বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ২২

পর্ব ২২

লেখার আকার

অনেকদিন পর সত্যি সত্যি আমার গুল্লি পার্টির বন্ধুদের একজনের সাথে দেখা হয়ে যায়। আমি তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ি।

বিকালবেলায় বাসার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। কোথায় যেন যাবো।

হঠাৎ দেখি, আমার বয়েসী একটা ছেলে পিতৃস্থানীয় কারো সাথে হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। দুইজনেরই পরনে শার্ট-লুঙ্গি। লোকটার ভাবভঙ্গিতে ঈষৎ দুশ্চিন্তা। আমাকে দেখে ছেলেটা একটা দাঁত বের করা হাসি দিলো। নাম ভুলে যাওয়া বন্ধুকে দেখলে মানুষ যেভাবে হাসে, সেরকম।

তখন ধা করে আমার মনে পড়ে যায়। বাবু-কামালদের গ্রুপের যে ছেলেটা নেংটো হয়ে মার্বেল খেলতো, এই সে! কাপড় পরা অবস্থায় তাকে প্রথম দেখলাম – কী যেন নাম? তার হাসির প্রত্যুত্তরে তাই আমি ঐভাবেই হাসলাম। লোকটা হাঁটতেই থাকে, ছেলেটাও আগায়। আমাদের দুজনের মাঝ দিয়ে টুংটাং শব্দে রিকশার ঝাঁক ছুটে যায়।

উৎসুক গলায় সে বলে উঠে, ‘চিনসো আমারে? ভালো আছো?‘

‘হ্যা!‘

‘আমি আসছিলাম তোমার খবর নিতে। বাবুও আসছিলো। আইসা শুনি তুমি নানীর বাড়িত চৈলা গেছ!‘

‘হ্যা, তারপর আবার ফিরে আসছি!‘

‘অ।‘

‘তুমি কেমন আছ? বাবু, কামাল ওরা কেমন আছে?‘

‘বাবু ফার্ম গেটে কৈ যেন থাহে, আমার লগে কয়েক বচ্ছর আগে দেখা হৈছিল। তারপর জানি না।‘

‘আর কামাল?‘

‘কামাইল্লার লগে আর দেখা হয় নাই।‘

আমার একটু মন খারাপ হয়।

ছেলেটা বলতে থাকে, ‘আমি ভালো আছি, অহন কারনবাজার থাকি। আমার মায় আবার বিয়া বসছে।‘ তারপর সাথের লোকটাকে ইশারা করে যোগ করে – ‘এই ব্যাটারে, হ্যায় আমার সৎ বাপ।‘

লোকটা খুবই অস্বস্তিভরে আমার দিকে তাকায়। আমি সালাম দিলাম। সে ঘোঁত করে কিছু একটা বলে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়।

মোড়ের কাছে মিলিয়ে যাওয়ার আগে ছেলেটা হাত নেড়ে আমাকে গুডবাই দেয়। আমিও হাত নাড়ি। তারপর বাস্তবে ফিরি।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বুঝে যাই, আর কখনো তার নাম জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাবো না।


পা টিপে টিপে ১৯৮৫ সালে একদিন বড়দিন এসে হাজির হয়।

লন্ডনে থাকতে ক্রিসমাস ছিল প্রবল আনন্দের উপলক্ষ। ক্রিসমাস ইভ, মানে বড়দিনের আগের রাতে আমার সে কি উত্তেজনা! ফাদার ক্রিসমাস এসে গিফট দিয়ে যাবে। সবাই যে গিফট পাবে, তা না – শুধু লক্ষ্মী বাচ্চারা পাবে। তাই ২৫শে ডিসেম্বরের সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে আমি যথাসাধ্য ভালো হয়ে থাকার ব্যাপারে সিরিয়াস।

কিন্তু ঢাকায় যেন সেই ফাদার ক্রিসমাসের কোন অস্তিত্বই নাই। এমন কি –

‘Mummy, it doesn’t snow here!’

জন্মদাত্রী বোঝায়, এই দেশে তুষারপাত হয় না। এখানে বছরে ছয়টা ঋতু – গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত…

‘Then how can it be Christmas?’ আমি উদ্বিগ্ন গলায় বলি।

মা আমাকে ক্যালেন্ডারের সামনে দ্বারস্থ করে আশ্বাস দেয়, আজই বড়দিন। আমি তবু ব্যাপারটা মেনে নিতে পারি না।

‘But how will Father Christmas ride his sleigh if there’s no snow?’

মা তখন মন খারাপ চোখে আমার দিকে তাকায়।


আমি স্মৃতির শহরে ডুব দেই। ক্রিসমাস উপলক্ষে সেই শহর জুড়ে আলো।

প্রচন্ড ঠান্ডা, তাই সবার পরনে ভারি জামাকাপড়। বাবা, মা, আর আমি হাঁটতে বের হয়েছি। হয়তো আজকে আমার জন্য একটা প্রেজেন্ট কেনা হবে। স্পাইডারম্যানের একটা অ্যাকশন ফিগার আমার খুব পছন্দ। সুইচ চাপলে আলো জ্বলে। আগেই বাবাকে বলে রেখেছি, চাইলে সে ক্রিসমাস উপলক্ষে এটা আমার জন্য কিনে রাখতে পারে। বাবা বলেছে, সে ভেবে দেখবে।

লাইন ধরে আমার বয়েসী কিছু ছেলেমেয়ে দৌড়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘Where are you going?’

একজন বলে, ‘We’re going to build a snowman!’

‘Can I come?’

পাশ থেকে মা আমাকে নিরুৎসাহিত করা শুরু করে, ‘না আব্বু, এখন যাওয়া যাবে না, আমরা যে –‘

কিন্তু ততক্ষণে আমার দেহ-মন আর আমার নাই। আমি উইন্টারের সাথে, বড়দিনের আমেজের সাথে একাকার। স্নো ম্যান বানানোর এরকম সুযোগ কি হেলায় হারানো যায়? আকাশ থেকে ঝুরঝুর করে বরফ পরছে। ভেংচি কাটলে সেই বরফ জিভের উপর পড়ে গলে যায়। পৃথিবীটা বিশাল একটা সাদা ওভাকোট পরে স্নো ম্যান বানানোর জন্য রেডি হয়ে আছে। সেই ওভারকোটের উপর বুটের ছোপ ফেলে আমি ছুটে যাই।

পাশ থেকে বাবা মাকে সান্ত্বনার সুরে বলে, ‘যাক না, enjoy করুক…‘

মা চিন্তিত গলায় তবু আমাকে ডাকাডাকি করে।

বাতাসটা হিমশীতল। পবিত্র। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আমি আর আরেকটা ছেলে হঠাৎ বরফের মধ্যে খিলখিল করতে করতে পড়ে যাই। হাত-পা নেড়ে প্রাণপণে snow angel বানাই।

বাবা দৌড়ে আসে। তার মুখে হাসি। দূর থেকে মা‘র ডাকাডাকি আরো প্রকট হয়। আজ আমি কিচ্ছু শুনছি না। পাশের ছেলেটার দিকে তাকাই। আনন্দে সে ঝলমল করছে। আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হাসি। এই ছেলেটার নামও জানা হয়নি। জিজ্ঞেসও করিনি। শৈশব, প্রকৃতি, স্মৃতি – এগুলি নামের অনেক ঊর্ধ্বে।

আবার উঠে দৌড়। দৌড়াতে করতে গিয়ে আমার মাথা থেকে মাংকি ক্যাপ খুলে পড়ে যায়। মা-বাবা ছুটে আসে। বাবা আবার ক্যাপ পরিয়ে দেয়।

‘কেয়ারফুল বাবা, ঠান্ডায় নিউমোনিয়া হয়ে যাবে কিন্তু!‘ সে সাবধান করে।

সেই কান-ঢাকা টুপি পরা মাত্রই আবার যেই কাজ সেই। স্নো ম্যান বানানো হবে! প্রথমে একটা বড় ঢিবি করে শরীরটা, তারপর ছোট আরেকটা ঢিবির আকারে মাথা। চোখের জায়গায় দুইটা চকচকে কালো পাথর। একই ধরনের ছোট ছোট কয়েকটা পাথর সাজিয়ে বড় একটা স্মাইল। নাকের জায়গায় ক্লাসিক স্টাইলে একটা গাজর, মাথায় বৌলার হ্যাট…

কিন্তু আমি তো আসলে ছেলেমেয়েগুলির গ্রুপের কেউ না – শেষ পর্যন্ত যদি আমাকে ওদের সাথে স্নো ম্যান বানাতে না দেয়?

পাশ থেকে আরেকদল ছেলেমেয়ে হেঁটে আসে, সাথে টিচারগোছের একটা মহিলা। সবাই মিলে ক্রিসমাস ক্যারল গাইছে। কারো কারো হাতে ডোনেশন সংগ্রহের জন্য ছোট ক্যান। একটা আঁতেল টাইপের মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলে, ‘Where are you going?’

আমি চিৎকার করে জানাই, ‘To build a snowman!’

‘But why are you running? You can build a snowman anywhere!’

তাই তো! কী বলা যায়? এমনিতে একা একা স্নো ম্যান বানানোয় মজা নাই।

হাঁপাতে হাঁপাতে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে লজিক দেখাই – ‘Because it’s Christmas!’


চমকে দিয়ে আমার দাদা বলে, ‘দাদু, why don’t you go to Pan Pacific Hotel? They will have a Christmas tree and a Santa.’

‘Really?’ আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

‘Yes! When I was working in Biman, we had Christmas parties there….’

‘Where is it?’ বলে কাঁদো কাঁদো চোখে মাকে সুধাই, ‘Mummy can I go? Please mummy!’

দাদা ব্যাখ্যা করে, প্যান প্যাসিফিক ওরফে সোনারগাঁ হোটেল আমাদের বাসার কাছেই, কাঁঠাল বাগানের বিখ্যাত ঢালটা পার হয়ে আরেকটু এগোলেই…

সেই মুহূর্তে বাবা বাসায় ছিল না, আর ছোট্ট তাশনুভাকে ফেলে মাও যেতে চাচ্ছিল না। (এমনিতেও দেশে ফেরার পর থেকে মা লন্ডনের মতো যখন-তখন বাইরে যেতে চাইতো না।) তাই কমল দাদার উপর দায়িত্ব পড়লো আমাকে সোনারগাঁ হোটেলে নিয়ে যাওয়ার।

সেই তীব্র ঢালটা দিয়ে রিকশা যেন উঠতেই চায় না। পুরাটা পথ আমি টেনশনে থাকি, যেন একটু দেরি হলেই ফাদার ক্রিসমাস ওরফ সান্টা ক্লজ এবং তার প্রিয় রেইনডিয়ার রুডলফকে মিস করে ফেলবো।

হয়ও তাই।

আমরা হোটেলে গিয়ে দেখি, সান্টা আগেভাগেই চলে গেছে। লবির এক কোণায় ছোট্ট একটা ক্রিসমাস ট্রি। কেমন যেন বিহ্বল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রির গায়ে হাতে গোনা কয়েকটা অর্নামেন্ট, এক-দুইটা ডেকোরেটিভ লাইট। গোড়ার দিকে কয়েকটা প্রেজেন্টের বাক্স। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সেগুলিতে প্রেজেন্ট নাই – ফাঁকা।

এমন সময়ে কমল দাদার পরিচিত একজনের সাথে আমাদের দেখা হয়ে যায়। ভদ্রলোক হোটেলেই কাজ করেন। আগে নাকি আমাদের কাঁঠাল বাগানের বাসায় ভাড়া থাকতেন। সেই আংকেল জানালেন, এবার সান্টাকে দেখতে সেরকম ভিড় না হওয়ায় তাকে আগেভাগেই ছুটি দেয়া হয়েছে। সকালে শুধু বিটিভির একটা টিম বড়দিনের নিউজ করতে এসেছিল, বাচ্চাদের সাথে সান্টার ভিডিও করে চলে গেছে। তারপর আর কেউ আসেনি।

‘Did he go to the North Pole already? Can we call him and ask him to call back?’ আমি আশার ছলনে বলি।

সেই আংকেল এবং কমল দাদা কেউই সান্টা ক্লজের বাস্তুভিটার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিল না। তারা হা করে আমার কথা প্রসেস করার চেষ্টা করে।

হঠাৎ হোটেলের লবিতে বাঙালি গলায় কে যেন হেসে ওঠে, ‘হো হো হো…‘


লন্ডন জীবনে একবার স্বপ্নে যীশু খৃষ্টের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। সেটার কথা খুব মনে পড়লো।

কিন্তু বারো দিন পরই আমার জন্মদিন – তাই বড়দিন, স্নো ম্যান, ফাদার ক্রিসমাস, এসব নিয়ে মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। দেশে ফেরার পর আমার প্রথম জন্মদিন! যেন ইংল্যান্ড ছেড়ে আসার পর আমার জীবনে প্রথম সুখবর। ভাবলাম নিউ মার্কেট বা বায়তুল মোকাররম বা কোথাও না কোথাও সেই স্পাইডারম্যান টয়টা পাওয়া যাবে, কিন্তু বিধি বাম। বার্থডে শপিং করতে গিয়ে হতাশ হলাম। তার চেয়েও চিন্তার বিষয়, ঢাকার টয় মার্কেটের সার্বিক অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বেশিরভাগ খেলনা দোকানদার স্পাইডারম্যানকেই চেনে না।

আমার একমাত্র ভরসা আমাদের মতো লন্ডন-ফেরত সোনালী ব্যাংক সার্কেলের এক আন্টি। আমার ফ্রেন্ড মিমির আম্মু, আমাকে খুব আদর করেন। কিন্তু আমরা দেশে আসার আগে তো আন্টিকে সেই টয়টার কথা বলা হয় নাই – উনি কিভাবে জানবেন যে ঐটা আমার জন্য কিনে রাখতে হবে?

যোগ-বিয়োগ করে ভাবলাম, যেহেতু আমি টয় পছন্দ করি… এবং উনি জানেন আমার জানুয়ারি মাসে জন্মদিন… তাই আন্টি নিশ্চয়ই প্লেনে উঠার আগে আমার জন্য কোন না কোন টয় কিনে রেখেছিলেন। স্পাইডারম্যান টয় না হলেও, তাই সই!

আন্টি আমার বার্থডেতে হাজির হলেন একটা সোয়েটার নিয়ে।

সেই প্রেজেন্ট পেয়ে আমি ঘরভর্তি লোকের সামনে আর্তনাদ করে উঠি – ‘This isn’t even a real present! Why would you bring a sweater as a present?’

আন্টির বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই মা‘র কাছে বকা খেয়ে উনাকে স্যরি বলতে হয়।

কেক কাটার সময় হয়। হঠাৎ আমি লক্ষ্য করি, ঘরটা লোকে ঠাসা। সবার মুখে হাসি। কয়েক মিনিট পরই বাসাটা গমগম করে উঠে, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার তাশফীন…!‘

কি আশ্চর্য, মোমবাতিতে ফুঁ দিতে দিতে আমি ভাবি, এক বছরে জীবনটা এত বদলে গেল!

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন