বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ০৩

পর্ব ০৩

লেখার আকার

আমার মা‘র পেটটা দিনকে দিন স্ফীত হতে থাকে। প্রায়ই আমি লক্ষ্য করি, সে অন্যমনস্ক হয়ে পেটের ভেতরের মানুষটাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

মাঝেমধ্যে মা‘র এটা-ওটা খেতে ইচ্ছা করে। টায়ার্ড থাকে। বাচ্চাদের কাপড়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশ মিস করে। হাসিখুশি থাকে, কিন্তু কোন কোন দিন হঠাৎ বলে উঠে – ‘আব্বুসোনা, আজকে মামি বেশি ভালো ফিল করতেসে না… দুষ্টামি কম করতে হবে, ওকে?‘

আমি মাথা নেড়ে বুঝাই, ওকে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের হাঁটার স্পিড একটু কমে যায়। প্লে-গ্রাউন্ডের দোলনাগুলি আমার জন্য একটু উঁচু ছিল – আগে মা সবসময় আমাকে দোলনায় বসিয়ে পুশ করতো। আস্তে আস্তে সেই পুশ করাটা কমতে কমতে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

পেটের সাথে সাথে মা‘র মুখটাও কেমন যেন একটু ফোলা ফোলা হয়ে যায়। এমনিতেই তার চোখদুটো বড় – দেখলে মনে হয়, চাইলে শুধু অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই এই মানুষটা সমুদ্র সাঁতরে আসতে পারে। প্রেগনেন্সির জন্য সেই চোখদুটো যেন সারাক্ষণ জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করে।

সেই জোনাকিতে বুঁদ হয়ে আমার বাবা ফটাফট ছবি তোলে। আর পাঁচ বছর বয়েসি আমি বিস্ময় ও কিছুটা কৌতূহল নিয়ে তাদের পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করি।


অনেক বড় হয়ে আমি আবিষ্কার করি, বেশিরভাগ মানুষেরই শৈশব-স্মৃতি খুব একটা স্পষ্ট না। সেজন্যই হয়তো বাচ্চাদেরকে তারা খুব একটা সিরিয়াসলি নেয় না – যেন শিশুদের কোন চ্যালেঞ্জ নাই, টেনশন নাই, জীবন জিনিসটাকে বোঝার বা জানার তাড়না নাই।

অথচ ঐ বয়সটাই ব্রেইন ডেভেলপমেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এবং হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়।

এখনো আমাদের বাসায় আমার বোন পেটে থাকা অবস্থায় মা‘র একটা ছবি আছে। কোন এক উইকেন্ডে তোলা বিশাল ফ্রেমের সেই ছবিটা বয়সের ভারে কোথাও কোথাও একটু কুঁকড়ে গেছে। ছবিতে মা‘র পরনে সাদাটে একটা শাড়ি। ঠোঁটে মোনালিসার মতো হাসি, সুখের সাথে কিছুটা বিষাদ মাখানো। সেই মোনালিসা স্মাইলের কারণ – বাবা মাকে ঘন্টাখানেক বসিয়ে রেখে ফটোসেশন করিয়েছিল।

বাবা ফটোগ্রাফির পোকা ছিল। ব্যাংকে চাকরি করে, বাড়ি ভাড়ার টাকা শোধ করে, বিল-ভাট্টা দিয়ে, সংসার চালানোর টাকা সরিয়ে রেখে, একমাত্র বদঅভ্যাস হিসাবে ভুসভুস করে প্যাকেটের পর প্যাকেট সিগারেট সাবাড় করে, এবং আমার নানা আবদারসহ অন্যান্য বিভিন্ন খাতে মানিব্যাগ উজাড় করার পর তার হাতে যেটুকু টাকা থাকতো, সেটাই কষ্ট করে জমিয়ে সে ক্যামেরার সরঞ্জাম কিনতো।

মনে আছে, একবার তার একটা লেন্স দেখে খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু লেন্সটা যেই ক্যামেরার জন্য, সেটা কেনার তার সামর্থ্য ছিল না। বাবা লেন্সটা কিনে এনে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করলো – ‘ক্যামেরটাও কষ্ট-ফষ্ট করে কিনে ফেলবো, লেন্সটা সেইলে ছিল, এত সস্তায় পরে আর পাওয়া যেত না…‘

বলা বাহুল্য, শেষ পর্যন্ত বেচারার সেই দামি ক্যামেরাটা আর কেনা হয় নাই। এখন তার ক্যামেরা কেনার সামর্থ্য আছে। শুধু কি যেন নাই, কে যেন নাই। তাই আগের মতো ছবি তোলার ইচ্ছাটাও আর নাই।


কিন্তু আমি আবারও ফাস্ট-ফরওয়ার্ড করে ফেলছি।

একদিন, সেই পাঁচ বছর বয়েসে, কিভাবে কিভাবে যেন আমার বিকালের রুটিনে ছেদ পড়ে। আমি ব্যাকইয়ার্ডে, বাকিরা ট্রি-হাউজে, রিফা আমার দুষ্কৃতির হিসাবনিকাশ করছে – এমন সময় রত্না হঠাৎ রেগে ওকে বললো, ‘Why are you such a pain? Tashfeen already said sorry, why do you have to torture him everyday?’

রত্নার কথায় নেহাল-শিবলীও হাল্কাপাতলা সায় দেয়। রিফা কারেন্ট শক খাওয়ার মতো একটা চেহারা করে পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়।

বড় বোনকে প্রথমে সে ইংলিশে যুক্তি দেখিয়ে, তারপর সিলেটি ভাষায় ঝাড়ি দিয়ে, এবং অবশেষে খামচাখামচি করে কনভিন্স করার চেষ্টা করে। লাভ হয় না, ফুঁসতে ফুঁসতে রত্না রওনা হয় তার আম্মার কাছে নালিশ দিতে। রিফাও হাউকাউ করতে করতে, আমাকে অগ্নিদৃষ্টিতে দগ্ধ করতে করতে বোনের পিছুপিছু ছোটে।

একটু পর শিবলী আর নেহালও নেমে আসে ট্রি-হাউজ থেকে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বাসায় ফিরে যাই।

খানিকক্ষণ পর নেহাল – ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে যে নিজের নাম বলতো ‘নাহাল‘ – আমাদের বাসায় এসে বলে, ‘তাশফীন, চলো তোমাকে ট্রি-হাউজে নিয়ে যাই।’

সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো আমি স্বপ্নের ভুবনে চলে গেছি। একছুটে ব্যাকইয়ার্ড, তারপর নেহালের কাঁধে চেপে ট্রি-হাউজটার সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম – পড়েই যাচ্ছিলাম সময় সময়! – কিন্তু ওর সাহায্যে, এবং ওর ঝাড়ি খেতে খেতে, কিভাবে কিভাবে যেন ছোট্ট কাঠের ঘরটায় উপস্থিত হলাম।

সেখানে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে থাকতে বললাম – ‘Nahal, this is the best day in my life!’

শুনে সে দাঁত বের করে হাসে। তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে – ‘Sorry, I wanted to bring you up here a long time ago. But you know how Rifa is…‘

ছোট বোনের নামে বিষোদগার করে সে কয়েক মিনিট কাটিয়ে দেয়। রিফা সারাদিন ঝগড়া, চেঁচামেচি করে, আবার বাসায় সবার ছোট বলে সবসময় লাই পায়, ইত্যাদি। শুনে আমি মাথা নাড়ি – তখন আমি কিচ্ছু কেয়ার করি না। আমি তখন স্বর্গে, সাক্ষাৎ স্বর্গে।

নেহাল বলতে থাকে, ভাইবোন থাকার সুবিধা আছে, যন্ত্রণাও আছে। এই যেমন রিফার সাথে অন্যদের প্রায়ই লেগে যায়।

আমি মুহূর্তের জন্য মোহত্যাগ করে বলি, ‘Especially with sisters!’

হাসতে হাসতে সে তখন বলে, না, ব্রাদার-সিস্টার সবার বেলাতেই এই ঝামেলা। শিবলীর সাথেও তার মাঝেমধ্যে লেগে যায়। ‘Besides, one day, you might have a brother or sister. So it’s best to be prepared.’

আমি স্বর্গে বসে পা দোলাতে দোলাতে ঘোষণা দেই, ‘No way, I’m never having a sister!’

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন