ডিয়ার জর্জ হ্যারিসন
মানুষ ও উপলক্ষ · · ৬ মিনিটের পাঠ

জুনের মাঝামাঝি, ১৯৭১।
টেনশনে টেনশনে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ পর ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে দুই-দুইটা কনসার্টে তোমার লিড করার কথা। কিন্তু এখনো লাইন আপই ফাইনাল না।
জন আসতে রাজি হলেও ইয়োকা’কে নিয়ে গাইতে চায়। তুমি ভদ্রভাবে ওকে বলেছো একাই আসতে। পল তো শুনেই ঠাস করে না করে দিলো। এতদিনের ব্যান্ডমেট, মানবিক কারণে কনসার্ট হবে – তাতেও মন গললো না। কি আশ্চর্য।
রিংগোটা অবশ্য আগের মতোই আছে। শুনেই নিজে থেকেই বলেছে, কবে? কিন্তু শুধু রিংগো, রাভি’র সাঙ্গপাঙ্গরা, আর তুমি নিজে – এই কয়টা প্রাণী দিয়ে তো আর কনসার্ট হয় না।
তোমার ম্যানেজার ফোনের উপরেই আছে। খালি গায়ক থাকলেই হয় না, ব্যান্ড লাগে, ব্যাক-আপ লাগে, দৌড়াদৌড়ি করার মানুষ লাগে। বিলি প্রেস্টন, ব্যাডফিঙ্গার, লিওন নামের ছোকড়াটা, এরকম কিছু পোলাপান পারকর্ম করবে আশা করা যায়। এরিকও উৎসাহী, কিন্তু শো’র সময় ঠিক থাকবে তো? ইদানিং নাকি সে কঠিন হিরঞ্চি।
কী বিপদ, কী বিপদ! প্লেনের জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে দুশ্চিন্তায় তোমার দম বন্ধ হয়ে আসে। লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে আছে, উদ্বাস্তু হয়ে গেছে.... অথচ পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে জীবন কত স্বাভাবিক।
এমন কিভাবে হয়? কেন হয়?
বব ডিলানকে পাওয়া গেলে কেল্লাফতে, মানুষ তার গান শুনতে আসবেই। তার উপর গত পাঁচ বছরে নাকি সে তেমন কোন কনসার্ট করে নাই। আর ঐদিক থেকে যদি জন ব্যাটা সত্যি সত্যি আসে....
জুলাই ৩১, ১৯৭১।
কিভাবে কিভাবে যেন সপ্তাহগুলি হুড়মুড় করে চলে গেছে। আজ ঘুম থেকে উঠে দেখলে, পরদিন কনসার্ট।
ইতিমধ্যে সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। পুরা অনুষ্ঠানের ভিডিও রেকর্ডিং হবে। লাইন-আপ মোটামুটি নিশ্চিত, আবার নিশ্চিত না – ইয়োকোর সাথে ঝগড়া করে জন বাসা ছেড়ে চলে গেছে। তুমি ধরে নিচ্ছ ও আসবে না। বড় দুশ্চিন্তা ববকে নিয়ে। সে এতই নার্ভাস যে শেষ পর্যন্ত স্টেজে উঠতে পারবে কিনা বলা যাচ্ছে না।
মাঝেমাঝে তোমার নিজেরই তাই মনে হয়, হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছো না। এক সপ্তাহ ধরে প্র্যাকটিস সেশনের আয়োজন করা হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ আসছে না। কনসার্টের আগের দিন বলে হয়তো আজ সবাইকে পাওয়া গেছে। ডিলান বাথরুমে বসে হার্মোনিকা বাজাচ্ছে। তা-ই সই।
শ্যান্ডেলিয়ারের কোমল আলোয় একটা লোক চোখ বন্ধ করে সরোদ বাজাচ্ছে। তাকে ঘিরে রাভি, কামালা, রিঙ্গো, বিলি, এরিক, সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে আছে। অথচ একটু আগেই যখন ব্যাডফিঙ্গার প্র্যাকটিস করছিল, তখন এই সরোদ-মানুষটা কানে হাত দিয়ে বসে ছিল। রক অ্যান্ড রোল নাকি তার কাছে বানরের চ্যাচামেচি।
‘ব্লাডি হেল’ বলে বিড়বিড় করতে করতে এরিক উঠে চলে যায়। তোমার ঠোঁটে মুচকি হাসি ভর করে; পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গিটারিস্টের বয়ানে এটাই যে সর্বোচ্চ প্রশংসা, তা তুমি ভালো করেই জানো।
নরম রোদের মতো সন্ধ্যাটা আস্তে আস্তে কেটে যায়। আকাশে চাঁদ ভাসতে থাকে সফেদ বেলুনের মতো। এক সময় তোমার বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসতে ইচ্ছে হয়। স্টুডিওর সামনের ল্যাম্পপোস্টটার কাছে গিয়ে দেখলে, লিওন খুব তৃপ্তিভরে গাঁজা খাচ্ছে।
তোমাকে দেখে শলাকাটা এগিয়ে দিলো। তুমি মাথা নেড়ে বোঝাও, খাবে না।
এখনো নার্ভাস? লিওন জিজ্ঞেস করে।
– সে আর বলতে!
– আমিও। চাঁদটা চরম না আজকে?
– হ্যা, চরম।
– ইচ্ছা করতেছে চাবায়ে খায়ে ফেলি।
– (তুমি মাথা নাড়।)
– ঐ লোকটা কে? ঐ যে সারোড বাজাচ্ছে?
– উস্তাদজি? রাভি’র ফ্রেন্ড, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছে।
– এই তাহলে সেই লোক! ইয়েহুদি মেনুহিন যাকে বলছে ওয়ার্ল্ডের বেস্ট মিউজিশিয়ান?
– (তুমি মাথা নাড়।)
– We're playing with gods, man. We're playing with gods.
পহেলা মে, ২০২০
প্রিয় জর্জ,
’৭১ এর পর এতগুলো বছর কেটে গেছে, তবু তোমার ঐ গানটা এখনও নিজের অজান্তে গুনগুন করে উঠি। মাঝেমাঝে বিশ্বাসই হতে চায় না যে সেটা তোমার লেখা, কোন বাঙালির না। নাকি তুমি আসলে বাঙালিই ছিলে, আমরা কেউ টের পাইনি? এমনকি রবি শংকরও না?
তোমাদের কনসার্টটা শেষপর্যন্ত অসাধারণ হয়েছিল। না, অসাধারণ খুব তুচ্ছ একটা শব্দ; Concert for Bangla Desh রক অ্যান্ড রোল’কেই বদলে দিয়েছিল। আর আমার দেশের প্রেক্ষাপটে তো ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের শো দুটো অমর।
নার্ভাসনেস জয় করে বব ডিলান যে কি চমৎকার গেয়েছিলেন সেদিন!নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার। তুমি জানতে পারলে খুশি হতে, কয়েক বছর আগে সে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। এরিক ক্ল্যাপটন সেই কনসার্টে নিজের তুলনায় খুব একটা ভালো বাজাননি, কিন্তু নেশার ধাক্কা উপেক্ষা করে লোকটা যে দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
তোমার ঐ গানটার পরেই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে শো’র শুরুতে যে ‘বাংলা ধুন‘, সেইটা। রবি শংকরের কি অসাধারণ কম্পোজিশন! তার উপর সেতার বাজিয়েছেন রবি স্বয়ং; তবলায় আল্লা রাখা, তানপুরায় কমলা শাস্ত্রী, আর সেতারে সেই কিংবদন্তি – আলী আকবর খান।
খান সাহেব কিন্তু আমেরিকায় মাইগ্রেট করার আগেই আমাদের এদিকে লেজেন্ড ছিলেন, বন্ধু। লতা মঙ্গেশকর উনার সুরে গান গেয়ে কোন টাকা নিতে রাজি হননি। সারা ভারতবর্ষে ওস্তাদজির ‘চন্দ্রনন্দন’ রাগ হিট হয়েছিল। চাট্টিখানি কথা না, ভারতবর্ষ বিশাল জায়গা। আর আমেরিকায় প্রথম ম্যাকআর্থার গ্র্যান্ট পাওয়া উপমহাদেশীয় মিউজিশিয়ান তিনিই।
উনার গ্রামের বাড়ি কোথায় জানো জর্জ? জেলার নাম বললে হয়তো চিনবে না। সেখানে ইদানিং সময়টা ভালো যাচ্ছে না। তুমি তো বেঁচে নাই, এক দিক দিয়ে বেঁচে গেছে। করোনা কি জিনিস তোমাকে জানতে হলো না।
যাই হোক, সেখানে কিছুদিন আগে এক লাখ লোক একটা জানাজা, মানে ফিউনারাল অ্যাটেন্ড করেছে। এই একটা ঘটনার জন্য যে কত লোক অসুখটার খপ্পড়ে পড়বে, না খেয়ে থাকবে – কল্পনাও করা যাচ্ছে না।
খবরটা শুনে আমার প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ হয়েছিল, রাগও হয়েছিল জায়গাটার উপর। কিন্তু তার পরপরই মনে পড়লো, আরে, আমাদের ওস্তাদজি-ও তো ঐদিকের লোক। আবার ঈসা খাঁ, মানে সম্রাট আকবরের ঘুম হারাম করা একজন বীর যোদ্ধা, তার জন্ম একই জেলায়। অথৈ নামের একটা ছোট্ট মেয়ে, যে কিনা করোনা-সন্দেহে বিনা চিকিৎসায় মারা গেল এবং তার জানাজায় বলতে গেলে কোন লোকই হলো না – সে-ও ঐখানকার।
ভাগ্যিস তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছিলাম, জর্জ – এতদূর লিখে বুঝতে পারছি, যা ঘটার ঘটবেই, জেলা-টেলা আসলে কিছু না। যে জমিতে ধান ফলে, তাতে পোকামাকড় হাঁটে, আগাছাও হয়; আবার কোন না কোনদিন সেখানে মৃত ব্যক্তিরা মাটির চাদর জড়িয়ে শুয়ে পড়ে।
জায়গাটার নাম তোমাকে এখনো বলি নাই – আসলে আর প্রয়োজনও নাই। তা-ও যদি তোমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়, তাহলে ধরে নাও সেই জেলার নাম বাংলা।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি, বন্ধু। সামনে বড় কঠিন সময় আসছে। দোয়া কোরো আমাদের যেন সুমতি হয়। তুমি তো অনেক বড় শিল্পী, ঈশ্বর হয়তো তোমার প্রার্থনা শুনবেন...
১লা আগস্ট, ১৯৭১। Concert for Bangla Desh এর দ্বিতীয় শো।
জর্জ হ্যারিসনের সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষ গেয়ে উঠলো, হয়তো আবার কোনদিন গাইবে –
My friend came to me, with sadness in his eyes
Told me that he wanted help
Before his country dies
Although I couldn't feel the pain, I knew I had to try
Now I'm asking all of you
To help us save some lives
Bangla Desh, Bangla Desh