পর্ব ০৭
স্মৃতিচারণ · · ৩ মিনিটের পাঠ

ভার্সিটি জীবনে আবিষ্কার করি, নীলক্ষেতে সব সাবজেক্টের ‘চোথা‘ পাওয়া যায়। মানে আগের ব্যাচের কেউ একটা ঐ কোর্স করেছিল, সেরকম এক বা একাধিক পাবলিকের নোট জোড়াতালি দিয়ে বানানো আধাখেঁচড়া, ফটোকপি করা, ঘোলাটে-কাগুজে গাইড।
সারা বছর ফাঁকি দিয়েও টেনেটুনে পাশ করার অব্যর্থ অস্ত্র।
এখনো কি পাওয়া যায়? ঢাকা এখন আমার কাছে বিদেশ। বছর দুয়েক আগে দেশে গিয়ে নিজের এলাকাই চিনতে পারিনি। এত বছর পর অন্য বিদেশে বসে, আরেকজন মানুষকে নিয়ে লিখবো বলে, তৃতীয় এক বিদেশের স্মৃতির খাতা খুলতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছে, আমি অন্য কোন ডিমেনশনে চলে গেছি।
সেই ডিমেনশনে পানশালার বদলে কোন এক নস্টালজিয়া-শালায় টুল টেনে বসতেই টের পাই, স্মৃতির মানুষটা আগের সব দেশ-বিদেশ নিয়ে কই যেন ভেগে গেছে। তার ভেগে যাওয়ায় সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেছে, সময়ের সাথে সাথে যেমন হয় – নাকি আমরাই সময়? আমরা বদলে যাই বলেই কি পরীক্ষাটা, পৃথিবীটা বদলায়?
এইটিজে এমটিভি ছিল না, ডিশ অ্যান্টেনা ছিল না।
ইন্টারনেট তো দূরে থাক, কম্পিউটার নামে যে একটা জিনিস আছে সেটাই অনেকে জানতো না।
জানার দরকারও ছিল না। সবকিছুই হাতে-কলমে হতো, এনালগ গ্রহগুলিতে যেমন হয়।
ঐ সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাঁকানাকা যন্ত্রটার নাম ছিল ‘ওয়াকম্যান‘। সোনি‘র তৈরি হেডফোনঅলা, পেন্সিল ব্যাটারিচালিত পোর্টেবল ক্যাসেট প্লেয়ার।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও গেম ছিল ‘প্যাক-ম্যান‘ – একটা মুখসর্বস্ব বৃত্ত পয়েন্ট খেয়ে বেড়াচ্ছে, আবার ভূতটাইপ কিছু চরিত্রের কাছে ধরা খেলে নিজেও মিলিয়ে যাচ্ছে – কয়েন-চালিত মেশিনে খেলা যেত (গার্জিয়ানদের হাতে-পায়ে ধরার পর), চরম এক্সাইটিং একটা খেলা।
তখন আমার জীবনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল টেলিভিশন। বিনোদনের চাইতেও বড় আকর্ষণ – টিভি দেখে অনেক কিছু শেখা যায়। যেমন, হি-ম্যানের মতো হিরো হতে পারলে অনেক শক্তি হবে, সবাই ধন্য ধন্য করবে, দুষ্টুদের পিটিয়ে কৃষক-শ্রমিক-জনতার উপকারেও আসা যাবে। সবদিক থেকেই প্রফিট।
তাই বিগ বার্ড, পোস্টম্যান প্যাট, স্কুবি ডু, ক্যাপ্টেন কেইভম্যান, হি ম্যান, স্পাইডারম্যান, ডেভিড অ্যাটেনবরো – সবার কাছ থেকেই আমি কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করতাম। উইকএন্ডে এসব চরিত্রের সাথে আমার দেখা হতো – চাইলেই যখন-তখন তাদেরকে দেখা যেত না, ইউটিউব, স্ট্রিমিং তখনো বিশ-পঁচিশ বছর দূরে।
পাঁচ বছর বয়েসে এক সপ্তাহ মানে অনন্তকাল। আমার অনন্তকাল কেটে যেত সেই দর্শনের অপেক্ষায়।
তারপর হা করে টিভির অনুষ্ঠান গিলতাম – যেন বড় হওয়ার চোথা গিলছি।
টিভি দেখতে দেখতেই একদিন টারজানের সাথে পরিচয়। অতিবুদ্ধির কারণে সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝে ফেলি, টারজানের মতো হতে চাইলে অ্যালেকজ্যানড্রিয়াকে (সহজ করে এখন থেকে ‘আলেকজান্দ্রিয়া‘ লিখছি) একটা কাজে ব্যবহার করা যায়।
ওর মাথায় অনেক চুল আছে।
সেই চুল সে বেনী করে স্কুলে আসে।
কিন্তু একসাথে খেলাধুলা করি না দেখে ততদিনে আমার প্রতি আলেকজান্দ্রিয়ার আকর্ষণ কমে আসছিল। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলাম, ঠাস করে যদি এখন ওর সাথে খেলতে যাই তাহলে হয়তো ব্যাপারটা একটু অড লাগবে।
তার উপর ক্যালকুলেশনের ব্যাপার আছে – আমি টারজানের মতো ওর চুল ধরে ঝুলতে গেলে কতদূর যেতে পারবো? আফটার অল, ও তো আর গাছের মতো লম্বা না। ঝোলার দূরত্ব কম হলে টারজানের মতো সুর করে ‘অঅঅঅঅ‘ বলে হাঁক দেয়া যাবে না।
আমি বিজ্ঞানী পিটার পার্কার ওরফে স্পাইডারম্যানের স্থৈর্য নিয়ে প্ল্যান-প্রোগ্রাম শুরু করে দিলাম।
[ চলবে ]