আসামি
মানুষ ও উপলক্ষ · · ২৮ মিনিটের পাঠ

[শ্রদ্ধেয় সালাম স্যারকে নিয়ে এই লেখাটা মূলত আমার ল্যাবরেটরিয়ান ভাই-ব্রাদারের জন্য। অডিয়েন্সের ভিন্নতার কারণে সামান্য পরিবর্তিত।]
১.
কিছুদিন আগে মালেক স্যারকে নিয়ে একটা লেখা লিখতে লিখতে ভাবছিলাম, বহুদিন যেন এরকম কিছু আর লিখতে না হয়! কিন্তু বিধি বাম, দুই-একদিন আগে জানতে পারলাম, সালাম স্যারও নাকি বেঁচে নেই।
খবরটা শুনে আমি টেনশনে পড়ে গেলাম। কবে মারা গেছেন, কিসে মারা গেছেন, কিছুই জানি না। খুব সম্ভবত কয়েক বছর আগে (পরে শুনলাম, ২০১৮তে)। মানে অলরেডি উনি দৌড়াদৌড়ি প্র্যাকটিস করার অনেক সময় পেয়ে গেছেন… বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু সালাম স্যার, ওরফে জনাব আব্দুস সালাম মিয়া, ওরফে আসামি, ওরফে ডিবি পুলিশ, ওরফে কসাই – এই মানুষটাকে নিয়ে আসলে কী বলা যায়?
লম্বাটে, সারাক্ষণ সাফারি পরা, সিনা টানটান করে হাঁটতে হাঁটতে আমাকে দেখে ফ্যাসফেসে গলায় হাঁক দেয়া… অ্যাই কোথায় যাও? এটুকু মনে পড়লেই আমি আর এখনকার আমি থাকি না, ঠাস করে নিজেকে আবিষ্কার করি সেই L-shaped বারান্দাটায়। টাইম ট্র্যাভেল জিনিসটা নাকি বাস্তবে সম্ভব না, কারণ আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ত্বরিত হলে ম্যাটার আর ম্যাটার থাকে না, এনার্জি হয়ে যায়। জীবনের এসব মুহূর্তে আমি সবিনয়ে পদার্থবিদ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করি।
সালাম স্যারকে যে দেখে নাই, তার কোন ধারণাও নাই একটা ডাস্টার, বলপেন, বলপেনের ক্যাপ, বা ফিল্মের কৌটায় রাখা এক চিমটি বালু কোন্ লেভেলের মারণাস্ত্র হতে পারে। রামায়ণ-মহাভারতে বীরদের শক্তি-শেল নিক্ষেপ করার বর্ণনা আছে। স্যারকে চক নিক্ষেপ করতে দেখে প্রায়ই মনে হতো, লোকটার ভুল সময়ে জন্ম হয়েছে। স্যার চক মারার পর একদিন আমাদের ক্লাসের একটা ছেলে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে উঠলো, স্যার চউক্ষে লাগছে, চউক্ষে লাগছে!… তার কান্না দেখে আমরাও একটু ঘাবড়ে গেলাম, চোখ গলে-টলে গেল না তো? কিন্তু আসামি নির্লিপ্তভাবে বললেন – ঢং করিস না, মারসি চোখের ঠিক উপরে, চোখে না। শুনেই ছেলেটা মিনমিন করতে করতে ‘চক না চকের গুড়া লাগছে’ টাইপ কিছু একটায় নেমে আসলো।
কী নিশানা! কী কনফিডেন্স! লোকটা আর্মির ড্রিল সার্জেন্ট বা ডিজিএফআইয়ের টর্চার সেলের কেউ না হয়ে টিচার হতে গেল কেন, আল্লাহ মাবুদ জানে। ক্লাস নাইনে থাকতে একদিন A সেকশনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শুনি, একটা মহিলা চিঁ চিঁ করে কাঁদছে। ধড়ফড় করে ক্লাসের দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, আসামি আমাদের ব্যাচের অন্যতম ত্রাস ছেলেটার জুলফি ধরে ইয়ো-ইয়ো’র মতো করে টানছেন। (সেদিনের পর থেকে ‘বাল’ শব্দটা আমি খুব সমীহ করে বলি।) সঙ্গত কারণেই আমাদের সাথের কিছু পোলাপান যখন স্যারের চেয়ারে বসে তাশ খেলতে গেল, সেটা ছিল ল্যাবরেটরিয়ান হিসাবে দ্বিতীয়- বা তৃতীয়-সর্বোচ্চ দুঃসাহসের প্রতিফলন। (পার্মানেন্ট ফার্স্ট প্লেসে আছে বিকে ওরফে আনোয়ারুল করিম স্যারের বাসা থেকে যে অজ্ঞাতনামা চ্যাম্পিয়ন স্যারের দুই-দুইটা আন্ডারওয়্যার চুরি করেছিল, সে।) প্রায়ই সালাম স্যার ঢাকা কলেজের মাঠ, টিটি কলেজের মাঠ রেইড দিতেন – যেসব পোলাপান স্কুল ফাঁকি দিয়ে তাশ খেলতো বা ফুটবল খেলতো, তাদেরকে পাকড়াও করার জন্যে। বলাকায়, ভিডিও গেমের দোকানেও যে সেই একই উদ্দেশ্যে উদয় হতেন, সেটা মনে পড়ে গেল কিছু পাপীদের কমেন্টে।
সালাম স্যারের সময়ে যারা স্কুলে পড়তো, তারা সবাই কম-বেশি এই সালাম স্যারকে চিনে। জুনিয়ররা তার গল্প শুনে হয়তো আতংকিত হবে – ওহ নো, ওয়াট অ্যান অমানুষ! কিন্তু আমরা জানতাম, সেই একই সালাম স্যার আমাদেরকে কতটা স্নেহ করতেন। মাঝেমধ্যে সেই ভয়ংকর লোকটাই আমাদের সাথে ভলিবল খেলতেন। স্কুলে বেতন নেওয়ার দিনে কারো বেতন শর্ট পড়লে বিনা বাক্য ব্যয়ে নিজের পকেট থেকেই দিয়ে দিতেন – একটাবারের জন্য ধরাও দিতেন না বা মুখে কিছু বলতেন না, পাছে সেই কম বেতন দেয়া ছেলেটার লজ্জা অন্য ছাত্ররা দেখে ফেলে।
কাহিনীটায় নতুনত্ব কিছু নাই; সারাংশ করলে দাঁড়ায়, আমাদের সময়ে একটা ত্রাস টাইপ কিন্তু ভালোমানুষ স্যার ছিলেন, পড়াতেনও খুব ভালো। স্কুলের তাবৎ পোলাপানের কাছে আসামি ছিল টেরর। কিন্তু আসামির টেরর কে ছিল জানেন?
জ্বি মানে… আমি।
২.
সেই ইতিহাসের সূত্রপাত স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ফুটবল খেলতে গিয়ে।
একদিন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। এমনিতেই আমাদের ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ টাইপ অবস্থা, তার উপর এমন দুর্দান্ত আবহাওয়া – পুরা ক্লাস বল নিয়ে স্কুলের মাঠে নেমে গেলাম। আমরা হৈ চৈ করে সেই বল নিয়ে ছুটাছুটি করছি। দমকা হাওয়ায় পরনের ইউনিফর্ম স্কুলের পতাকাটার মতো ধড়ফড় করছে। মিনিটে মিনিটে পা পিছলে নিজেরাই বল হয়ে যাচ্ছি, তারপর ‘অমুক হালায় আমারে ফাউল করছে’ বলে উঠে সাথে সাথে অন্য কাউকে ল্যাং মারছি। আবার সেই কাঁচের মতো বৃষ্টিতে বলের পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছি…
আহা সেই স্কুলের মাঠ! সুঁইয়ের খোঁচার মতো পিঠে-কাঁধে-প্যান্টের উপরে বৃষ্টির নাচ! নাকে-মুখে সেই বাদলা স্বাদ, মাঝেমাঝে মেঘের গর্জন, সেই কাদা-বর্ষা-এড্রেনালিনের মাখামাখি গন্ধ! আশেপাশের গাছগুলি সাপোর্টারের মতো একবার এদিকে ঘাড় ঘুরে তাকাচ্ছিল, একবার ওদিকে। (এখনও কি গাছগুলি আছে? একটা সময় হয়তো আমাদের ব্যাচের কেউ থাকবে না, কিন্তু ওরা থাকবে।) এমন সময় স্কুলভবনের নিচ থেকে সালাম স্যার বেত উঁচিয়ে আমাদের ক্লাসে ফিরে আসার জন্য হুমকি-ধামকি দিতে শুরু থাকলেন – এ্যাই আসো, আয় বলতেছি! বেতের বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না, বলে রাখতেছি!
কিসের কি! ঐ সময়ে কি আমাদের কোন হুশ আছে? আমরা তখন বেহেশতে, সাক্ষাৎ বেহেশতে। খেলা বন্ধ করার প্রশ্নই উঠে না। একটু পর স্যারও চুপ হয়ে গেলেন। ভুলেও গেলাম তার কথা, ভাবলাম চলে গেছেন। পরে কপালে কঠিন মার আছে, কিন্তু তাতে কি? তখনকারটা তখন দেখা যাবে…
হঠাৎ দেখি, স্যার আসলে যাননি। মুগ্ধ চোখে দূর থেকে আমাদের খেলা দেখছেন। আজো কেন যেন মনে আছে, ঐ মুহূর্তটায় কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম – আরে তাই তো! ‘আব্দুস সালাম মিয়া’ হওয়ার আগে নিশ্চয়ই মানুষটার একটা ডাকনাম ছিল, একটা কৈশোর ছিল। আমাদের খেলা দেখে হয়তো তার সেই কৈশোরের কথাই মনে পড়ে গেছে।
ঐ বয়সে একটু ডেয়ারিং হয়ে গিয়েছিলাম (কেন, সেই প্রসঙ্গে পড়ে আসছি)। গুটিগুটি পায়ে স্যারের কাছে চলে গেলাম, গিয়ে আমাদের সাথে খেলায় জয়েন করার অফার দিলাম। উনি একটুও রাগলেন না, কিন্তু বললেন -- না, কাপড়চোপড় ভিজে যাবে।
কিছুক্ষণ স্যার আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখলাম। হঠাৎ নিজেকে এবং উনাকে চমকে দিয়ে বললাম, স্যার আপনার ডাক নাম কী?
উনি ভিরমি খেয়ে বললেন – হ্যা কী কী?
– আপনার তো নিশ্চয়ই একটা ডাক নাম আছে। সেইটা কী?
– (বেত উঁচিয়ে) কি, তুই আমার ডাক নাম জানতে চাস!
– (একটু পালানোর ভাব করে) বলেন না স্যার, কি হয়!
উনি ডাক নাম বলেছিলেন। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এত বছর পরে নামটা আর মনে নাই। খুব সম্ভবত কমন একটা কিছু। নামটা বলেই উনি আবার বেত উঁচিয়ে ধরলেন। আমি আরেকটু ডেয়ারিংগিরি করে বললাম – আজকে বুঝলাম স্যার, আপনি যতটা রাগী ভাব দেখান, আসলে আপনি ততটা রাগী না!
বলেই দৌড়ে পালানোর সময় ঠাস করে একটা আছাড় খেলাম।
৩.
শিক্ষকদের মধ্যে সালাম স্যার যে একটু আলাদা ছিলেন, সেটা অবশ্য আগেই বুঝে গিয়েছিলাম। আমার প্রথম বইটা বের হওয়ার পর উনি নিজে থেকেই আমার কাছে বইয়ের কপি চেয়েছিলেন। শুধু তাই না, বই হাতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের দাম দিলেন। আমি বারবার বললাম, স্যার লাগবে না, কিন্তু উনি জোর করে আমার বুকপকেটে টাকাটা গুঁজে দিলেন।
যতদূর মনে পড়ে তখন পর্যন্ত উনি আমাদের সেকশনের কোন ক্লাস নিতেন না, এবং তিনি কাজটা করেছিলেন সবার সামনে, অন্য স্যারের ক্লাস চলাকালীন – অর্থাৎ স্রেফ আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্যে।
নাইন থেকে বোধহয় তিনি আমাদের রেগুলার ক্লাস নিতেন (জেনারেল ম্যাথ? কেমিস্ট্র?)। বৃষ্টিকালীন ফুটবল খেলার ঘটনাটা সম্ভবত ঐসময়ের। টেনে তো আমাদের ক্লাস টিচারই ছিলেন। তখন সেই একই মানুষের কাছে আর সবার মতো প্রচুর মার খেয়েছি। নিচে স্যারের চমকপ্রদ সেই মারগুলির একটা লিস্ট দেয়ার চেষ্টা করছি।
বালি দিয়ে কান ডলা (কান ছিলে বিন্দু বিন্দু রক্ত বের হয়ে যেত)
ঘুষি (স্যারের বাহুগুলি ছিল গদার মতো)
বেতের বাড়ি (জোড়া বেত সাধারণত, আসামি একটু শক্ত বেত পছন্দ করতেন)
জুলফি আক্রমণ (এখন চিন্তা করি, ঐ আমলে ন্যাড়া হইলাম না কেন?)
আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে চিপা (চিপা খেয়ে-টেয়ে পরে মুগ্ধ হয়ে কলমের দিকে তাকিয়ে থাকতাম – এই চিজ দিয়েই লেখালেখি করি?)
ইত্যাদি। আমার মা একদিন হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে – তোমার কানের লতি সবসময় ছিলা থাকে কেন, বাবা?
আমি স্যারের সেই শাস্তির বর্ণনা দিলাম। শুনে তো মা রেগে অস্থির, এভাবে কেন মারতে হবে, এটা কেমন কথা! আমি তো হেসেই বাঁচি না। গভঃ ল্যাবে পড়ে এইটুকু মার যে আসলে কিছু না, সেটা মাকে কে বুঝাবে? অন্য এক স্যার তো এমনই মারা মারতেন, সে খবর রাখলে অনেক গার্জিয়ান নির্ঘাৎ হার্ট অ্যাটাক করতো। যাই হোক, মা হেড স্যারের কাছে নালিশ দিতে চেয়েছিল – অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে ঠান্ডা করলাম।
হয়তো আমার কাছ থেকে ঐরকম একটা আনকমন প্রশ্ন শুনেছিলেন বলে, বা হয়তো তখনো লেখালেখি করতাম বলে, বা এমনিতে খুব একটা বাঁদরামি না করার স্বীকৃতি হিসাবে – কোন একটা কারণে স্যারের সাথে আমার একটা কানেকশন তৈরি হয়ে গেল। এমন কানেকশন না যে উনার সাথে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছি, বা নস্টালজিয়ার থলে আদান-প্রদান করছি, বা স্নেহের কারণে কম মার খাচ্ছি। বলতে পারেন স্যারের ভাব-গতিক আমি বুঝতাম, আর উনিও আমার ভাব-গতিক বুঝতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক আর সেনাপতি পরষ্পরকে যেভাবে বোঝে, অনেকটা সেরকম। নামাজ ঘরে স্যারদের সালাম না দিলেও চলতো; সেখানে আসামিকে দেখে আমি মাথা নাড়তাম, আর উনি আমাকে দেখে। আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন না হলেও আমাকে দিয়ে টুকটাক কাজ করাতেন।
ততদিনে আমি মোটামুটি প্রফেশনাল স্কুল পলায়নকারী। কতবার যে দেয়াল টপকে রাস্তায় পড়েছি, আর শুনেছি ঠিক তক্ষণ স্যার দেয়ালের অন্যপাশে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন! চাইলেই উনি পরদিন আমাকে স্কুল পালানোর জন্য শাস্তি দিতে পারতেন। কখনো দেননি – উল্টা বলতেন, নেক্সট টাইম…
একদিন স্যারদের কমন রুমে কি একটা কাজে গেছি। সেদিন দৈববশত আমাদের টিফিন ছিল রসগোল্লা এবং, যতদূর মনে পড়ে, একটা করে লুচি। স্যারদেরও বোধহয় একই টিফিন ছিল, স্রেফ একটু বেশি পরিমাণে। (বেশিরভাগ স্যার অবশ্য টিফিনকারিতে করে বাসা থেকে খাওয়ার নিয়ে আসতেন।)
গিয়ে দেখি, আসামি গুনগুন করে কি একটা গান গাইছেন, আর রসগোল্লা খাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার খাওয়া দেখলাম।
৪.
তারপর ঠাস করে স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল।
দিনটা ছিল বেতন নেয়ার দিন, স্যার তখন আমাদের ক্লাসটিচার। যারা বেতন তুলতে স্যারকে সাহায্য করছিল, তাদের একজনকে বললাম – ঐ আমার কাছে একশ টাকার নোট, ভাংতিটা ফেরত দিবি কিন্তু!
ছেলেটা বললো হ্যা দিবো। কিন্তু স্যারকে সে টাকা ট্রান্সফার করার সময় দেখলাম, সে নোটটা আর নিজের পকেট থেকে বের করলো না। আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলাম। স্যার আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অনেকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, আমি সত্যি সত্যি একশ টাকা এনেছিলাম কিনা, ঐ নোটটাই আমি ঢুকাতে দেখেছি কিনা, ইত্যাদি। আমি যতই বলি স্যার আপনি ওর পকেট চেক করেন, উনি কিছুতেই সেটা বলবেন না।
তখন এমনিতেই ক্লাসে আমার খুব একটা বেল নাই। আর অন্য ছেলেটা পপুলার, ভালো ছাত্র। স্যারের সামনেই ক্লাসের অনেকে আমাকে ঝাড়াঝাড়ি শুরু করে দিলো। একজন তো পাশের সিট থেকে আমাকে গুঁতা দিয়ে বলেই ফেললো – তুই জানোস হের বাপের কত টেকা? আর তুই হের নামে একশ টাকা চুরির অপবাদ দিতেছস, কত্তবড় সাহস তোর!
যদিও বড়লোক বাবাদের চোর সন্তান হওয়ার অনেক উদাহরণই ইতিহাসে আছে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, C সেকশনে আমি ছি ছি; আমার কথায় কারোরই বিন্দুমাত্র বিশ্বাস তো দূরের কথা, আগ্রহও নাই। সেটাও না হয় হজম করতে পারতাম, স্কুলের প্রতি তখন এমনিতেই উদাসীন ছিলাম। কিন্তু হজম করতে পারলাম না যেটা, তা হচ্ছে শেষপর্যন্ত স্যার কিছুতেই ছেলেটার পকেট চেক করলেন না। উল্টা তিনি আমাকে বোঝালেন – আমি তোমাদের দুইজনের কাউকেই বিব্রত করতে চাচ্ছি না। এই নাও, তোমার একশ টাকা হিসাব করে বাকি টাকা আমি নিজের পকেট থেকে দিচ্ছি।
রাগে আমার গা জ্বলে গেল। আশেপাশের পোলাপানের হাউকাউয়ে সেই টাকাটা নিতেই হলো। সেদিন টিফিনটাইম জাহান্নামের মতো ছিল। ফুটবল খেলায় কোন টিমে নেওয়া তো দূরে থাক, আগেভাগেই পোলাপান বললো আমার মাঠে আসার দরকার নাই, খেলায় নেওয়া হবে না। শুধু তাই না, আমি নিজের টিফিন খাচ্ছি, এমন সময়ে কিছু পোলাপান এসে ধাক্কা দিয়ে আমার টিফিন ফেলে দিলো। শার্টের কলার ধরে হারামিগুলি এমনই টানাটানি শুরু করলো যে শার্ট তো শার্ট, আমার ঘাড়ই ছিঁড়ে যাওয়ার যোগাড়।
মেজাজটা যে কোন্ লেভেলের খারাপ হয়েছিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে মনে শুধু ভাবছিলাম – এই স্যারকে আমি এতদিন ভালো মানুষ মনে করতাম! আর উনি এইভাবে সবার সামনে আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দিলেন! নিজেকে ভীষণ, ভীষণ প্রতারিত মনে হচ্ছিল। পরদিন স্যার অবশ্য আমাকে ডেকে নিয়ে না-বলা অ্যাপলজি’র মতো করে চকলেট কেনার টাকা দিতে চেয়েছিলেন। আমি নিইনি।
৫.
এত বছর পর ঘটনাটা নিয়ে চিন্তা করতে বসে স্যারকে আসলে খুব বেশি দোষ দিতে পারছি না। হয়তো ব্যাপারটা তিনি আরেকটু সুন্দর করে সামাল দিতে পারতেন – যেমন ক্লাসের বাইরে গিয়ে আমাদের দুইজনের মধ্যে মিটমাট করিয়ে দিতে পারতেন। বা অন্তত আমাকে যখন সবাই বুলি করছিল, তখন ওদেরকে চুপ করাতে পারতেন। কিন্তু তখন আসলে বুলিয়িং-এর ভয়াবহতার ব্যাপারে কেউ খুব একটা সচেতন ছিল না। আর এই বয়সে এসে তো নিজেই বুঝি, অফিসে সব দিন সবার পারফর্ম্যান্স এক হয় না।
ক্লাসের পোলাপানগুলি যে বদ ছিল, সেটাও আসলে বলা যাচ্ছে না। আমি শিওর ঐরকম হারামিপনা আমিও কারো না কারো সাথে করেছি। বটম লাইন ইজ, তখন আমরা সবাই পোলাপান ছিলাম। আর পোলাপানদের মোটামুটি সাত খুন মাফ। (দোস্তরা, তারপরও যদি এই লেখা পইড়া তোদের অনুতাপ হয়, আমারে চা-কফি খাওয়ায়া মন ভালো করতে তোগো মন চায়… প্লিজ, সেই উছিলায় আমাদের ব্যাচ থেকে যে চ্যারিটি ড্রাইভ করছি, সেইটায় কিছু টেকা ফেলা। ওকে?)
কিন্তু ঐ সময়ে রাগের চোটে আমি ভেতরে ভেতরে বার্স্ট করেছিলাম। কিছুদিন পর যখন স্যার পড়া না পারা টাইপ কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে আমার সাথে প্রচন্ড জোরে হ্যান্ডশেক করলেন, তখন হ্যান্ডশেক নামক সেই মাইনকা চিপা খেতে খেতে রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমার মস্তিষ্কে অদ্ভুত একটা চিন্তার উদয় হয় – আরে, এই তো সেই লোক, যে রাগী হওয়ার ভান করে! কিন্তু আসলে এটা তার ভান, সে এতটা রাগী না… আবার এই একই লোক আমাকে মিথ্যাবাদী বানাইছে… অতএব, আমারও এই মুহূর্তে ক্যা-কু করে কাতড়ানোর কিছু নাই। উনি যদি অভিনয় করতে পারেন, তাইলে আমিও পারি…
ব্যস, শুরু হয়ে গেল আসামির সাথে আমার psychological warfare. স্যার গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন, উনি যতই জোরে চিপা দেন, আমার হাসি ততই বিস্তৃত হতে থাকে। ব্যথায় হাতটা ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু অভিনয় অন রাখলাম। হো হো করে হাসার ইচ্ছা ছিল, যন্ত্রণার আধিক্যে সেটা সম্ভব হলো না। তাই মুচকি করেই হাসলাম। আমার হাত ধরে ঘোঁতঘোত করতে করতে আসামি বলে উঠলেন – কি, সাইকো হইছো, সাইকো? আমিও সাইকো কিন্তু…
আর আমি মনে মনে বলি, বাছা, খোদার কসম, যতদিন এই স্কুলে আছি, তোমারে আমি খাইছি! একবারও স্যারকে কিছু বললাম না, ব্যথায় আহ-উহ কিছু করলাম না। শেষে স্যারই হাল ছেড়ে দিয়ে আরো কয়েকটা শক্ত চিপা দিয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন। সেইদিন ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে পনের মিনিট হাতটা কলের নিচে ধরে থাকতে হয়েছিল।
৬.
কয়েকদিন পর আবার মার-বেলা – এবার সেই বিখ্যাত কান ডলা। আমি উল্টা টেকনিক খাটালাম। মানে স্যার একটু ব্যথা দিলেই আমি এমনভাবে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি শুরু করি যেন আমার কান-ই খুলে পড়ে গেছে। উনি পুরাপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
আরেকদিন উনি চালাকি করে আমাকে কম শাস্তি দিলেন, বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকো। আমিও কম চালাক না, যেই পড়াটা না পারার জন্য আমাকে দাঁড়া করিয়েছিলেন, সেটা “হঠাৎ করে” মনে করে গড়গড় করে বলা শুরু করলাম। তবু উনি আমাকে শয়তানির দায়ে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। পুরাটা ক্লাস আমি বেঞ্চের উপর থেকে হাসি হাসি মুখে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আমার কান্ড-কারখানায় কিছুটা বিচলিত হয়ে স্যার একদিন আমাকে টিচার্স রুমে ডেকে নিয়ে বললেন – তোর আসলে হৈছে কি? আগে তো এরকম শয়তান ছিলি না।
আমি খুব কান্না কান্না চেহারা করে বললাম, স্যার, আমাদের বাসায় প্রচন্ড অভাব, আমার আব্বা অফিস করে এসে সেই প্রেশারে সবাইকে মারধর করে… এই জন্য আর পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করে না…
উনি তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে মাফ চাইলেন। বললেন, তোর গার্জিয়ানের সাথে আমি কথা বলবো, আমার বাসায় পড়তে আসবি। টাকার চিন্তা করিস না।
আর আমি বাসায় গিয়ে মাকে বললাম – মা তোমার মনে আছে এক স্যার আমার কান ছিলে দিছিলেন? উনি আমার নামে হেড স্যারের কাছে কমপ্লেইন করছেন, তোমাকে কালকে স্কুলে দেখা করতে যেতে বলছে…
পরদিন স্কুলে গিয়ে আমার সরলমতি মায়ের কিছু প্রশ্ন:
(আসামির উদ্দেশ্যে) আমি বুঝতে পারতেছি না, আপনি টাকা ছাড়া আমার ছেলেকে পড়ানোর কথা বলছেন কেন? আমাদের তো অ্যাবিলিটি আছে!
(তারপর হেড স্যারের রুমে গিয়ে) আপনি মনে করতে পারতেছেন না যে আপনি আমাকে আসতে বলসেন! তাহলে যেই স্যার আমার ছেলেকে এভাবে মারলো উনি কোথায়? তার সাথে আমি কথা বলবো।
কথাগুলি আমি মায়ের কাছে পরে শুনেছি। (মাকে ভাঙিয়ে খাওয়া আমার ঐ প্রথম, ঐ শেষ।) তখন আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, টিচার্স রুমের ঐখানটায়। কয়েক মিনিট পর মা আর হেড স্যার বের হয়ে আমাকে খোঁজার জন্য চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।
আমি কাছে গেলে আমার মাকে কিছুটা শুনিয়ে শুনিয়ে হেড স্যার বললেন – তোমারে ক্যা মারছে? কুন স্যারে?
কাকতাল আর কাকে বলে! ঠিক ঐসময়ই সালাম স্যার টিচার্স রুম থেকে বের হয়ে ক্লাসের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরেছিলেন। হঠাৎ সেই প্রশ্ন শুনে, এবং আমাকে, আমার গার্জিয়ানকে আর হেড স্যারকে একসাথে দেখে তার চোখে যেই দৃষ্টিটা দেখা গেল, তার নাম ‘লক্ষণ ভালো না’ ।
আমি ‘ঝিকে মেরে বউকে শিখানোর’ মতো করে দূরে ভলিবল খেলতে থাকা ইনসান আলি স্যারকে দেখিয়ে জোরে জোরে বললাম – ঐ যে স্যার উনি, যেই স্যার আমাকে মারে!
সালাম স্যার হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
পরে আমি চেক করেছিলাম, ইনসান আলি স্যারকে হেড স্যার সেই প্রসঙ্গে কিছু বলেন নাই। আমিও পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়া কেন উনাকে দেখাতে গিয়েছিলাম, বা সত্যি সত্যি ইনসান আলি স্যারকে হেড স্যার এ নিয়ে জেরা করলে আমার পরিণতি কি হতো – আল্লাহ মালুম। ঐ যে বললাম, অতিরিক্ত ডেয়ারিং। অথবা বুলিয়িং-য়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বা স্যারের আপাত-প্রতারণায় আমার উপর জুডাসের আত্মা ভর করা, বা এরকম একটা কিছু।
৭.
কেন আমি তখন ঐরকম ছিলাম? এসব গল্প আগে কখনো কারো সাথে শেয়ার করি নাই। এতদূর পড়ে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যারা চেনে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে খুব সম্ভবত আমার নিজের সেকশনের লোকজন। জীবন খুবই বিচিত্র, বন্ধুগণ। কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো একটু বেশি।
কেউ হয়তো লক্ষ্যই করেনি, কিন্তু ক্লাস নাইনে উঠতে উঠতে আমার মধ্যে বিশাল একটা চেইঞ্জ এসেছিল। মার খেলে কেয়ার করি না, পরীক্ষায় খারাপ করলেও গায়ে মাখি না। আগে সবসময় চার-পাঁচের মধ্যে রোল নাম্বার থাকতো। রেজাল্ট খারাপ হওয়া শুরু করলো। ক্লাসের ছেষট্টিজনের প্রায় সবার সাথেই আমার আগে কম-বেশি খাতির ছিল। আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে স্কুলে আমার কোন ক্লোজ ফ্রেন্ডই ছিল না। আপাত-দৃষ্টিতে যাদের সাথে ক্লোজ ছিলাম, তারাও আমার লাইফ নিয়ে খুব একটা জানতো-টানতো না। ইন ফ্যাক্ট, আমার স্কুলফ্রেন্ডদের যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা, সেটা পুরাপুরিভাবে কলেজ লাইফ বা তারও পরবর্তীকালের ফ্রেন্ডশিপ। নাইন-টেনে আমি একা একা ঐভাবে থাকতাম, নিজের ভুবনে বাস করতাম। সেই ভুবনে ছিল অনেক কনফিউশন, অনেক রাগ।
‘কিশোর মন’ ভাবলেই কোন বিচিত্র কারণে আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের মনে হয় – কিশোর মানে তো শিশুই! তাদের জীবনে আবার কিসের জটিলতা! তাদের ‘জটিল’ কিশোর চরিত্রগুলি বড়জোর দরিদ্র ফ্যামিলিতে জন্মানোর সুবাদে কিছু টিপিকাল আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। (এতে করে যে তারা কৈশোর এবং দারিদ্র্য দুইটা জিনিসকেই dehumanize করে ফেলছে, সেটা তাদেরকে কে বোঝাবে?) যাই হোক, তখন কিন্তু আমার জীবনটা ভালোই জটিল ছিল। ক্লাস সিক্সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে এসে আমাদের স্কুলে অ্যাডজাস্ট করতে করতে আমার জীবন বের হয়ে গিয়েছিল। যতদিনে নিজেকে ল্যাবরেটরিয়ান ভাবা শুরু করেছিলাম, ততদিনে স্কুলজীবনে মাত্র বছর দেড়েক বাকি। তখন আর স্কুল আপন হলেই বা কি, না হলেই বা কি? তাই স্কুলের কোন ব্যাপারেই খুব একটা কেয়ার করতাম না।
ভেজালের সেখানেই শেষ ছিল না। বয়ঃসন্ধিজনিত নানা শারীরবৃত্তীয় কনফিউশনের কথা না হয় উহ্য রাখলাম। যত বড় হচ্ছিলাম, ছোটবেলার কিছু ফ্রেন্ড সার্কেল ক্রমেই ভেঙে যাচ্ছিল। ততদিনে আমার তিনটা অনুবাদগ্রন্থ বের হয়ে গেছে। পত্র-পত্রিকায় আমার সাক্ষাৎকার ছাপা হচ্ছে, টিভিতে ইন্টারভিউ দিচ্ছি। বাংলায়, ইংরেজিতে বিভিন্ন খবরের কাগজ-ম্যাগাজিনে লিখছি। অপরিচিত লোকজন বইমেলায় অটোগ্রাফ নিচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা ফ্যান মেইল পাঠাচ্ছে।
শুনে হয়তো ভাবছেন – কি সফল! কি চমৎকার লাইফ! নারে ভাই, সিচুয়েশন ছিল পুরা উল্টা। দ্বিতীয় বইয়ের সময় থেকেই অতিরিক্ত অ্যাটেনশন পেয়ে পেয়ে আমার লেখালেখি করার ইচ্ছাই চলে গিয়েছিল। (ছেড়েই দিয়েছিলাম শেষমেষ।) বোনাস হিসাবে ছিল পাড়ায়-স্কুলে-সর্বত্র ‘তুই লিখিস নাই, তোর বাপে লিখে দিছে’ টাইপ কথাবার্তা… ইত্যাদি… ইত্যাদি… এবং আরো কিছু ইত্যাদি।
এমনিতেই ক্লাসে যথেষ্ট বুলিড হতাম। তাই যোগ-বিয়োগ করে ঠিক করলাম, স্কুল থাকবে স্কুলের মতো, আর আমি থাকবো আমার মতো। অ্যাট লিস্ট মনে মনে। আসামির সাথে আমার দ্বৈরথটা ছিল ঠিক ঐ আমলেই। কাজেই, আমার মধ্যে যে ঐরকম একটা হযবরল রিয়্যাকশন হয়েছিল – তাতে আশ্চর্য কী?
আমার অশেষ সৌভাগ্য, স্যার খুব ম্যাচিউর একজন্য মানুষ ছিলেন। সবকিছু ছাপিয়ে সবসময় ছাত্রদেরকে মানুষ হিসাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। অন্য কোন টিচারের সাথে আমার এরকম লেগে গেলে হয়তো মার খেতে খেতে মরে যেতে হতো, বা ডেয়ারিংয়ের আতিশয্যে এসএসসি’র আগেই টিসি খেয়ে স্কুল ছাড়তে হতো। কিন্তু সালাম স্যার উল্টা আমাকে মারধর করা প্রায় বন্ধই করে দিলেন। সেধে সেধে টিচার্স রুমে ডেকে নিয়ে পড়া বুঝিয়ে দিতেন, এমন কি অন্য স্যারদের সাথে কথা বলে কোন্ সাবজেক্টে কেমন করছি সেসব খোঁজখবর রাখতেন। মাঝেমধ্যে বলতেন, মেট্রিক কিন্তু দেখতে দেখতে চলে আসবে, ঐ স্যারকে তোর কথা বলে রাখছি তার কাছে গিয়ে পড়…
এত বছর পর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, এসব কথা লিখতে গিয়ে আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
৮.
তারপরও জীবন বলে কথা, এবং ল্যাবরেটরি স্কুল বলে কথা। মাঝেমধ্যে মজার মজার কান্ড ঘটেই যেত। স্যারকে জ্বালানোর ভালো কোন সুযোগ পেলে আমিও ছাড়তাম না।
একদিন আমি অন্যমনস্ক হয়ে বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। স্কুলে সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড ছেলেদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। যৌবনের উত্তাপ এবং নারীসঙ্গের অভাবে তারা ক্লাসের হাবাগোবা ছেলেপেলেদের সাথে অসভ্য আচরণ করছে – বা এরকম কোন একটা পলিটিকাল চিন্তা মাথায় ঘুরছিল। খেয়ালও করি নাই, আসামি-ও তখন উল্টা দিক থেকে হেঁটে আসছিলেন। সালাম না দেয়ার অপরাধে আব্দুস সালাম মিয়া ঠাস করে আমার পাছায় জালিবেত বসিয়ে দিলেন। চিন্তার রাজ্য থেকে ছিটকে পড়ে আমি রাগে অন্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠি – ঐ আসামির বাচ্চা আসামি!
বলেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সাথে সাথে দৌড়ে পালালাম। ভেবেছিলাম স্যার মাফ করে দিয়েছেন, কিন্তু কয়েক পিরিয়ড পর আবার হেঁটে যাচ্ছি, এমন সময় উনি হুংকার দিয়ে তেড়ে আসলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা স্কুলের বিশাল মাঠটা কয়েকবার চক্কর দিলাম, আমাদের ক্লাসের ফেরদৌসের বাসার ঐদিকটায় চলে গেলাম, এবং এক পর্যায়ে আমি ধরা খেলাম।
এত স্ট্যামিনা লোকটা কই পেত? শরীরের এবং মনুষ্যত্বের?
এই বয়সে এসে প্রায়ই আমি চিন্তা করি, সালাম স্যার , বিকে (করিম) স্যার, অমুক স্যার, তমুক স্যার যে আমাদের দৈনিক দৈনিক গরু-পেটা করতেন – সেটা কি চাইল্ড অ্যাবিউজ ছিল? কারো কারো বেলায় উত্তরটা অবশ্যই হ্যা। কিন্তু সালাম, বিকে টাইপ স্যারদের বেলায় আমার মনে হয় উত্তরটা হচ্ছে না। সেরকম কিছু শিক্ষক সিরিয়াসলি-ই বিশ্বাস করতেন, তাদের কাজ আমাদেরকে মানুষ করা। আমাদের গার্জিয়ানরা সেই ভরসাতেই আমাদেরকে তাদের হাতে সঁপে দিয়েছেন। সব স্যারের মধ্যে সেই লেভেলের আন্তরিকতা দেখা যেতো না।
আসামির মারগুলি কি একটু বেশি বেশি ছিল? হ্যা। একটু বেশি ক্রিয়েটিভ ছিল? ফর শিওর। কিন্তু সেটা ছিল মূলত ফর শো। গরু-পেটা করার ব্যাপারটা তখন কালচারাল ছিল, তাই ফিরে তাকালে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে সেটাকে না দেখে উপায় নাই। অবশ্য আমার যদি স্কুলে যাওয়ার বয়েসী একটা ছেলে থাকতো, আর তাকে কেউ ঐভাবে পিটাতো – আমি অবশ্যই তাকে সেই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতাম। মারামারি স্টাইলের প্যারেন্টিংয়ে আমি বিশ্বাসী না।
এখানে একটা কথা না বললেই না। স্যার সবচেয়ে নির্দয়ভাবে পিটাতেন নিজের ছেলেকে। কাজেই ফেয়ারনেস বিবেচনা করলেও সেখানে তিনি ফুল মার্ক্স পাচ্ছেন। একটা ঘটনা এখানে মেনশন করছি (ব্যাপারটা ওপেন সিক্রেট ছিল বলে, নাহলে প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে বলতাম না)। একদিন ছেলের একটা কান্ডে উনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। অন্য দুইজন স্যারের সাথে মিলে তাকে প্রচন্ড মারধর শুরু করলেন, বেত-টেত ভেঙে একাকার অবস্থা। কয়েক ঘর দূরে, আমাদের ক্লাসরুমে বসে আমরা সেই মার আর ছেলেটার চিৎকার শুনছি। লাস্ট পিরিয়ড ছিল। একটা থমথমে পরিবেশ।
অন্য শিক্ষকদের একজন খুব সম্ভবত ছিলেন বিকে/করিম স্যার। উনাকে বলতে শুনলাম, সালাম ভাই, থামেন, ছেলে তো মরে যাবে! কিন্তু উনি থামলেন না, উল্টা অন্যদেরকে মার কন্টিনিউ করার জন্য বললেন। এরকম চলতেই থাকলো।ক্লাস শেষে সবাই চলে গেল, কিন্তু আমি গেলাম না – কেন যেন মনে হচ্ছিল, উনার এরকম দিনে আমি বাসায় চলে যাব! আমাকে এতভাবে সাপোর্ট করার চেষ্টা করছে যে মানুষটা! মারধর শেষে দেখি স্যার একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন।
আমি স্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। টের পেয়ে উনি তড়িঘড়ি করে নর্মাল হওয়ার চেষ্টা করলেন। কয়েকটা নির্বাক মুহূর্ত কাটে; কিছু বলা দরকার, কিন্তু কি বলা যায়? শেষে বললাম – স্যার নেক্সট টাইম ঠিক হয়ে যাবে! মন খারাপ কৈরেন না।
শুনে উনি হেসে ফেললেন। বললেন – তোর চাচির অনেক বয়েস হৈছে রে! ‘নেক্সট টাইম’ আর আসতেছে না।
আমিও হাসলাম, হেসে বাসার পথ ধরলাম।
৯.
ক্লাইম্যাক্স।
একদিন স্কুল পালাতে গিয়েই পড়লাম স্যারের সামনে। উনি কিছুটা বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন – কই যাস?
আমি আমতা আমতা করে বললাম – স্যার না মানে…
– সোজা বাসায় যাবি। স্কুলের মধ্যে যেন না দেখি।
আমার বাম কাঁধের ফেরেশতা পুরাপুরি কনফিউজড হয়ে গেল। আমি বললাম, স্যার, জ্বি স্যার?
– বাংলা কথা বুঝস না? বাসায় যা, আর অন্য সিঁড়ি দিয়ে যা।
– কেন স্যার?
– দ্যাখ বাপ, আমি তোর পায়ে ধরি, বাড়িত যা। উল্টাপাল্টা কিছু করতে যাইস না। স্কুলে গেস্ট আসছে, মান-সম্মানের ব্যাপার।
আল্লাহর কসম, প্রবল পরাক্রমশালী আসামি সত্যি সত্যি কথাটা ঐভাবে বলেছিলেন। আমার কৌতূহল তখন সপ্তমে। ঘটনা কী? আসামিকে ‘জ্বি আচ্ছা’ বলেই আমি পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু উনি পিঠ ঘুরানোর সাথে সাথে ঐ সিঁড়ি দিয়ে দিলাম ভোঁ দৌড়।
স্যার হুংকার দিয়ে আমার পিছনে পিছনে দৌড়ানো শুরু করলেন। নিচে নেমে দেখি, আরো পোলাপান দৌড়াচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আসামি আমাকে আর খুঁজে পেলেন না – একটা ক্লাসরুমে ঘাপটি মেরে বসে ছিলাম। উনি যাওয়ার পর কি হচ্ছে আবিষ্কার করে আমি ড্রাকুলার মতো হেসে উঠলাম।
অগ্রণী না ভিকারুননিসা, কোন্ স্কুল থেকে যেন আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র মেয়েরা প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা দিতে, বা কি একটা ফেয়ার করতে, বা এরকম একটা কিছু এসেছে। আমাদের অল-বয়েজ স্কুলে এ যেন মরুভূমিতে টাইফুন। স্যারের ভয়টা যে অমূলক ছিল না, সেটা সেই পরীক্ষা/ফেয়ার রুমটার আশেপাশের ঘুরঘুর করা পোলাপানকে দেখেই বোঝা গেল। যতসব অ্যামেচার…
আমি বাথরুমে ঢুকে পানি দিয়ে জেলের কাজ চালালাম, শার্ট ইন করলাম, তারপর বিরাট একটা ইনোসেন্ট হাসি দিয়ে ময়দানে নামলাম।
পনের মিনিট পর আসামি এসে হতভম্ব হয়ে দেখেন, আমি একটা মেয়ের গার্জিয়ানের সাথে দাঁত বের করে গল্প করছি। উনার ছোট মেয়ে আমাদের এক ব্যাচ নিচে পড়ে, আমার কাছে তার জন্য মহিলাটা নোট চাইলেন, সেধে সেধে বাসার ফোন নাম্বারও দিয়ে দিলেন (আন্টিটা আসলে আমার পূর্ব-পরিচিত ছিল)। এমন সময়ই স্যারের আগমন। এসেই উনি শক্ত করে বেত ধরে আমাকে একটা ঝাড়ি দিলেন – কি ব্যাপার, তোমাকে না বললাম বাসায় যেতে?
আমি কিছু বলার আগেই গার্জিয়ানটা অবাক হয়ে বললেন – আপনি কে?
– আমার নাম আব্দুস সালাম মিয়া, আমি এই স্কুলে ম্যাথ আর সায়েন্সের কিছু সাবজেক্ট পড়াই।
– আপনার হাতে বেত কেন? এই স্কুলের টিচাররা কি সারাক্ষণ বেত নিয়ে ঘোরে?
– না মানে… এই ছেলেটা কি আপনাকে ডিস্টার্ব করতেছে?
– না, সে ডিস্টার্ব করবে কেন? আপনার কি যেন নাম বললেন?
– আব্দুস সালাম মিয়া…
– আপনাকে তো চিনলাম না। আমার বড় মেয়ে ফারুক স্যারের কাছে পড়ে।
– ও আচ্ছা…
– বাবা, তুমি কি চিনো এই স্যারকে?
তখন আমি আমার সবটুকু অভিনয়প্রতিভা খরচ করে বললাম – জ্বি না আন্টি। মনে হয় উনি মর্নিং শিফটের স্যার।
স্যার হা করে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে, দৃশ্যতই রাগে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেলেন।
তখন আমি মনে মনে হাসতে হাসতে ফেটে যাচ্ছি, আবার ভয়ও পাচ্ছি; পরদিন তো আসামি আমাকে মেরেই ফেলবে! কি করা যায়? অনেক চিন্তা করে তিন দিন স্কুলে গেলাম না। এই সময়ের মধ্যে আমি “বরাবর স্কুল কর্তৃপক্ষ – বিনীত নিবেদন এই যে, আমার ছেলে তাশফীন মাহমুদ (অভি) অমুক তারিখ থেকে অসুস্থ ছিল…” টাইপ একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখে তাতে মা‘র সই নকল করে বসিয়ে দিলাম।
শুধু তাই না, বাড়তি সতর্কতা হিসাবে আমাদের পাড়ার ডাঃ জাফর আংকেলের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন প্যাডে একটা “টু হুম ইট মে কনসার্ন” লিখিয়ে নিলাম। চারদিন পর স্কুলে গিয়ে স্যারকে দেখামাত্রই উনি আমাকে দেখে জ্বলে উঠলেন। আমি তো রেডিই ছিলাম – স্যারকে একটা পেশীও নাড়ানোর চান্স না দিয়ে ঝান্ডার মতো কাগজ দুইটা উঁচিয়ে ধরে বললাম, স্যার অসুস্থ ছিলাম…
এই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন স্যার আমার সাথে কথা বলা বন্ধ রেখেছিলেন।
১০.
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে আমার একমাত্র বোনটা মারা যায়।
ঘটনাটা ঘটে আমার প্রি-টেস্টের আগে আগে, বা কিছুদিন পরেই – এতদিন পরে মনে নাই। কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর যখন স্কুলে গেলাম, সাথের পোলাপান আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কেউ কেউ কেঁদে ফেললো। হেড স্যার, অ্যাসিস্টেন্ট হেড স্যার, জিক স্যার, মহসিন স্যার, এবং আরো অনেক স্যার এসে আমার সাথে কথা বললেন, মাথায় হাত বুলিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করলেন।
এক পর্যায়ে ইসহাক স্যার (নাকি অন্য কেউ?) আমার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। সত্যি বলতে কি, সেদিন স্কুলের পুরাটা সময় আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, সবার সব কথাই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের দুইজনের খেয়াল হলো, সালাম স্যার চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
ইসহাক স্যার উনাকে আমার সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিদায় নিলেন। আমি আর আসামি দাঁড়িয়ে আছি ফ্ল্যাগপোলটার কাছে। স্যার বলতে শুরু করলেন – নিশ্চয়ই সে খুব ভালো জায়গায় আছে, তুমি মন দিয়ে পড়ো সামনেই পরীক্ষা, কিছু লাগলে জানিয়ো… কি যেন হলো আমার, শুনলাম অনেক দূর থেকে আমার নিজের কন্ঠ ভেসে এসে উনাকে জিজ্ঞেস করছে – নেক্সট লাইফে কি ওর সাথে আমার দেখা হবে, স্যার?
স্যার ‘অবশ্যই হবে, অবশ্যই হবে’ বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। এক সেকেন্ড পর আমি অবাক হয়ে দেখি, আসামি মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।
যতদূর মনে পড়ে, তারপর আর মাত্র একবারই স্যারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। এসএসসি’র রেজাল্টের দিন। আমি আর বাবা গিয়েছিলাম রেজাল্ট আনতে। সব বিষয়ে লেটার পেয়েছিলাম। ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, বা এরকম একটা কিছু। সেই জনস্রোতে কেউ আনন্দের ঠেলায় স্যুট পরে স্কুলে এসেছে, আর কেউ একটা লেটার মিস করেই গলা ছেড়ে কাঁদছে। আমি নিরাসক্তের মতো সবকিছু দেখছি।
তখন ভিড়ের মধ্যে সূর্যের মতো একটা চেহারা চোখে পড়লো। সালাম স্যার। উনি আগেই আমার রেজাল্ট দেখেছেন, খুশিতে ঝলমল করছেন।
আমার বাবার কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন (নর্মাল হ্যান্ডশেক, মাইন্কা চিপা না)। তারপর আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বাবাকে বলতে থাকেন – খুব ভালো ছেলে আপনার… খুব ভালো…
সেটা বহু বছর আগের কথা। তারপর কয়েকদিন আগে জানলাম, স্যার মারা গেছেন।
১১.
ল্যাবরেটরিয়ানদের আড্ডায় ইদানিং প্রায়ই একটা কথা শোনা যায়। আমাদের স্কুলের অবস্থা আর আগের মতো নাই, রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না একদম। সেই সাথে শুনি, অমুক স্যার থাকলে আজ এই অবস্থা হতো না।
আমি ইমোশনালি এসব কথার সাথে একমত। কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কথাটা খুবই উদ্ভট। জীবন জিনিসটা একটা পার্সোনাল জার্নি, যার পরবর্তী স্টেজ হচ্ছে মৃত্যু। আমরা, সেই সব নক্ষত্র-সম শিক্ষকদের ছাত্ররা, কি এতই অকর্মণ্য যে আমাদের স্যারদেরকে অমর হয় স্কুলের মর্যাদা পাহারা দিতে হবে?
তাছাড়া একটা স্কুলের সাফল্য তো কোন টিচারের একার অবদান না – সেটা শত শত মানুষের মিথষ্ক্রিয়ার ফসল। আমাদের আগের জেনারেশনের সময় ঢাকার অন্যতম সেরা স্কুল ছিল তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল। তার আগে ছিল পোগোজ স্কুল। অনেক সাধ্য-সাধনায় গভঃ ল্যাব সেই উচ্চতায় যেতে পেরেছিল – এবং আমি বলবো, আগের টপ স্কুলগুলির তুলনায় অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিল। সেই দিনে ফিরতে হলে স্কুল কালচারের অনেক কিছুই ঢেলে সাজাতে হবে, যেগুলি আমাদের মতো প্রাক্তন ছাত্রদের প্রভাব-বলয়ের বাইরে।
তাহলে আমরা কী করতে পারি? আমার মনে হয়, অনেক কিছুই। নেটওয়ার্কিং, মেন্টরশিপ, ইন্টার্নশিপ – এগুলি তো আছেই। পাশাপাশি এই করোনা-কালে, বা অনগোয়িং বেসিসে বর্তমান স্কুল প্রশাসনের ফিডব্যাক অনুযায়ী দুঃস্থ ছাত্রদের সাহায্যের ব্যবস্থা করতে পারি। সেই তালিকায় থাকতে পারে প্রাক্তন শিক্ষকদের পরিবারও (চিকিৎসার খরচ তাদের অনেকের জন্যই এই বয়েসে একটা বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ)।
ভালো রেজাল্ট করার জন্য স্টুডেন্টদেরকে উৎসাহিত করতে আমরা আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের নামে স্কলারশিপ বা প্রাইজের ব্যবস্থা করতে পারি। আমাদের স্কুল থেকে বোর্ডে জেনারেল ম্যাথে যে সর্বোচ্চ নম্বর পাবে, তার গলায় উঠবে আব্দুস সালাম মিয়া গোল্ড মেডেল – ব্যাপারটা দারুণ হয় না?
ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং আরো অনেক ইত্যাদি। আমরাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল মানুষদের অ্যালামনাই সংগঠন – চাইলে আমরা প্রায় যে-কোন কিছুই করতে পারি।
১২.
যাকে দিয়ে শুরু করেছিলাম, তাকে দিয়েই শেষ করি। সালাম স্যার আর নেই ভেবে আমার একটুও খারাপ লাগছে না। বরং, ঐ যে বললাম, টেনশনে পড়ে গেছি। ইতিমধ্যে তিনি পরপারে দৌড়াদৌড়ি প্র্যাকটিস করার অনেক সময় পেয়ে গেছেন। দাবড়ানি দিলে তার হাত থেকে পালানো আর অতটা সহজ হবে না।
মৃত্যুর ঐ পাড়ে কি হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর একেক ধর্মগ্রন্থে একেক রকম। আমার মনে হয়, ঈশ্বর যদি একজনই হন, তাহলে স্বর্গ বোধহয় সেক্যুলার। সব ধর্মের, সব বিশ্বাসের মানুষের সেখানে অবাধ যাতায়াত। আজকাল যেহেতু আমার অবসেশন ক্রিশ্চিয়ান মিথোলজি নিয়ে, তাই ‘পরকাল’ কথাটা ভাবলেই দেখি সেইন্ট পিটার একটা হিরন্ময় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হবু স্বর্গ-বাসীদের কাগজপত্র চেক করছেন।
জীবনের আলোকিত মুহূর্তগুলোয় আশা রাখি, কোন না কোন ভালো কাজের সুবাদে একদিন আমিও সেই গেটের সামনে লাইন দিবো। আমার পালা এলে সেইন্ট পিটারের সাথে হিসাব-নিকাশ সেরে জিজ্ঞেস করবো, আচ্ছা আব্দুস সালাম মিয়া লোকটা কোথায়?
সন্ত বলবেন – কে সে? আমাদের এখানে অনেক সালাম আছে।
তখন আমি বলবো – লোকটা পকেটে একটা ফিল্মের কৌটায় বালু নিয়ে ঘোরে।
– ও, সেই লোকটা! খুবই ভালো সে। খালি দৌড়াদৌড়ি করে অবশ্যি।
– আচ্ছা… সে কি এখন আগের চেয়ে অনেক জোরে দৌড়ায়? নাকি একটু একটু?
– তা বলতে পারবো না বাপু। (সেইন্ট পিটার আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন।) ইজ হি অ্যান ওল্ড ফ্রেন্ড?
– ইভেন বেটার, ফাদার। (আমি স্মিত হাসি।) অ্যান ওল্ড এনেমি।