বাংলাপ্রিয়বিভাগ
মানুষ ও উপলক্ষ

Goodnight, sweet prince

লেখার আকার

মাহফুজকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে কি বাংলায় লেখা উচিৎ, নাকি ইংরেজিতে? আমাদের দুইজনেরই স্বপ্ন ছিল ভালো রাইটার হওয়া।

আমরা আগ্রহ নিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল, জিনাত বুক সাপ্লাই থেকে চকচকে নতুন ইংলিশ উপন্যাস জোগাড় করে পড়তাম, আর আমাদের দেশের সাহিত্যের কোন গতি হয় না কেন সেসব নিয়ে হা-হুতাশ করতাম।

তখন অরুন্ধতী রায়ের জয়-জয়কার। গার্সিয়া মার্কেজ, সালমান রুশদি একের পর এক জাদুবাস্তব উপন্যাস লিখে চলছেন। বাংলা মিডিয়ামের স্কুল-কলেজে যেহেতু বিদেশি সাহিত্য খুব একটা পড়ানো হতো না, তাই অনেক ক্লাসিক লেখককেও ভার্সিটি জীবনের আমরা কেবল চিনতে শুরু করেছিলাম – শেক্সপিয়ের, কাফকা, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি। সাহিত্যপ্রেমী মাহফুজ আমার চেয়ে বছরখানেকের ছোট ছিল। শুরুতে ‘আপনি‘ করে বলতো, নর্থ সাউথে পড়ার সময় কোন একটা ক্লাবের আড্ডায় আমাদের পরিচয়।

অসাধারণ ডিবেটর ছিল, তার উপর দারুণ আবৃত্তি করতো, উপস্থাপনায়ও খুব ভালো। বি.বি.এ. পড়লেও তার ধ্যানজ্ঞান ছিল গল্প। যেহেতু আমি হাল্কা সিনিয়ার, তার উপর ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে পড়ি, সেজন্য প্রায়ই ওর লেখা পড়ে ফিডব্যাক দিতে বলতো।

আমি অভয় দিতাম, তোর লেখার হাত এমনিতেই ভালো, আমার ফিডব্যাক লাগবে না!

তবু সে হাসিমুখে বলতো, তবু একটু পড়ে দাও না!

তাই পড়তাম এবং আবারও কনফার্ম করতাম – তার লেখার হাত ভালো।

এখনো চোখে ভাসে, আমাদের কাঁঠাল বাগানের বাসার সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে মাহফুজের ‘হঠাৎ‘ মনে পড়লো, তার লেটেস্ট লেখাটা আমার পড়া হয়নি। সবুজ মলাটের মোটাসোটা একটা খাতা, অর্ধেকের বেশি ভরে গেছে। সেই লেটেস্ট লেখা প্রায় দশ পেইজ লম্বা।

এখানে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে?

আহা পড়ো না।

আমি পড়া শুরু করে একসময় আবিষ্কার করি, পুরা লেখাটাই পড়ে ফেলেছি। বললাম – ভালৈ তো, কোন কোর্সের অ্যাসাইনমেন্টের জন্য লিখছিস?

এমনি প্র্যাকটিস করার জন্য লিখছি।

আমি হা করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সেই বয়সে প্র্যাকটিস করার জন্য লিখতে লিখতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলার মতো নিষ্ঠা কয়জনের থাকে?


ইন্টার পাশ করে আমি ডেইলি স্টারে একটা চাকরি পেয়েছিলাম। সেই চাকরির প্রতি আমার একমাত্র আকর্ষণ ছিল কম কষ্টে হাতখরচের টাকা উপার্জন করা।

টিউশনি করানোতে অনেক খাটুনি, কোচিং সেন্টারে পড়ানোরও অনেক হ্যাপা। সেই তুলনায় কয়েক পাতার একটা আর্টিকেল লিখে ফেলা কোন ব্যাপারই না।

চাকরির প্রথম সপ্তায় আমি এডিটোরিয়াল কিছু দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। মাসখানেকের মধ্যে সাপ্তাহিক সাপ্লিমেন্টের একটা পেইজের ইন-চার্জ হলাম। তারপরও ঠিক পোষাচ্ছিল না, তাই বছরখানেকের মধ্যে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম…

এই পর্যন্ত শুনে মাহফুজ চোখ বড় বড় করে বলে উঠে – হায় হায়, কেন? এইটা তুমি কি করলা?

আসল কারণটা ছিল আলস্য, তবু তাকে সাত-পাঁচ কিছু একটা বুঝালাম। শুনে সে কী বুঝলো জানি না, কিন্তু তারপর থেকে কোন পত্রিকা লোক নিচ্ছে জানতে পারলে সে আমাকে জোর করে সেখানে অ্যাপ্লাই করাতো। এমনও হয়েছে, সে নিজেই আমার রেসিউমি তৈরি করে আমার হয়ে অ্যাপ্লাই করে এসেছে। আমি স্বভাবসুলভ আলস্যে তার এইসব বদান্যতা সাধারণত ভেস্তে দিতাম।

একদিন আমাকে ফোন করে লাগাতার ঝাড়ি – ঐ মিয়া, তোমার না আজকে অমুক পত্রিকার এডিটরের সাথে দেখা করার কথা ছিল, আসো নাই কেন? আমি আগেভাগে তোমার কথা বলে রাখছিলাম!

স্যরি, ক্রিকেট খেলতে গেছিলাম…

পারোও তুমি, বুঝলা! পারোও! বলতে বলতে সে রেগেমেগে ফোন রেখে দেয়।

এরপর কিছুদিনের জন্য মাহফুজ আমাকে আর কোন জবের কথা বলে না। ভাবলাম, ও আমার খাসলত বুঝে গেছে, এসব নিয়ে আর জ্বালাবে না।

কিন্তু নিউ এইজে জয়েন করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সে আমার ইন্টারভিউ সেট করে ফেললো। অনেকবার সাবধানও করলো, এইবার কিন্তু মিস করবা না।

তাতেও অবশ্য সে সন্তুষ্ট হলো না। ইন্টারভিউয়ের আধা ঘন্টা আগে এসে আমাকে নিউ এইজের পুরানো অফিসটায় ধরে নিয়ে গেল।

চাকরিটা পেয়েছিলাম। আমার চেয়ে মাহফুজই বেশি খুশি হয়েছিল।

প্রথম দিনের অফিস শেষে ঝকঝকে একটা হাসি দিয়ে বললো, এইবার ট্রিট দাও!

বললাম, কই খাবি? হেলভেশিয়া?

না, অফিসের নিচে চায়ের দোকান আছে, চা খাওয়াও।

সেই চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললাম – তোকে হেলভেশিয়ায় খাওয়ার অফার দিলাম আর তুই চা খাইলি? লস হয়ে গেল না?

তখন সে খুব ভাব নিয়ে বলে – We’re journalists now. We celebrate like real journos.


আশ্চর্য লাগে, ক্যাম্পাসের কেউ কেউ মাহফুজ সম্পর্কে বলতো – তার ভাব বেশি। অথবা, এই পোলাটাই বেশি বেশি, সব ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্লাবে তার থাকা লাগবে – কোন মানে হয়?

বলা বাহুল্য, এসব কথাবার্তা ছিল ঈর্ষাপ্রসূত। ঐ আমলে নর্থ সাউথে ভেদাইম্মা পোলাপানের অভাব ছিল না, আমার ধারণা এখনো নাই। যারা এ জাতীয় কথা বলতো তারা বড়জোড় হয়তো দূর থেকে মাহফুজকে দেখেছে – হয়তো কোন ডিবেট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে। যে ধরনের মঞ্চে পারফর্ম করতে না পারলে বারবার কেউ ডাক পায় না। কিন্তু ঐটুকু দেখার ভিত্তিতেই ভেদাইম্মাগুলির যত অনুযোগ, যত সমালোচনা।

এসব কথাবার্তা যে মাহফুজকে ঠিকই এফেক্ট করে, বুঝতাম। কিন্তু কোনদিন তাকে এসব নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে শুনিনি।

অথচ সেই মানুষটাই কিনা একদিন ভার্সিটির ক্যান্টিনে উপস্থিত হয়ে বলে – মন খারাপ, খিচুড়ি খাওয়াও।

আমি তার স্বাস্থ্য নিয়ে হাল্কা রসিকতা করে কোন পাত্তাই পেলাম না। বলে, আহা খাওয়াও না! বললাম তো মন খারাপ।

আমি উঠে গিয়ে খিচুড়ি নিয়ে আসলাম। কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করি, বল এখন, কাহিনী কী?

জানা গেল সে কিছু কোর্সে কিছুতেই গ্রেড উঠাতে পারছে না। সেই সাথে হাল্কা নারীঘটিত বেদনাও আছে (যেটা নিয়ে সে আলোচনা করতে নারাজ)।

আমি বললাম – তুই এরকম হাজার হাজার ক্লাব করলে, সাংবাদিকতা করলে পড়ালেখার টাইম কেম্নে পাবি! এখন আন্ডারগ্র্যাড শেষের দিকে, কিছু একটা ছাড়।

সে কিছুতেই রাজি হলো না। বললো, They’re a part of me. I don’t want to give that part up.

এরকম করলে কেম্নে গ্রেড উঠাবি!

প্লিজ একটা আইডিয়া দাও না! তুমি অনেক গুছায়ে চিন্তা করতে পারো।

ঢং করিস না, উই বোথ নো আমার চেয়ে তোর মাথায় আইডিয়া বেশি।

আই অ্যাম সিরিয়াস।

মহা মুশকিল, আমি কি বুদ্ধি দিবো!

সে গম্ভীরভাবে খিচুড়ির প্লেটে আবার মন দেয়।

কাকতালীয়ভাবে ঠিক তখন ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের এক বান্ধবী এক প্লেট ফুচকা নিয়ে হাসিমুখে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। স্লিপ খেয়ে তার হাত থেকে অর্ধেকের বেশি ফুচকা পড়ে যায়। তাকে সাহায্য করতে যাব কি যাব না ভাবছি, তার আগেই ছুটে আসে ক্রাশ খাওয়া জনৈক মহাজন। লাভ নাই, বান্ধবী বিবাহিত।

ফুচকার জানাজা শেষ হলে আমি মাহফুজকে বলি, তোর পড়াশোনা করা লাগবে না।

ধুর, হোলো না।

এভাবে চিন্তা কর, তোর লাইফে পড়াশোনা জিনিসটা বাই ইটসেল্ফ এত ইম্পর্ট্যান্ট না। এক-দুইটা কোর্সে গ্রেড খারাপ আসলে কি যায় আসে? তুই সব মিলায়ে যা যা করতেছিস, সেটার সমষ্টিটা ইম্পর্ট্যান্ট।

তবু সে কনভিন্সড হয় না। আমার পরবর্তী ক্লাসের সময় হয়ে যায়।

মাহফুজ তর্জনী উচিয়ে আমাকে আলটিমেটাম দেয় – চিন্তাভাবনা করে আমাকে একটা কিছু বলবা। ওকে? আজকেই। প্রমিজ করো। এখনই প্রমিজ করো।

কি বিপদ! আমি হু-হ্যা করে কেটে পড়ি।


ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে একটা উপন্যাস পড়তে পড়তে ধা করে মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো।

সেদিন বিকালে ওর অফিসের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম – No medicine cures what happiness cannot.

কি বল্লা? আবার বলো, মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে সে উৎসুক গলায় বলে।

No medicine cures what happiness cannot. গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের একটা উপন্যাসের লাইন।

কী সুন্দর! ওয়াও!

এবার বল, সলিউশন পাইছিস?

কয়েক সেকেন্ড ভেবে সে হেসে মাথা নাড়ে, I understand now. I can’t give up what makes me truly happy. যো হোগা, আচ্ছা হি হোগা।

আমি থাম্বস আপ দেখিয়ে নিউ এইজের পেঁচানো সিড়িটা দিয়ে নিচতলায় নামতে থাকি।

উপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে আসে – তুস্‌সি গ্রেট হো, তাশফীন! তুমি আসলেই একটা জিনিস!

আমি হাসি।


আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

মাহফুজ আর আমার কাজ আলাদা, ব্যস্ততাও আলাদা। ও মূলত উইকএন্ড সাপ্লিমেন্টে কাজ করে, আর আমি সাপ্তাহিক ফিচার পাতায়। দুজনেরই পড়ালেখার প্রেশার বাড়ছিল। নানা কর্মকান্ডে জড়িত থাকায় মাহফুজের বাড়তি দৌড়াদৌড়ি তো ছিলই।

আমি নিজেও যথেষ্ট ব্যস্ত থাকতাম। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং আর ইংলিশে ডাবল মেজর করছিলাম, যেটা আমার আগে নর্থ সাউথে কেউ করেনি – তাই ব্যাপক প্রশাসনিক প্যারা ছিল। ততদিনে নানা ওপেন সোর্স প্রজেক্টে জড়িয়ে গেছি, ক্রিকেট-ফুটবলও খেলতাম নিয়মিত।

সব মিলিয়ে ওর সাথে আগে যতটা সময় কাটানো হতো – ক্যান্টিনে, অফিসে, বা বাসায় – সেটা আর হতো না। কলিগদের সাথে স্ক্র্যাবল খেলা, টংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে তাসনীমের সাথে আড্ডা দেয়া, কিংবা কালে-ভদ্রে বই কিনতে একসাথে নিউ মার্কেট যাওয়া – এসবের বাইরে বলতে গেলে মাহফুজের সাথে কথাই হতো না। সত্যি বলতে কি, তখন এটা নিয়ে কিছুটা বিরক্ত ছিলাম। আমি সাংবাদিক হওয়ার প্রায় সাথে সাথে শালা আমাকে ভুলে গেল? যদিও আমার সাংবাদিক হওয়াতে যত লাভ আমারই হয়েছে, মাহফুজের না।

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা, তুই যে আমাকে সাংবাদিক বানানোর জন্য এত সিরিয়াস, এমন কি আমার নিজের চেয়েও বেশি সিরিয়াস, ওয়াই?

ও আমাকে শুধরে দেয়, সাংবাদিক না, রাইটার বানানোর জন্য।

তাইলে এই সাংবাদিকতা করার কী মানে?

বাহ, লিখতে লিখতে হাত পাকাচ্ছো, সেই সাথে টু পাইস ও কামাচ্ছো।

কিন্তু তোর নিজেরও তো লেখার হাত ভালো। তুই আমার জন্য এত কষ্ট করতেছিস কেন?

তোমাকে দিয়ে হবে, সেজন্য।

আহা সেটা তো তোর নিজেকে দিয়েই হয়, আমাকে কেন…

বললাম তো, তোমাকে দিয়ে হবে, সেজন্য।


আমার বুঝতে বুঝতে অনেকদিন লেগে যায়, এরকমই ছিল সে – এমন না যে আমি একাই তার কাছে স্পেশাল ছিলাম। তার চোখে সবাই আসলে স্পেশাল ছিল।

সবাইকেই সে কলিজা উজাড় করে সাহায্য করতো। আবার নিজের প্রয়োজনে সাহায্য চাইতেও দেরি করতো না।

অনেক মাস কেটে যায়। মাহফুজের সাথে বলতে গেলে আমার দেখাই হয় না। অফিসেও তাকে খুব একটা দেখি না। তারপর একদিন হঠাৎ লক্ষ্য করি, সে চুপচাপ তার ডেস্কে বসে আছে।

আমাকে দেখে বললো, হেই। আমিও বললাম, কি রে।

এই জাতীয় পরিস্থিতিতে সাধারণত এর চেয়ে বেশি কথা হতো না, কিন্তু কেন যেন মনে হলো ও থম মেরে আছে। কাছে গিয়ে বললাম, এভাবে বসে আছিস? সব ঠিকঠাক?

বললো যে ঢাকার বাইরে একটা অ্যাসাইনমেন্টে ছিল, গতকাল ফিরেছে।

ওয়াও, বাসা থেকে তোকে যেতে দিলো?

দিতে চায় নাই, রাজি করাইছি।

কি বলে রাজি করাইলি?

বললাম যে আমি জার্নালিস্ট, এসব তো করতেই হবে।

তাতে কাজ হয়ে গেল?

হুম।

কৈ গেছিলি?

(যতদূর মনে পড়ে, ছিটমহল বা এরকম কোথাও একটা।)

কি অবস্থা ঐখানে?

টেরিবল।

কিরকম?

মানুষের একদম বেইসিক সুযোগ-সুবিধাও নাই। কিন্তু আবার সবকিছু নর্মাল। লোকজন হাসিখুশি, যদিও দে হ্যাভ সো মেনি স্ট্রাগলস। আমি এই নর্মালনেসটাই নিতে পারি নাই।

আমি চুপ করে থাকি।

হঠাৎ অদ্ভুত একটা লুক দিয়ে মাহফুজ বলে – Someone needs to do something, বুঝলা?

হ্যা, গভমেন্ট তো কিছু না কিছু করবেই… তুই রিপোর্ট লিখবি, মানুষ প্রবলেমগুলির ব্যাপারে জানবে… ঐখানের কমিউনিটি আরো ভিজিবিলিটি পাবে…

শুনে সে তীব্রভাবে মাথা ঝাঁকায় – না, আরো কিছু করতে হবে। আরো অনেক কিছু।


শেষ পর্যন্ত আমি বা মাহফুজ কেউই আর সাংবাদিক থাকিনি। আমার ঠাঁই হয় কানাডায়।

মাহফুজ ইংল্যান্ডে চলে যায়। সেখানে সে দারুণ সফল হয়। কদাচিৎ হাই-হ্যালোর বাইরে অনলাইনেও আমাদের যোগাযোগ হয় না।

বরাবরই সে দেশপ্রেমিক; একসময় বিলেতের অপার প্রফেশনাল সম্ভাবনাকে বিদায় জানিয়ে সে বাংলাদেশে ফিরে। এত বছর পর আমার মনে হয় – জীবনে আগাগোড়াই মাহফুজের প্ল্যান ছিল অনেক বড় কিছু করা। সবাইকে নিয়ে, সবার জন্য বড় কিছু করা। সেজন্যই তার দেশে ফেরা।

অপেক্ষায় ছিলাম, এরপর ঢাকা গেলে ওর সাথে লম্বা আড্ডা দিবো। সেটা আর হচ্ছে না।

মনে পড়ে, আমি কানাডায় আসার বছরখানেক পর ও হঠাৎ একদিন ফোন করেছিল। এতদিন পর ওর কল পেয়ে আমি আকাশ থেকে পড়লাম।

ফোন ধরে বললাম, কিরে তুই? এদ্দিন পর?

সে গদগদ গলায় কিছুক্ষণ কুশল বিনিময় করলো। তারপর আমাকে চমকে দিয়ে বলে, তোমার বাংলা লেখা তো খুবই ভালো! কবে থেকে লিখতেছ?

আরে না! কৈ, কি দেখছস?

চেইঞ্জ অফ প্ল্যান, তুমি এখন থেকে বাংলায় লিখবা বুঝলা?

আমি যে এখনো তোর প্ল্যানে আছি এটাই তো জানতাম না!

আরে ধুর। ইউ আর অলওয়েইজ ইন মাই প্ল্যান। নো মোর অরুন্ধতি। হুমায়ূন, রবীন্দ্রনাথ, এইসব পড় বুঝলা? সুনীল ও পড়ো।

ধুর!

আই অ্যাম সিরিয়াস।

তোর নতুন প্রজেক্ট কি আমাকে হুমায়ূন আহমেদ বানানো?

কেন, তাশফীন মাহমুদ হলে খারাপ কি?

ভাগ শালা, এত বছরেও তোর কোন চেইঞ্জ হৈল না!

হা হা হা…

তারপর স্বভাবসুলভ আলস্যে আমি বাংলা-ইংরেজি কোন ভাষাতেই নিয়মিত কিছু লিখি না।

আরো কয়েক বছর কেটে যায়। তখনো আমি লিখছি, লিখছি-না‘র দোলাচলে। নানা কারণেও সময়টাও ভালো যাচ্ছিল না। হঠাৎ মাহফুজ নক করে বলে – ঐ, তোমার ঐ লেখাটা তো খুব সুন্দর! কিপ ইট আপ!

মনে হলো, আমাদের টেলিপ্যাথিক কানেকশন তাহলে আগের মতোই আছে! হাসিমুখে বললাম, ওকে।

এবং যথারীতি লেখালেখির জগৎ থেকে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। বলতে গেলে তারপর থেকে মাহফুজের সাথে আর যোগাযোগই নাই। শেষবারের মতো আমাদের মেসেজ চালাচালি হয়েছিল কয়েক মাস আগে, আংকেলের মারা যাওয়ার খবর শুনে। আর দুই দিন আগে শুনলাম, সে নিজেই হার্ট অ্যাটাক করে না-ফেরার দেশে চলে গেছে।

আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম – আমাদের একসাথে একটা ছবি পর্যন্ত নাই।


আমার আর তাশফীন মাহমুদ হওয়া হয়নি। শুধু লিখতে জানলেই ভালো লেখক হওয়া যায় না, তার জন্য ডিসিপ্লিন লাগে, স্যাক্রিফাইস লাগে, প্রফেশনাল একটা পাবলিশিং ইন্ডাস্ট্রি লাগে – একজনের পক্ষে এতগুলি ‘লাগে‘র সলিউশন বের করা খুব কঠিন।

কিন্তু একটা সমাজ যদি তার গল্পগুলিকে সিরিয়াসলি নেয়, এবং গল্প-চর্চাকে সত্যি সত্যি উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে এক ঝাঁক ভালো লেখক তৈরি করা খুবই সম্ভব – কয়েক দশক লেগে গেলেও সম্ভব।

যেটা সম্ভব না সেটা হচ্ছে মাহফুজের মতো মানুষ তৈরি করা।

সেই ঝকঝকে হাসির মানুষটাকে বেশিরভাগ লোক চেনে একজন তারকা বিতার্কিক, সাংবাদিক, বা এরকম কোন পরিচয়ের জন্য। একবার যে মাহফুজের সাথে আড্ডা দিয়েছে, তার পক্ষে মাহফুজকে ভুলে যাওয়া অবান্তর। কিন্তু এই যে অন্যকে নিঃস্বার্থভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া, তাদের সেরাটা বের করে আনার প্রতিভা বা সহমর্মিতা, ওয়ান ম্যান আর্মির মতো এগিয়ে যাওয়ার প্রচন্ডতা – এসব কয়জনের থাকে?

আবার কবে বাংলাদেশে এরকম একজন মাহফুজ আসবে?


অনেকদিন ধরে ‘সেই চেনামুখ‘ নামে একটা লম্বা স্মৃতিচারণমূলক সিরিজ লিখছি – বা বলা ভালো, লিখছিলাম। টানা বিশ-পঁচিশ পর্ব লিখে আর ইচ্ছে করছিল না।

হয়তো অবচেতন মনে অপেক্ষা করছিলাম, সময়মতো ঠিকই মাহফুজ গুঁতা দিবে, তখন দেখা যাবে।

ওর মৃত্যু সংবাদ শুনে তাই প্রথমেই আমার মাথায় যে চিন্তাটা আসে সেটা হচ্ছে – কিছু লিখতে হবে, অনেকদিন কিছু লেখা হয় না।

মাহফুজ, বহু বছর আগে ঠাট্টা করে আমারে বলছিলি – অ্যাই তুমি কিন্ত আমার ইউলজি লিখবা!

সেদিন রামঝাড়ি দিয়েছিলাম এই জাতীয় অলুক্ষনে কথা বলার জন্য। আজকে সেটাই লিখলাম।

তোর প্রিয় ‘হ্যামলেট‘ নাটকের একটা লাইন দিয়েই শেষ করি।

Goodnight sweet prince: and flights of angels sing thee to thy rest!

ভালো থাকিস।


এই লেখককে আরও পড়ুন