বাংলাপ্রিয়বিভাগ
মানুষ ও উপলক্ষ

লাঞ্চ ব্রেক

লেখার আকার

লাঞ্চ ব্রেক

১১.১২.১৮

হারু মাস্টার একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, বলতো কোন্‌ প্রাণীর পা পেছন দিকে থাকে?

গাছতলার ছোট্ট পাঠশালাটায় সেদিন ছাত্র ছিলাম আমরা মোটে কয়েকজন। সজলটা বরাবরই বোকাসোকা, সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে বললো – স্যার, গরুর।

মাস্টারমশাই গম্ভীর গলায় বললেন – তাইলে তো তোর পা-ও পিছন দিকে থাকত রে।

আমাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।

সজল তবু মাথা চুলকে বলে, কিন্তু গরুর সামনে দুইখান পা, পিছনেও দুইটা। নাকি?

আরে গাধা ‘পিছনে’ পা থাকে বলি নাই।

তাইলে?

‘পিছন দিকে’ পা থাকে। মানে পায়ের পাতা দিকে মুখ করা থাকে।

খুড়ের লাহান?

এক থাবড়া খাবি। প্রানীটা হইলো জ্বীন।

কিন্তু জ্বিন কি প্রাণী? আগুনের তৈয়ার না?

আল্লার কছম সজল, থাপড়ায়া আজকে তোর ভ্যাবলা দাঁতগুলান ফালায়া দিব।

সেই কত কাল আগের কথা! মাস্টারমশাই সজলের গায়ে সেদিন হাত না তুললেও হাসতে হাসতে আমরা প্রায় মরেই গেছিলাম। সেই অনেক বছর আগে আমার একটা ছোট্ট বোন ছিল, আর আমার বাবা খুব ভালো হাত দেখতো।

না, ভুল বলা হলো। যে-সব গণক ইত্তেফাকের পাতায় বা টিভি-ম্যাগাজিনের চিপায়-চাপায় বিজ্ঞাপন দেয়, তাদের বেলায় বলা চলে, ভালো হাত দেখে। দশটা প্রেডিকশন করলে অন্তত তিনটা লেগে যাবে। নইলে পয়সা ফেরত, ইত্যদি।

আমাদের বাবা দুর্দান্ত হাত দেখতে পারতো। কারো হাতের রেখায় চোখ বুলানোর পর তার মুখ দিয়ে যা বেরোতো, সবকিছু অব্যর্থভাবে ফলে যেত। যেন জগৎ-সংসার অলিখিত একটা নিয়ম করে রেখেছিল – এই মানুষটা হস্তরেখা দেখে যা যা বলবে, তাই ঘটবে। না ঘটার কোন কারণ নাই।

কারো হাত দেখে বাবা হয়তো বললো, আগামিকাল তোমার চাকরি হয়ে যাবে, টেনশন কোরো না – পরদিন সন্ধ্যার মধ্যে সে হাসিমুখে মিষ্টি নিয়ে হাজির হতো।

কারো হাত দেখে বাবা হয়তো বললো, এই মাসের শেষে তোমার খুব জ্বর হবে – সেই মানুষটা খুব ভাব নিয়ে বিদায় নিলেও মাস শেষে ঠিকই কাশতে কাশতে বাবাকে একটা ফোন দিত। না মাহমুদ ভাই কোন কারণ নাই, খুকখুক। এমনে ফোন দিলাম। কেমন আছেন? খুকখুকখুক।

বাবার খুব ঘনিষ্ঠ একটা বন্ধু ছিল, ডাঃ শাহরিয়ার। বস্তি বস্তি ঘুরে যে কত মানুষের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছেন তার হিসাব নাই। ১৯৮৮‘র বন্যায় ত্রাণ বিতরণ করতে যাওয়ার আগে তিনি এলেন বাবার সাথে দেখা করতে।

বাবা তার হাত দেখে অন্ধকার মুখ করে বললো, খোকন তুই যাইস না, অঘটন ঘটবে।

চাচা বরারবই ডানপিটে স্বভাবের, হাসতে হাসতে বললেন, তুই বেশি চিন্তা করস! ঘাবড়াইস না, কিছু হৈব না!

সেদিন বাবা শাওয়ারের নিচে হাউমাউ করে কেঁদেছিল। আমি আর আমার বোন বাথরুমের দরজায় কান পেতে সেই কান্না শুনেছিলাম। আমাদের বাবা এমনিতে কখনো কাঁদে না। হঠাৎ কাঁদছে কেন?

তার কিছুদিন পরই লঞ্চ দুর্ঘটনায় খোকন চাচা মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি ডুবন্ত মানুষজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।

(“মৃত্যুকালে তিনি ডুবন্ত মানুষজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।“ এর চেয়ে বিষন্ন সুন্দর এপিটাফ আর কী হতে পারে?)

হাত দেখার এরকম একটা সুপারপাওয়ার থাকলে যে সেটা আপনার জীবনের প্ল্যান-প্রোগ্রামকে প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। বাবাও হাত দেখার ভিত্তিতে অনেক সময় বলতো, অ্যাই এই কাজটা করিস কিন্তু, বা ঐটা করিস না। নিজের বেলায়ও সে একই ফর্মূলা মেনে চলতো।

আমার বোনটা জন্মানোর পর বাবা তার ছোট্ট গোলাপি হাতজোড়া দেখে মা’কে বলেছিল – এই মেয়ের দশ বছর বয়েসে একটা ফাঁড়া আছে।

মা, যে কিনা এমনিতে সবসময় বলতো বাবার হাত দেখা হচ্ছে চ্যাংড়াকালে মেয়েদের হাত ধরার উছিলা, এমন কথা শুনে আঁৎকে উঠে বললো – এইটা তুমি কী বল্লা! ফিরায়ে নাও!

কিন্তু ফিউচার কি কখনো ফেরে? বাবা বুঝিয়ে বললো, চিন্তা কোরো না, ফাঁড়া থাকলেও মেয়েকে আমরা দেখেশুনে রাখবো। দশ বছর পার হলেই আর চিন্তা নাই। দেখবা, বড় হয়ে সে হবে অসাধারণ।

দশটা বছর বাবা-মা আসলেই তাশনুভা (এবং আমাকে খুবই) চোখে চোখে রেখেছিল। তারপরও যে রাখেনি তা না, কিন্তু ঐ যে বললাম, ফিউচার বলে কথা।

ফেরানো যায় না।

কিছুদিন আগে ছিল আমার একমাত্র ছোট বোনের বিশতম মৃত্যুবার্ষিকী।

বাবার হাত দেখার হিসাব-নিকাশে ছোট্ট একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। এগারো বছর দুই মাস আঠারো দিন বয়সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে সে মারা যায়। এরপর থেকে বাবা হাত দেখা পুরাপুরি ছেড়ে দেয়।

আজও বাবা-মা‘র চোখে প্রায়ই দেখি, কাকে যেন খুঁজছে ওরা। এ-জীবনে কখনো খুঁজে পাবে না জেনেও সেই খোঁজ থামাতে পারছে না, খুঁজেই যাচ্ছে।

আমার খুব বলতে ইচ্ছা করছে, আমিও আমার বোনকে প্রায়ই স্মরণ করি, মিস করি। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আস্তে আস্তে ওর চেহারা আমি ভুলতে বসেছি। আগে কান পাতলেই যেই ছোট্ট মেয়েটার খশখশ শব্দে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে দৌড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেতাম, এখন তার কথা মনে করতে হলে মগজটায় একটু প্রেশার দিতে হয়।

যার সাথে কাঠের রুলার আর স্টেডলার রাবার দিয়ে বাড়িময় ক্রিকেট খেলতাম, তার ঝকঝকে হাসিটা মনের আয়নায় নিজে থেকে আর প্রতিফলিত হয় না।

বয়স হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতির আলমারিটায় ধুলার একটা স্তর পড়ে গেছে।

একটা বয়সে ভাবতাম, আমার বাচ্চাকাচ্চা হলে হয়তো বাবা মা আস্তে আস্তে তাশনুভাকে ভুলে যাবে। এভাবে আর কষ্ট পেতে থাকবে না। আর এখন বাবা হওয়ার পর বুঝি, সেটা কোনদিনই সম্ভব না! বরং কষ্টটা দিন দিন বাড়তেই থাকবে, যতদিন তারা বেঁচে থাকবে। এই দহন যেন-তেন দহন না।

হৃদয়ের কাছে জীবনের অর্থটা খুব সহজ – যতদিন পারো ধুকধুক করে যাও। আমার বাবা মা ধুকধুক করে যাচ্ছে। আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে বিয়ে করেছি, আমাদের ফুটফুটে মেয়েটার লাস্ট নেম তার ফুফুর নামে – লীলা তাশনুভা। আমার জীবন ফুরফুরা। শুধু আমার বাবা মা ধুকধুক করে যাচ্ছে।

নিজের ফুফু তো দূরে থাক, বাপের সাথেই লীলার চাল-চলনে, চেহারায়, কোন দিক থেকেই খুব একটা মিল নেই। সে খুব সম্ভবত ৯৯% টিনা এবং ১% আমি। তাতে অবশ্য আমি খুবই খুশি, কারণ টিনাকে আমি খুবই পছন্দ করি! তবু লীলার কিছু কিছু চাহনি দেখে, কোন কোন হাসি শুনে আমার শিরদাঁড়ার সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে যায়।

মনে হয়, এই মানুষটাকে আমি তো আগে কোথাও দেখেছি!

কোথায় দেখেছি? কোথায় যেন আমরা একসাথে বসে একই হাসি হেসেছিলাম?

কোথায় যেন আমরা একই খেলা খেলেছি?

মনে পড়ে না, কিংবা স্মৃতিভ্রম হয়। বয়স হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতির আলমারিটায় ধুলার একটা স্তর পড়ে গেছে।

আমি জ্বিন হয়ে গেছি, আমি জ্বিন হয়ে গেছি....


এই লেখককে আরও পড়ুন