বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ০৪

পর্ব ০৪

লেখার আকার

কিন্তু আমার কপাল খারাপ। খুবই খারাপ।

একদিন রিফাকে ভয় দেখাতে গিয়ে আমি ভুল করে সাত্তার আন্টির গায়ের উপর হুংকার দিয়ে পড়লাম। আন্টি এমনই ভয় পেলেন যে নিজের শান্তশিষ্ট অবতার ত্যাগ করে আমাকে ঝাড়ি দিয়ে শুইয়ে ফেললেন। শুধু তাই না, মাকে ডাকাডাকি করে নালিশও করলেন।

সোরগোল শুনে আমার প্রেগনেন্ট মা জলহস্তির মতো হেলেদুলে এসে, টুকটাক কথাবার্তা সেরে গম্ভীর গলায় বললো – ‘তা ভাবী, মাঝেমধ্যে বাচ্চারা এরকম তো করবেই।‘ আর আমাকে বললো – ‘আন্টিকে স্যরি বলসো? এক্ষনি সরি বলো, দ্যাখো আন্টি ভয় পেয়ে গেসে।‘

শুনে সাত্তার আন্টি সিলেটি ভাষায় যা বললেন, তার অর্থ খুব সম্ভবত – উনি শুধু ভয়ই পান নাই, ভয়ের চোটে আরেকটু হলে হার্টফেল করতে যাচ্ছিলেন। অথবা, উনি ভয়ের চেয়ে বেশি ব্যথা পেয়েছেন (আমি দোতলার সবচেয়ে উঁচু সিড়িটা থেকে ‘রৌরররররররর‘ বলে নিচতলায় উনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম)। অথবা, এসব কমপ্লেইনীয় কথাবার্তা তো উনি খাস দিলে আমাকে ভালোবেসে বলছেন – আমার কী হবে জীবনে, আমি এমন দুষ্টু ফুয়া হয়ে যাচ্ছি, এভাবে চলতে থাকলে তো লাফালাফি করতে করতে হাত-পা ভেঙে রাস্তায় পড়ে থাকবো…

আন্টি সামনে থেকে সরতেই মা তপ্ত ওভেনের মতো চোখ করে আমাকে বললো – ‘খবরদার রিফার সাথে আর খেলতে যাবা না!‘

আমি জোরালো প্রতিবাদ করি, ‘But I don’t play with Rifa! I never play with her!’

‘নেহাল, শিবলী কারো সাথেই খেলতে যাবা না।‘

‘But mummy….!’

‘No! কোন দরকার নাই।‘ মা‘র ভলিউম কমে আসে। ‘আমার বাচ্চাকে কিনা দুষ্টু বলে… আর তোমারই বা এসব কেমন বিচ্ছিরি খেলা? গোরিলা গোরিলা… ভয় তো পাওয়ারই কথা।‘

তারপর নিজের ভারী শরীরটাকে নিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে যোগ করে – ‘বান্দর হৈছে একটা।‘

বাই দ্য ওয়ে, পৃথিবীর সব মা‘কে মাদার্স ডে‘র অগ্রিম শুভেচ্ছা।


হিন্দুধর্ম অনুযায়ী মানুষের মনের শত্রু ছয়টা, যাদেরকে ‘ষড়রিপু‘ বলে – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, ও মাৎসর্য। আমার মেইন সমস্যা আসলে অন্য জায়গায় – আমার ঘিলু বেশি।

অত্যধিক বুদ্ধির কারণে আমি বারবার জীবন-পুকুরে হাবুডুবু খাই। এটা সেই পাঁচ বছর বয়েসে সত্যি ছিল, এখনো তা-ই।

গ্যাঁদাকালে মুরুব্বিদেরকে আসলে ঠিকমতো চেনা যায় না। (নিজের গ্যাঁদাকালের কথা বলছি, মুরুব্বির না।) কিন্তু সাত্তার আন্টি ছিলেন নিতান্তই একজন ভদ্রমহিলা – অন্তত আমার সাথে, আমার পাঁচ বছর বয়সের স্মৃতিতে তিনি কখনো খারাপ ব্যবহার করেন নাই। মিষ্টি মিষ্টি প্রশংসা করে টক টক সিলেটি রান্না টেস্ট করাতেন অবশ্য – আপাতত সেটাকে হিসাবে ধরছি না।

এরকম একজন মানুষকে ট্রমাটাইজ করে আমার মধ্যে এক পিস Smarties এর সমান অনুশোচনাও হলো না। উল্টা ভাবলাম, আমার প্রসেস তো ঠিকই ছিল – গোরিলার মতো চিৎকারটা দারুণ হয়েছিল, লাফটাও নিখুঁত – শুধু টাইমিংটা ঠিক হয় নাই। আধা সেকেন্ড অপেক্ষা করলেই বুঝে ফেলতাম, যে হেঁটে আসছে সে ডাইনীর মা, ডাইনী না। পরের বার এই ভুল করা চলবে না।

একদিনের মধ্যেই সাত্তার আন্টি হাসিহাসি মুখ করে ‘অভির আম্মা, অ অভির আম্মা, খিতা বালা নি‘ ইত্যাদি শুরু করে দিলেন। তবু মা কিছুতেই আমাকে সিড়িতে লাফালাফি করার পারমিশন দিলো না – উল্টা যুক্তি দেখালো, ‘তুমি সিড়ি থেকে লাফ দিলে কিন্তু বেবিও লাফ দিতে চাবে। তখন তো বেবি ব্যথা পেয়ে যাবে, তাই না?‘

আমি বহুভাবে মা‘কে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটা পুরাপুরি অসম্ভব – পেটের ভেতরে থাকা বেবিরা সিড়ি দিয়ে লাফ দিতে পারে না। তাছাড়া আমি তো বড় লাফ দিচ্ছি না, এক-দুইটা সিড়ির উপর থেকে লাফ দিতে চাচ্ছি – এইটুকু সাইজের লাফ দেখে বেবি তো দূরে থাক, পিঁপড়ারও লাফালাফি করতে ইচ্ছা করবে না। কিন্তু গর্ভধারিণী নাছোড়বান্দা।

তারচেয়ে বড় যন্ত্রণা – আমি যে আগের মতো গোরিলা হাতে তাকে আক্রমণ করতে পারছি না, এই ব্যাপারটা রিফা প্রচন্ডভাবে উপভোগ করছিল। বাড়িময় সে উৎসুক চোখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, আর আমি যথাসাধ্য দৃষ্টি এড়িয়ে অন্যকিছুতে মন দিতাম। ভুল করে চোখাচোখি হয়ে গেলেই সে দাঁত বের করে বিজয়ীর হাসি হাসতো।

যেন আমার ভুল টাইমিংয়ের পুরা কৃতিত্ব ওর। যেন এইজন্য সে যে-কোনদিন নোবেল প্রাইজ পেতে যাচ্ছে।

আরো বড় যন্ত্রণা – আমি স্কুলেও একটা নারীঘটিত ঝামেলায় জড়িয়ে গেলাম।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন