসার ক্ষমতা অসীম, কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা সেটাকে ক্ষুন্ন করি। ‘আমরা‘ মানে সমাজ, রাজনীতি, পুঁজিবাদ, বড়দের পৃথিবী, ফ্যামিলি – যে নামেই সেই আগ্রাসনটাকে সম্বোধন করা হোক না কেন।

ছোটবেলায় আমাদের স্বপ্নগুলি হয় ইস্পাতের মতো। সুপারহিরো হয়ে সবাইকে রক্ষা করবো, আইসক্রিম বিক্রেতা হয়ে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাইকে আইসক্রিম খাওয়াবো, ডাক্তার হয়ে সবাইকে সুস্থ করে তুলবো – এই টাইপ। বিশাল পরিধির একেকটা স্বপ্ন; দ্ব্যর্থহীন এবং নিঃস্বার্থ। যেন আমরা প্রত্যেকে এক একটা জনহিতকর পারমাণবিক বোমা, বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছি।

বড় হতে হতে আনফরচুনেটলি আমরা আবিষ্কার করি, সেই বিস্ফোরণটা অসম্ভব। তার চেয়েও ভয়াবহ অববোধন – বিস্ফোরিত হতে পারলেও তাতে করে হয়তো কিছুই বদলাবে না। কারণ পৃথিবাটা একেবারেই, একেবারেই ফেয়ার না।

চুলের সিঁথির মতো চিকন একটা কানাগলি। সেখানে ডজনখানেক বাড়ি। মাঝখানে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। যাদের জমি, তাদের বাড়িটা পাশেই – বিভিন্ন সাইজের দালানকোঠার ভিড়ে একতলা টিনের একটা বাড়ি। আমার নানুবাসাটা কি L-shaped ছিল? নাকি অন্য কোন shape এর? দোতলা ছিল, নাকি ততদিনে তিনতলা হয়ে গেছে? এতদিন পর সব ডিটেইলস আমার মনে নেই।

কিন্তু আবার অনেক কিছুই – আমার মামাদের পোস্টারময় রুম, নানা-নানীর বেডরুম, রান্নাঘরের দিকে যেতে ছোট করিডরটা, সেই ছোট্ট বাথরুম, সামনের বারান্দাটা, দোতলায় ওঠার সেই সিড়ি – এখনো চোখে ভাসে। না চাইতেই অনেক কিছু ঝট করে মনে পড়ে।

কানাগলিটার একমাত্র ফাঁকা জায়গাটুকুতে যখন খেলায় চান্স পেতাম না, আমার খুব মন খারাপ হতো। কিন্তু সেই খারাপ লাগা শুধু নিজের জন্য ছিল না। ঐখানে যারা খেলতো, তাদের জন্যও দুঃখ হতো। এইটুকু একটা স্থানে ছোটাছুটি করতে পেরেই সবাই কত খুশি! লন্ডনে আমাদের বাসার কাছে যে প্লে-গ্রাউন্ডটা ছিল, সেরকম একটা প্লে-গ্রাউন্ডে হয়তো এই ছেলেগুলোর কখনোই খেলার ভাগ্য হবে না। আমি তো তাও সেই সুযোগটা পেয়েছি।

আমি চারদিকে তাকাই – আশেপাশে কনস্ট্রাকশন, ইট-সুরকির স্তূপ। গুড়া ইটের সিঁদুরে জায়গাটা ছেয়ে আছে। খেলাচ্ছলে যে বাতাসটা সবাই ফুসফুসে টেনে নিচ্ছে, তার রং লাল।

সর্পগুচ্ছের মতো এখানে-সেখানে রড পড়ে আছে। খেলতে খেলতে কারো হাতে-পায়ে সেই রড ঢুকে গেলে নির্ঘাত হসপিটালে যেতে হবে। কিন্তু ইংল্যান্ডের মতো 999এ ফোন করলেই এদেশে এম্বুলেন্স চলে আসে না। এখানে এম্বুলেন্স সাধারণত দেখা যায় নাটক-সিনেমায়, বা হঠাৎ কোন বড় রাস্তায়। বেশিরভাগ হসপিটালেরই এম্বুলেন্স নাই – বা থাকলেও যথেষ্ট নাই।


মা’কে চেক-আপ করাতে বা এরকম কোন কারণে আমরা হলি ফ্যামিলি হসপিটালে গিয়েছিলাম। ভেতরে ঢুকতে পারবো না জেনেও জোর করে আঠা হয়ে গেলাম, হাসপাতালের বাগানটায় খেলবো বলে।

মা ভেতরে, বাবা একটু দূর থেকে আমার উপর চোখ রাখছে – এমন সময় আমি লক্ষ্য করি, সানশেড জাতীয় কিছু একটার নিচে একটা জীর্ন টাইপের এম্বুলেন্স পার্ক করা।

গাড়িটার দুই সাইডের দরজা খোলা। ড্রাইভারটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে একটু পরপর হাই তুলছে, আর নিজেকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে আরেকজনের সাথে গল্প করছে। কিন্তু একটা এম্বুলেন্স তো এভাবে দিনে-দুপুরে বসে থাকার কথা না! ড্রাইভারের ইউনিফর্মই বা কোথায়? চারপাশে নিশ্চয়ই অনেক ধরনের এক্সিডেন্ট, এমার্জেন্সি হচ্ছে। অথচ লোকটার যেন কোন গরজই নাই।

কোন মানে হয়?

আমি তাদের কাছে গিয়ে গল্প করা শুরু করলাম। ওয়াও, তোমরা এম্বুলেন্স চালাও! কি কুল ব্যাপারটা! প্রথমে এই টাইপ কথাবার্তা। ড্রাইভারটাও পাত্তা পেয়ে খুব খুশি – আমাকে বললো, ‘হর্ন দিবা?‘

হসপিটাল এলাকায় হর্ন বাজানো অন্যায়, তবু আমি তাকে খুশি করার জন্য অত্যন্ত আনন্দের সাথে হর্ন দিলাম।

‘সাইরেন শুনবা?‘

কিন্তু আমি রাজি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই বললো – ‘না থাক, সাইরেন দেওয়া যাবে না।‘

জানতে চাইলাম, ‘এই হসপিটালে কয়টা এম্বুলেন্স?‘

‘দুইটা। কিন্তু একটা নষ্ট, রোগী নেওয়া যায় না।‘

আমি সাধ্যমত বাংলায় আসল কথাটা পাড়ি – ‘তাহলে what are you doing here? তোমরা কেন বসে আছো, রোগী নিতে যাচ্ছো না?‘

সঙ্গে সঙ্গে সে গম্ভীর হয়ে বলে, ‘বললাম না, একটা নষ্ট। এইটাই নষ্টটা।‘

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটে। আমি এম্বুলেন্সের ড্যাশবোর্ডে বিভিন্ন ডায়াল দেখে মুগ্ধ হওয়ার ভান করি। পাশ থেকে ড্রাইভারের সাগরেদটা বলে, ‘বয়স কম হৈলেও সেয়ানা আছে!‘ তারপর দুইজন মিলে নিজেদের মধ্যে কঠিন বা কথ্য বাংলায় আমাকে বা হসপিটালের রোগী সম্প্রদায় নিয়ে বিরক্তভাবে আলোচনা করে।

এক সময় ড্রাইভারটা বলে, ‘তুমি এখন যাও, এম্বুলেন্সে হসপিটালের কর্মচারি ছাড়া কারো বসা নিষেধ।‘

আমি সুরসুর করে সিট থেকে নেমে আবার বাগানে ছোটাছুটি শুরু করি। একটু পরে বাবা হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে, ‘তাশফীন, আমি একটু আগে তোমাকে ডাকাডাকি করে পেলাম না, কই ছিলা?‘

আমি এম্বুলেন্সটার দিকে ইশারা করে বললাম, ‘There.‘

বাবা হতাশ হয়। ‘আমি তো তোমাকে খুঁজতে ভেতরে চলে যাচ্ছিলাম! তোমাকে না বলছি strangerদের কাছে যাবা না! It’s not safe!‘

আমি চুপ।

‘এভাবেই কিন্তু childrenদেরকে ছেলেধরা নিয়ে যায়!‘

‘But daddy, why would ছেলেধরাs be in an ambulance?’

‘….’

‘Unless they were sick and needed to go to the hospital.’

‘এত বেশি বোঝা লাগবে না। কেন গেছ?‘

আমি জন্মদাতাকে স্যরি-টরি বলে সাত-পাঁচ বুঝাই। অবশেষে সে বলে – ‘যাই হোক, তোমার ভালো লাগছে এম্বুলেন্স দেখে?‘

‘হ্যা!‘

‘কেমন ভালো? Is it like the ambulances we saw in England?’

‘No, it’s really old.’

বাবা হাসে। ‘হ্যা, it’s old. They don’t have many new ambulances here.‘ তারপর যোগ করে, ‘Well at least they have an ambulance. That’s good.’

‘But it doesn’t work, it’s broken.’

‘কে বললো তোমাকে?‘

আমি এম্বুলেন্স ড্রাইভার ও তার সাগরেদের দিকে তর্জনী তুলি। দূর থেকে তারা শীতল দৃষ্টিতে তাকায়।

একটু পরে এম্বুলেন্সটা স্টার্ট নিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়।


গ্রীন রোডের পরিচিত প্রতিবেশিদের কারো বাড়িতেই আমার সাইজের কোন বাচ্চা ছিল না। বাইরে খেলতো যেই ছেলেগুলি, তারা আশেপাশের মহল্লার।

তাদের নিজেদের এলাকায় এটুকু খেলার জায়গাও নাই।

কাছে-ধারে আমার বয়েসী বলতে শুধু নানুবাসায় যে মহিলাটা কাজ করতো, উনার ছেলে – নাম মোজাম্মেল। বয়েসে আমার চেয়ে এক বছরের বড়। মোজাম্মেলের বাবা ছিল না, বা তাদেরকে ফেলে চলে গেছে, বা এরকম একটা কিছু। সেসব নিয়ে মোজাম্মেলের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু প্রায়ই অন্য কোন কারণে সে মন খারাপ করে থাকতো।

গুল্লি খেলায় আমার পারদর্শিতা দেখে মোজাম্মেল হতবাক। সে নিজেও এত ভালো গুল্লি খেলতে পারে না। ‘আমার মার্বেল নাই তো, থাকলে পেকটিশ কৈরা হাত পাকাইতাম‘ – আফসোস করে বললো।

আমি কাঁঠাল বাগানের বাসায় ফোন করে কমল দাদাকে দিয়ে মার্বেল জোগাড় করালাম। দাদা নানুবাসায় একটা কাগজের ঠোঙা হাতে উপস্থিত হয়ে স্বভাবসুলভ তোতলা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘দোস্ত, কা-কা-কাহিনী কি? হঠাৎ মা-মা-মার্বেল চাইলা যে?‘

আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কাগজের ঠোঙাটায় উঁকি দেই।

‘এখানে কয়টা মার্বেল আছে?‘

‘পাঁ-পাঁ-পাঁচ-সাতটা, এর বেশি পা-পাই নাই। আজকাল মা-মার্বেল দোকানে কি-কিনতে পা-পাওয়া যায় না।‘

‘Is it পাঁচটা or সাতটা?‘

‘তু-তুমি গুনে দেখ।‘

আমি হাতের তালুতে ঠোঙাটা উপুড় করে দেখি, 7 marbles. একটা অন্যগুলির চেয়ে বেশ খানিকটা বড়। ভেতরে সুন্দর নকশা। এটা আমার নিজের জন্য রাখতে হবে। কিন্তু মোজাম্মেল তো আমার ফ্রেন্ড, ওকে তো না দিলে মন খারাপ করতে পারে…

চমকে দিয়ে নানী এসে বলে, ‘ভাইয়া, তোমার হাতে কী?‘

আমি মার্বেলগুলি সঙ্গে সঙ্গে পকেটে ঢুকাই। কিন্তু কমল দাদা বলতে শুরু করে, ‘মা-মা-‘

‘কী, মার্বেল?‘ নানী বলে। ‘তাশফীন, তুমি মার্বেল নিয়ে কি করবা?‘

আমি ইতস্তত করে দৌড়ে ভেতরে চলে যাই। মোজাম্মেলের সাথে আমার খেলাটা নানীর একদম পছন্দ না – কাজেই, কথা বাড়ানো মানেই সমস্যা।

কিন্তু টানা কয়েকদিন প্র্যাকটিস করেও মোজাম্মেলের গুল্লি খেলায় খুব একটা উন্নতি হলো না। শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে আমি মোজাম্মেলকে সবগুলি মার্বেল দিয়ে বললাম – ‘Keep them, you need them more than I do!‘

ইংরেজি জানা না সত্ত্বেও আমার কথা বুঝতে তার ভুল হয় না। সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে বলে, ‘আচ্ছা!‘


যতদূর মনে পড়ে, মোজাম্মেলের মা নানু বাসায় সাধারণত ছুটা কাজ করতেন। মোজাম্মেলকে নিয়ে কোনভাবে টিকে থাকতেই তাকে একাধিক বাসায় কাজ করতে হতো।

একটা ভাতের হোটেলেও মাঝেমধ্যে রান্নার কাজ করতেন।

একদিন আমার পিপাসা পেয়েছে, পানি খাবো। কিন্তু ডাইনিং রুমের জগ-টা পানিশূন্য। মোজাম্মেলের মাকে রান্নাঘর থেকে আসতে দেখে আমি বলে উঠলাম, ‘আন্টি, পানি খাবো! কিন্তু জগে পানি নাই!‘

বাসার হাসির রোল পড়ে গেল। ‘মোজাম্মেলের মায়েরে বলে কিনা আন্টি!‘

আমি অবাক হই। মোজাম্মেল আমার বন্ধু, বন্ধুদের মায়েরদেরকে আমি সাধারণত তো ‘আন্টি‘ই বলি। ‘What should I call her then?’

আমি আর মোজাম্মেলের মা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকি।পাশ থেকে উত্তর আসে, ‘বুয়া বলবা, বুয়া বলতে হয়!‘

কিন্তু একবার কাউকে সম্মান দিলে এভাবে ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আমি সযত্নে ডাকাডাকির পলিটিক্স এড়িয়ে বললাম, ‘পানি খাবো, কিন্তু জগে পানি নাই।‘

‘আনতেছি,‘ বলে নাকে ছোট্ট একটা নাকফুল পরা মানুষটা জগ নিয়ে পানি আনতে চলে যায়।

আমি আর কখনো তাকে ‘আন্টি‘ বলে সম্বোধন করিনি – কিন্তু কখনো ‘বুয়া‘ও ডাকি নাই।


একটা কাজে মোজাম্মেল বেশ পারদর্শী ছিল – মোটামুটি বিড়ালের ক্ষিপ্রতায় ওয়াল বেয়ে উঠা। পাশেই যেহেতু কনস্ট্রাকশন, একটা ছোটখাটো উন্মুক্ত দেয়াল ছিল।

আস্তে আস্তে সেই দেয়াল বড় হতে হতে বেশ খানিকটা উঁচু হয়ে গেল।

কিছুদিনের মধ্যেই সেটা বাকি কনস্ট্রাকশনের সাথে জোড়া লেগে যাবে।সেই দেয়ালটা দেখিয়ে মোজাম্মেল ঘোষণা দিলো, এত উঁচু দেয়ালও সে সহজেই উঠতে পারবে।

আমি সন্ধিগ্ধভাবে বললাম, ‘এটা অনেক উঁচু।‘

সে খুব কনফিডেন্টলি বললো – ‘পারুম, আমি পারুম।‘

তখন মাঝেমধ্যে আমি বাবার সাথে বিকালে হাঁটতে বের হই। ঐ আমলে গ্রীন রোডের প্রধান পরিচিতি, একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কয়েক ফুট পানি জমে যায়। ‘গ্রীন রোড‘ যে ‘গ্রীন কর্নার‘ না, পৃথক একটা এলাকা, সেটাই অনেকে জানতো না। সেই এলাকার এক প্রান্তে – নানুবাসার গলি থেকে বের হতেই হাতের ডানে – লাইন দিয়ে কয়েকটা বেতের দোকান ছিল। সেখানে সুন্দর সুন্দর বেতের ফার্নিচার, শো পিস তৈরি হতো। দোকানগুলির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে নাকি ভার্নিশের গন্ধ এসে লাগতো।

একদিন আমি-বাবা দোকানগুলির পাশ দিয়ে হাঁটাহাটি করে নানুবাসায় ফিরছি, এমন সময় মোজাম্মেল দূর থেকে চিৎকার করে আমাকে ডাকতে থাকে – ‘তাস্পিন বাইয়া! তাস্পিন বাইয়া!‘

আমি ওকে দেখে হাত নাড়ি। আমাদের হতভম্ব করে মোজাম্মেল ছুটে দেয়ালটার দিকে এগিয়ে যায়। বাবা চিৎকার করে উঠে, ‘আরে পড়বে তো ছেলেটা, পড়ে যাবে!‘

কিন্তু সে পড়লো না। বরং তরতর করে উঠে গিয়ে আমরা কাছে আসা পর্যন্ত সরু দেয়ালটার উপর নাচানাচি করতে থাকলো। আমি তো ইমপ্রেসড্‌।

ওর প্রশংসা করে কিছু বলবো বলতে যাবো – এমন সময় মোজাম্মেল দেয়াল থেকে পা ফসকে পড়ে যায়। পড়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অজ্ঞান হয়ে যায়। বাবা ছুটে গিয়ে তাকে টেনে তোলে।

‘এইটা কাজ করলি একটা? ব্যথা পাইছিস? মাথায় লাগে নাই তো?‘

হুঁশ ফিরে পেয়ে মোজাম্মেল ডুকরে কেঁদে উঠে।

‘গাধা কোথাকার! খবরদার, আর দেয়াল বাওয়াবাওয়ি করতে যাবি না! তোর কিছু হলে তোর মা‘র কী হবে, কখনো চিন্তা করছিস?‘

আমি, বাবা, আর বাবার কাঁধে ভর দিয়ে ফোঁপাতে থাকা মোজাম্মেল – আমরা তিনজন নানুবাসার সিড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে উঠি।


হয়তো father figure ছিল না বলে মোজাম্মেল আমার বড় মামার পিছন পিছন ঘুরঘুর করতো। এমন কি ভাব-ভঙ্গিতেও সে আমার বড় মামাকে নকল করার চেষ্টা করতো।

আমার কাছে জিনিসটা খুব ফানি লাগতো, কিন্তু কিছু বলতাম না। তার এই ভক্তি যে বড় মামাও কখনো টের পেয়েছে – মনে হয় না।

আমার মামাদের রুমে প্রায়ই Boney M আর Abbaর গান বাজতো। আমার শুনতে ভালো লাগতো না। প্রত্যেকবার টেপ রেকর্ডার অন হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি জিজ্ঞেস করতাম, ‘Do you have any songs by Michael Jackson?’

তাদের কাছে মাইকেল জ্যাকসনের কোন ক্যাসেট ছিল না।

‘You should get his songs,’ আমি বলতাম। ‘Especially “Thriller”. “Thriller“ is my favourite.’

টানা কয়েকবার একই কনভার্সেশনের পর আমার বড় মামা বুঝে ফেলে – যতদিন আমি আছি, Thriller এর ক্যাসেট না আসা পর্যন্ত আমি তাদেরকে শান্তিতে গান শুনতে দিবো না। অতএব, আপাতত গান-টান বাদ।

মামাদের ঘরে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের গোরিলা ছিল। এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগতো।

গোরিলাটাকে দেখে আমার লন্ডনের টয় গোরিলাটার কথা, রিফাকে ভয় দেখানোর কথা মনে পড়ে যেত।


বাচ্চাদের খেলার জায়গাটায় প্রায়ই দেখা যেত, ছোট্ট দুইটা ঢিবি করে মুখোমুখি দুইজন মানুষ সারাদিন ইট ভেঙে যাচ্ছে। একজন পুরুষ, একজন মহিলা।

পুরুষজনের মাথার উপর একটা ছাতা থাকতো। টিফিনকারি টাইপ একটা পাত্রে সে প্রতিদিন ভাত, ডাল, সবজি নিয়ে আসতো। মহিলাটার কোন ছাতা ছিল না। প্রচন্ড গরমে সে পরনের ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা দিয়ে মাঝে মাঝে কপাল মুছতো। দুপুরে সে একটা সস্তা বনরুটি, টিনের গ্লাসে এক গ্লাস পানি, আর একটা পান খেত। কখনো হয়তো বা সাথে এক গ্লাস চা।

পুরুষ কলিগটার সাথে তার কখনো কথা হতো না, কিন্তু ব্যাটা তার চেয়ে বেশি ইট ভেঙে ফেলছে – এই ব্যাপারে মহিলাটা স্পষ্টই একটু নার্ভাস থাকতো।

কখনো কখনো মহিলাটা তার ছোট্ট বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে ইট ভাঙতে বসে। প্রথম দিনে সে লোকটার কাছে গিয়ে ছাতাটা ধার চায় – বাচ্চাটা একটু ছায়ার মধ্যে রাখতে পারার আশায়। লোকটা রাজি হয় না। মহিলটা খানিকক্ষণ পীড়াপীড়ি করে, তারপর গালাগালি করে আবার ইট ভাঙতে বসে যায়।

ভাষার দূর্বলতা সত্ত্বেও লোকটার কাছে আমি এগিয়ে যাই। ইশারা-ইঙ্গিতে আমি মহিলাটার সাপোর্টে ছাতা ধার চাই। কনটেক্সটের কারণেই হয়তো লোকটা আমার অনুরোধ বুঝতে পারে। আমাকে সে উল্টা বোঝায়, তারও তো বউ-বাচ্চা আছে, রোদে কাজ করলে সে অসুস্থ হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে কে দেখে রাখবে?

আমার কাছে এমন কঠিন প্রশ্নের কোন উত্তর ছিল না। তাই নানীর কাছে গিয়ে বললাম – ‘নানু, can you give me an umbrella?’

নানী অবাক হয়ে বলে, ‘ক্যান ভাই? আমব্রেলা লাগবে কেন, আজকে তো বৃষ্টি নাই!‘

আমি মহিলাটার দুরবস্থার কথা বুঝিয়ে বললাম। নানী আমার সমাজ সচেতনতায় মুগ্ধ। বাসাময় আমরা মহিলাটার বাচ্চার জন্য ছাতা খুঁজে বেড়াই, কিন্তু কোন ছাতা নাই।

অবশেষে আমার খালা ওরফে হিয়ামণি একটা ছাতা খুঁজে পায়। একটা ডাঁট ভাঙা, তবে কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। সেই ছাতা হাতে পেয়ে মহিলাটা ড্যাবড্যাব করে তাকায়, কিছু বলে না।

একটু পরে আমি বারান্দায় গিয়ে দেখি, সে ছাতার নিচে বাচ্চাটার সাথে শুয়ে আছে। মা-শিশু খুনসুটি করতে করতে আনন্দে ঝলমল করছে। কতই বা বড় হবে বাচ্চাটা? আমার বোনের চেয়ে না হয় কয়েক মাসেরই বড়? অথচ একজন ফ্যানের নিচে রাবারক্লথের উপর পরম যত্নে শুয়ে আছে, আর আরেকজন ইট-সুড়কির পাশে ময়লা একটা কাঁথায়।

পৃথিবীটা এরকম কেন? আমার মন খারাপ হয় যায়।

এত বছর পরও মাঝেমধ্যে তাদের কথা আমার মনে পড়ে যায়।

পরদিন মহিলাটা ইট ভাঙতে বসে। সাথে ছাতা নেই দেখে আমি গিয়ে তাকে সে-ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি। পাথরের মত চোখ করে মহিলাটা বলে, ‘ছাতা চুরি হৈয়া গেছে।‘

আমি মন খারাপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।

‘তুমি যে ছাতাটা দিছিলা, সেজন্য অনেক ধন্যবাদ।‘


কিন্তু নানুবাসার কথা ভাবলেই সবার আগে মনে পড়ে সেই অশরীরী অভিজ্ঞতার কথা।

কেন যেন বারান্দাটায় মাঝে মাঝে একটা পচা গন্ধ পাওয়া যেত। অবিকল মাংস-পচার গন্ধ। ‘পাওয়া যেত‘ বলা ভুল হচ্ছে – শুধু আমি আর মোজাম্মেলই সেই গন্ধটা পেতাম। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে উপসংহারে আসলাম – হয়তো এটা শুধু ছোটরাই টের পায়, এমন কোন ঘ্রাণ।

শুধু যে দুর্গন্ধ পেতাম, তা না। ভয়ে আমাদের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যেত। যেন বারান্দাটার ডান সাইড কিছু একটা মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায়। অশরীরী কিছু। অদৃশ্য কিছু। খারাপ কিছু।

মাকে ব্যাপারটা বললাম, কিন্তু যেহেতু আর কেউ সেই গন্ধ পাচ্ছিল না, আমাকে বলা হলো – বারান্দায় যেও না। তাছাড়া ভরদুপুরে ভেতরে থাকবা, বারান্দায় গরমের মধ্যে কী?

তাই গন্ধ না থাকলে বারান্দায় যেতাম, থাকলে যেতাম না। এতক্ষণে হয়তো বুঝে গেছেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের চরিত্রগুলিকে দেখতে আমার খুব ভালো লাগতো। কিন্তু একদিন একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ টেম্পারেচার যেন ধপ করে অনেকখানি কমে গেল। সাথে সেই পচা গন্ধ।

আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। স্পষ্ট টের পেলাম, পাশে লোমশ কিছু একটা এসে দাঁড়ালো। আমি ছিটকে গিয়ে বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

সেদিন রাতে স্বপ্নে দেখি, ভরদুপুরে আমি বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে আছি। এভাবে কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। কেন যেন আমার খটকা লাগে – তখন আবিষ্কার করি, দূর থেকে যাকে দেখছি সে আসলে আমি না – আমার রূপ ধারণ করা কেউ।

স্বপ্নে আমার গা ছমছম করে উঠে। এমন সময় সেই ‘আমি‘ ঘুরে আমার দিকে তাকায় – তার চোখে আগুন, কন্ঠে বীভৎস অট্টহাসি। আমি নিশ্চিত হই, এটা সেই লোমশ জীব …

চিৎকার করে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।

পরদিন দুপুরবেলায় নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বারান্দায় যাই। আমি সেই প্রাণীটাকে ফেইস করবো।

কোন গন্ধ নাই।

ভয়ে ভয়ে আমি ডানদিকের অংশটায় গিয়ে দাঁড়াই।

একটু পরই নাকে সেই দুর্গন্ধ। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। টের পেলাম, পাশে সেই লোমশ জীবটা এসে দাঁড়ালো।

তার স্পর্শে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে কারেন্টের মতো আতংক বয়ে যায়। কিন্তু না – আমি বিস্ময়ভরে বুঝি – আজকে সে ভয় দেখাতে আসেনি। আজ তার ভাব-ভঙ্গি একটু ভিন্ন। একটা বাচ্চা দুষ্টুমি করে লজ্জিত হলে যেমন করে, অনেকটা সেরকম।

রিল্যাক্স হয়ে আমি প্রায় হেসে ফেলি। চোখ খুলে তাকে দেখতে চাই, কিন্তু কোন শব্দ ব্যবহার না করেই সে বুঝিয়ে দেয় – চোখ খোলা যাবে না। এটাও বুঝলাম, আমাকে ভয় দেখিয়ে সে স্যরি।

আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘That was you in my dream, wasn’t it?’

সে উত্তর দিলো না। আমাকে বুঝাতে থাকে, সে আসলে খারাপ কেউ না। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক রাক্ষস আছে, আমাকে সে তাদের ব্যাপারে সাবধান করতে এসেছে…

‘তাশফীন, বারান্দায় কি করো?‘

কাঁচের মতো সবকিছু কেমন যেন ভেঙে যায়। লোমশ প্রাণীটা উধাও হয়ে যায়। চোখ খুলে দেখি, আমার ছোট মামা কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছে।

‘কার সাথে কথা বলতেছিলা? বারান্দায় তো কেউ নাই। Who were you talking to, মামা?‘

আমি কিছু বলতে পারি না, হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন