মহান মা দিবস
মানুষ ও উপলক্ষ · · ৯ মিনিটের পাঠ
মায়ের সাথে আমার বরাবরই প্রতারণার সম্পর্ক।
প্রত্যেক মেয়েরই শখ থাকে, তার প্রথম সন্তান মেয়ে হবে। আমার মায়েরও সেরকম শখ ছিল, কিন্তু হলাম আমি।
আরেকটু বড় হয়ে যখন ভাত খাওয়া শিখলাম, মা গোল্লা গোল্লা করে আমাকে যখন খাওয়াতে যেতো – আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে – ভাতের খুব কাছে আমি মুখ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিয়ে বলতাম, কাইছি! অর্থাৎ খেয়ে ফেলেছি। (মা তখন ভাতের গোল্লায় টমেটো সস দেয়া শিখে গেলো। সেই থেকে আমি টমেটো সসের কাছে জিম্মি।)
আরেকটু বড় হয়ে যখন ভিডিও গেম খেলার বয়স হলো, মাকে বলতাম – মা আর মাত্র দশ মিনিট!
মা বলতো – আচ্ছা যাও বিশ মিনিট দিলাম, তার পর কিন্তু বন্ধ করতে হবে!
দেখা গেলো তার দুই ঘন্টা পরও আমি আটারি কন্ট্রোলারের সাথে সেঁটে আছি…
রোযার ছুটিতে ক্রিকেট খেলতে যেতাম সকাল দশটায়। দোতলার জানালা দিয়ে সারসের মতো গলা বের করে মা বলতো – বারোটার মধ্যে বাসায় চলে এসো কিন্তু, গোছল করে ভাত খাবা…
আসতাম ঠিকই, কিন্তু বারোটা না, দুইটায়। তাও আবার ভাত খেয়ে-দেয়ে আবার খেলতে যাবো বলে।
আমার শিক্ষাজীবনের অন্যতম প্রধান ট্র্যাজেডি, আমি ক্লাস থ্রি থেকে ফোর-এর ফাইনাল পরীক্ষা পর্যন্ত টানা ফার্স্ট হয়েছিলাম। মা‘র অভ্যাস খারাপ হয়ে গেলো, আমি গভঃ ল্যাবরেটরি স্কুলে চলে আসার পরও তার ইচ্ছা হতো, আমি আগের মতো ফার্স্ট হই। বা অন্তত সব সেকশন মিলে তিনের ভেতরে থাকি।
আমি বললাম, তিনের ভেতরে কেন?
মা খুশি খুশি গলায় বললো, তাহলে রেজাল্ট দেয়ার সময় ডায়াসে দাঁড়াতে ডাকবে। দূর থেকে সবাই দেখবে, আমার ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে।
আমার মায়ের সেই স্বপ্ন কখনো সফল হয়নি। প্রত্যেক বছর আমি ফাটাফাটি রেজাল্ট করার মিথ্যা আশ্বাস দেখাতাম। তারপরও প্রত্যেক বছর মা আশায় বুক বাঁধতো। কিছুদিন আগেও সে আমাকে বলেছে, আমার ছেলে যে পিএইচ.ডি. করবে না, এটা আমি মানতেই পারি না!
(আমার বা আমার লেখাপড়ার উপর তার এই অগাধ বিশ্বাসের কারণ আমি আজও জানি না।)
ইন্টার পাশ করে আমি আমেরিকার মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে গিয়ে ওদের ব্রোশিওর পাঠাতে বললাম। মাসখানেক পর বাসায় একটা হলুদ রঙের খাম এলো। বিছানার উপর ‘ইউনিভার্সিটি অফ…‘ লেখা খামটা দেখা মা দূর থেকে বললো – বাবা ঐটা কী?
আমি বললাম, মা বাইরের একটা ইউনিভার্সিটির…
সঙ্গে সঙ্গে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো – না না না বাবা আমি শুনতে চাই না, তুমি ঐটা ধরবা না…
আচ্ছা মা ,এটা একটা কথা হলো? কি ছেলেমানুষি শুরু করলা।
না তুমি আমাকে কথা দাও, তুমি ধরবা না। আমার ছেলে আমার কাছে থাক।
ওকে যাও, ধরবো না।
সেদিন সত্যি সত্যি খামটা না খুলেই ফেলে দিয়েছিলাম। আজ প্রায় এগারো বছর ধরে কানাডা আছি।
(মা নিজেও অবশ্য এখন হাফ-কানাডিয়ান।)
পুরুষ কখনো একটা মা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না।
প্রকৃতি আমাদের মা; পুরাণের দেবী মা। কন্যাসন্তানকে আমরা সস্নেহে মা বলে ডাকি, সেই ফর্মূলায় কন্যার সমবয়সী মেয়েরাও মা। শ্বশুরের স্ত্রী মা, পিতার অন্যান্য স্ত্রীও মা। ছেলের বউ মা। মায়ের বয়সী মহিলামাত্রই মা।
এমন কি ছেলেমেয়ে হয়ে যাওয়ার পর নিজের বউকেও আমরা ডাকি, অ্যাই গ্যাঁদার মা! (যেখানে গ্যাঁদা = আপনার প্রিয় সন্তানের নাম।) লিস্টের সেখানেই শেষ না। জননেত্রী মা, দেশনেত্রী মা, দেশ ও জাতিও আমাদের কাছে মা।
এই পোস্টটা লিখতে লিখতে আমার অববোধন – সারাজীবন ধরে আমি জন্ম-বিবাহ-রক্তসম্পর্ক নির্বিশেষে আমার জীবনের সব মা চরিত্রকেই ঠকিয়ে আসছি।
নিজের মায়ের কথা আগেই বলেছি। মা হবার পর টিনার যে-টুকু সাপোর্ট দরকার ছিল, সেটা দেয়া তো দূরে থাক, অনেকদিন পর্যন্ত আমি বুঝতেই পারিনি। এমনকি চান্স পেলেই আমি লীলাকে ফাঁকি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকার ভান করি। চান্স খুব একটা অবশ্য পাই না; আমার মেয়ে আমার মতোই সেয়ানা।
আচ্ছা, আমি মানুষটা এরকম কেন?
আমার আরো অনেক বন্ধুবান্ধবও এই টাইপের। রতনে রতন চেনে, শুয়োর চেনে মানকচু – ঐ লজিক ঠিক ধোপে টেকে না, কারণ আমাদের মতো লোকই মেজরিটি কিনা জানি না, তবে সংখ্যায় অনেক।
অতএব, আমি ব্যাপারটার একটা আর্কিটাইপাল ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছি।
সৃষ্টির আদিযুগে কোন এক চালাক-চতুর পুরুষ বুঝে ফেলে, মেয়েরা যে শুধু সন্তান জন্ম দিতে পারে, তা না। তারা যে-কোন পরিবেশে প্রাণসঞ্চার করতে পারে।
এক চিলতে খালি জায়গা পড়ে আছে, নারী সেটাকে আঙিনা বানিয়ে ফেলবে। একটা খালি বাসা পড়ে আছে, কোত্থেকে যেন একটা ফুলদানি জোগাড় করে ফেলবে। কিংবা মারি কুরির মতো কিছু অণু-পরমাণু নিয়ে খেলতে খেলতে দুই-দুইটা নোবেল প্রাইজ জিতে বেড়াছেড়া লাগিয়ে দেবে।
নারী খুবই রিস্কি প্রজাতি, অতএব সেই আদি পুরুষ আতংকের সাথে সিদ্ধান্ত নিলো – ছেলেদের সহজাত প্রতিভা, মানে চাপাবাজি এবং চিল্লাচিল্লি দিয়ে মেয়েদেরকে লাইনে রাখতে হবে। তাতে যদি কাজ না হয়, তাহলে কাছা মেরে কবিতা লিখতে হবে। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।
সবচেয়ে বড় কথা – বিয়ে করা মেয়েদের কোন ফিউচারই রাখা যাবে না। চুড়ি আর খুন্তির বাইরে মেয়েদের যেন কোনদিকে মন না যায়, সে ব্যাপারে সদাসতর্ক থাকতে হবে। এইরকম প্যাঁচের মধ্যে ফেলে দিলে দেখা যাবে মেয়েরা নিজেদের মধ্যেই হাউকাউ-কুটনামি করে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। পুরুষের গড়া সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার কথা তাদের মাথায় আসবে কিভাবে!
যে জন্য আজো আমাদের মায়েদের বাবাদের মতো রাগী হতে নেই, সফল হতে নেই। ইচ্ছা হলেই তাদের ব্যাডমিন্টন খেলতে যাওয়ার সুযোগ নেই; থার্টি ফার্স্ট নাইটে আনন্দ মিছিল তো দূরের কথা, স্বস্তিভরে বাসে চলাচলেরই সম্ভাবনা নেই। ‘অবরোধবাসিনী‘ উপন্যাসে বেগম রোকেয়া সেই একশ বছর আগে পর্দাপ্রথার হিপোক্রিসি ফাঁস করে দিয়েছিলেন; আর আজ অনেকে পর্দা করা শুরু করছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে।
তাই বলে কি দেশে কোন সাক্সেসফুল মেয়ে নাই?
অবশ্যই আছে। ঐ যে বললাম, মেয়েরা ন্যাচারালি অঘটনঘটনপটিয়সী। জীবন কখনো থেমে থাকে না, তার কারণ মেয়েরা থেমে থাকে না। কিন্তু আজকের যুগেও সাক্সেসফুল হতে গিয়ে মেয়েদেরকে ছেলেদের তুলনায় এত বেশি কাঠখড় পুড়াতে হয়, যে সেটা একেবারেই ফেয়ার না – এবং সেজন্য বেশিরভাগ মেয়ের পক্ষে সম্ভবও হয় না।
ফর এক্সাম্পল, একজন পুরুষকে বাচ্চা হওয়া না হওয়া নিয়ে কখনো টেনশন করতে হয় না। স্বামীর বায়োলজিকাল কারণে যদি কোন দম্পতির বাচ্চা না হয়, তবু ‘দোষ‘টা কিন্তু বাই ডিফল্ট হয় স্ত্রীর। বিয়ে হওয়া না হওয়া নিয়েও ছেলেদেরকে টেনশন করতে হয় না; বিয়ে হচ্ছে না? আরে, দেশে কি আর ভালো মেয়ে আছে নাকি। বাড়ির ছেলে পড়াশোনার জন্য বেশি বয়সে বিয়ে করতে গেলে তার পরিচয়, সে খুবই কোয়ালিফাইড; একই কাজ একটা মেয়ে করতে গেলে কানাকানি হয়, ওর কি আর বাচ্চা হবে? কি স্বার্থপর মেয়েরে বাবা, ক্যারিয়ারের জন্য সবকিছু ছাড়খাড় করে ফেললো।
(মাতৃত্ব জিনিসটাকে আমরা সেলিব্রেট করি, খুবই ভালো কথা। কিন্তু সেটা কী করে একটা মেয়েকে বিচার করার একমাত্র মানদন্ড হয়? আর শুধু জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায়? সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা যে নারীর সহজাত সৃজনশীলতার মাত্র একটা ডাইমেনশন – এটা আমরা কবে বুঝতে শিখবো?)
ইত্যাদি। ইত্যাদি। এবং আরো অনেক ইত্যাদি।
তবে এটা ঠিক, দিন বদলাচ্ছে। আজ থেকে বিশ বছর আগে যদি একটা মেয়ে ফ্যামিলির হাল ধরতে চাইতো, সে-কথা শুনে যতগুলি লোক টিপ্পনি কাটতো, এখন হয়তো ততগুলি লোক কাটবে না।
মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়ছে, আয় বাড়ছে, গড় আয়ু বাড়ছে। আর সেই সাথে বাড়ছে ধর্ষণ আর হয়রানি। আজ যে মা, গতকাল হয়তো তাকে দেখেই বখাটেরা শিস দিচ্ছিল।
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যে গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে – আমরা কি সেখানে পৌঁছে শান্তিতে থাকতে পারবো?
সামথিং সামথিং জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন।
সারাজীবনই আমি আমার মা-চরিত্রদের কাছে অন্যায় আবদার করে এসেছি। তারা কখনো আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি।
এখনো একটা আবদার করবো, কিন্তু আমার মনে হয় এটা ন্যায় আবদার, অন্যায় না – আশা করছি, ফেসবুকের সূত্রে আমার পরিচিত-অপরিচিত কোন মা-ই আমাকে ফেরাবে না।
বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি, শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে হেডলাইন হচ্ছে। ভিকটিমদের মধ্যে মেয়ে বাচ্চা আছে, ছেলে বাচ্চা আছে; দশ মাস বয়সীও বাচ্চা আছে। ট্রেন্ডটা কিন্তু আসলে অনেক পুরানো। সবসময়ই এসব হয়ে আসছে।
সাংবাদিক-জীবনে আমার কিছু বিরল রিপোর্ট পড়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছিল। (আজও সেসব নিয়ে আমি দুঃস্বপ্ন দেখি।) ভিকটিমদের প্রায় সবাই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের হাতে নির্যাতনের শিকার –মামা, কাজিন, প্রতিবেশী, এমন কি বাবা। একটা মেয়ে ছিল, ভালো গান গাইতো। তের বছর বয়সে সে রেপড্ হয় তার মায়ের খালাতো ভাইয়ের হাতে। সেই মা তার মেয়েকে কি বলেছিল জানেন? ‘আগেই বলছিলাম, গান শিখিস না!‘ যেন দোষটা গানের, ঐ জানোয়ারের না!
(ঐ যে বললাম, শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না।)
নির্যাতকদের মধ্যে পুরুষ আছে, নারীও আছে। সমাজের সবস্তরের, সব বয়সের, সব পেশার লোক আছে। মা নিজের সাত বছর বয়সী মেয়েকে ভাড়া খাটাচ্ছে, এমন ঘটনাও আছে।
দেখলাম সেই রিপোর্টগুলি কখনো ছাপা হয়নি – আমার কলিগকে তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন?
সে বললো – লোকলজ্জার ভয়ে।
ভয়টা কার?
ফ্যামিলির।
বাচ্চাগুলির শেষ পর্যন্ত কি হলো?
কিছুই না, একটা বাদে কোন কেইস ও হয় নাই। অনেক সময়ই ভিকটিমদেরকে তাদের রেপিস্টদের সাথেই সোশ্যালি উঠা-বসা করতে হইছে।
আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
কলিগ আমাকে মাথা নেড়ে বলে – লাইফ ইজ নট ফেয়ার, ম্যান।
তারপর অনেক বছর চলে গেছে। আজকাল এসব নিয়ে রিপোর্ট হয়, কিন্তু বলতে গেলে ফলো-আপ হয়ই না। বিচার হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না, কারণ সতের কোটি মানুষের দেশে কার কি যায় আসে, কয়েকটা বাচ্চা যদি রেপ হয়? বাচ্চাগুলি নিজেদের ফ্যামিলিরই সাপোর্ট পায় না, কার এত ঠেকা?
আমার বদ্ধমূল ধারণা, আমাদের মায়েরা চাইলে সত্যি সত্যি মানুষের ঠেকা পড়বে।
কল্পনা করুন – পল্টন ময়দান ভরে গেছে বিশাল একটা মিছিলে। মিছিলে অংশ নেয়া সবাই মা। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড – আমরা মা, শিশু নির্যাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। কে পারবে এরকম একটা জনস্রোতকে ইগনোর করতে?
যদি অতটা সাহসী হতে না চান, ঠিক আছে – টিভি, পত্র-পত্রিকায় ফোন করুন। ফোন করে বলুন – অমুক দিন শিশু নির্যাতনের যে খবরটা দেখলাম, সেটার ফলো-আপ রিপোর্ট কবে দেখবো বা পড়বো? সেটাও করতে না চাইলে সম্পাদক বরাবর চিঠি লিখে ফলো-আপের কথাটা জানতে চান – কষ্ট করে কাগজ-কলমে লিখতে হবে না, অনলাইনেই আজকাল লেখা যায়।
সেটাও যদি করতে না চান, অন্তত এই জাতীয় রিপোর্ট ফেসবুক এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন। লাইকের বদলে রাগী চেহারার ইমোজি দিন। কমেন্ট করুন। এরকম ভয়ংকর অন্যায় যেন কোনভাবেই লাইমলাইটের বাইরে না যায়।
যে শিশুকে তার নিজের মা-ই ফিরিয়ে দেয়, অন্য একটা মা এগিয়ে না আসলে সে কার কাছে আশ্রয় চাইবে?
যে ক্ষত কখনো শুকায় না, একজন মায়ের আঁচল যদি সেটা সযত্নে ঢেকে না দেয়, তাহলে কী দেবে?