বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ০৬

পর্ব ০৬

লেখার আকার

It's close to midnight

And something evil's lurking in the dark

Under the moonlight

You see a sight that almost stops your heart

শৈশবের অবাক চোখ দিয়ে আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম – মাইকেল জ্যাকসনের ‘থ্রিলার‘ গানটা টিভিতে বাজতে শুরু করলে লন্ডনের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। ‘বিলি জিন‘ গানটার বেলায়ও তাই।

বাসি হয়ে যাওয়ার বহুদিন পরও গানগুলি টিনএজ ছেলেমেয়েদেরকে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো টেনে নিয়ে যেত। নেহাল-শিবলীরা বুঁদ হয়ে থাকতো সেই সুরে। আমি তখনো নার্সারি রাইমস আর রূপকথার জগতে – ‘থ্রিলার‘ এর হরর ধাঁচের মিউজিক ভিডিও দেখে ভয় পাই, আবার শিবলীদের মতো বড় হয়ে কুল হতে চাই।

তাই গান বাজার সঙ্গে সঙ্গে ওদের বাসায় ছুটে যেতাম। ওদের সাথে নাচানাচি করে জীবনে যদি কিছু শিখতে পারি, সেই আশায়।


প্রতিভা জিনিসটাই একটা miracle. এইটিজের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান হবে – কে জানতো?

পশ্চিমা বিশ্বের যে অলিখিত বর্ণপ্রথা – মানে সাদারাই শ্রেষ্ঠ, আর কালো-ব্রাউন-তামাটে-হলুদ-লালসহ বাদবাকি সব জাত শূদ্র – সেটা তখনো বেশ জনপ্রিয় ছিল। মাঝেমধ্যে বড়দের মুখে শুনতাম, অমুক বাঙালি আংকেল অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় স্কিনহেডদের হাতে মার খেয়ে ভর্তা হয়ে গেছে। ‘স্কিনহেড‘ মানে ন্যাড়া মাথার শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী যারা কিনা নিজেদেরকে আর্য মনে করে। (ধারণাটা খুবই উদ্ভট, কারণ জাতিগতভাবে এরা আর্যদের ধারে-কাছেও না – তার উপর আর্য রীতিতে মাথা ন্যাড়া করতে হয় নিজের বাবা মারা গেলে।)

আমাদের স্কুলেও কিছু ভবিষ্যৎ-স্কিনহেড টাইপের পোলাপান ছিল। ব্রাউন চামড়ার ছেলেমেয়েদেরকে তারা গণহারে ‘পাকি‘ ডাকতো। ব্রেকে সব ক্লাসের পোলাপান খেলতে বের হলে তারা ‘পাকি‘দেরকে ধরে ধরে বুলিয়িং করতো।

একদিন আমি আর রিয়াদ নামে আমাদের ক্লাসের একটা ছেলে তাদের কবলে পড়ে গেলাম। আমাদেরকে জোর করে ধরে রাখা হয়েছে, এখুনি পকেটে যা আছে কেড়ে নেয়া হবে – এমন সময় আমি পরিস্থিতি প্রসেসিংয়ে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞেস করি – ‘What does paki mean?’

শুনে বুলিদের একজন ধমকের সুরে বললো, ‘You know what it means, paki!’

রিয়াদ চিঁ চিঁ করে কান্না শুরু করলো। তার পকেটে আধা পাউন্ড পাওয়া গেছে।

আমি বুলিটাকে আশ্বস্ত করলাম, আমি আসলেও জানি না। তখন বেশি ছোট বাচ্চাদের বুলি করা হয়ে যাচ্ছে, এরকম একটা মানসিক দোটানায় পড়ে কোমলমতি সন্ত্রাসীটা বুঝালো, শব্দটার অর্থ পাকিস্তানী।

আমি খুশি খুশি গলায় বললাম, ‘Oh good! I’m not Pakistani, my family is from Bangladesh.’

বুলিদের সর্দার – যে কিনা সারা জীবনেও সম্ভবত দাঁত ব্রাশ করে নাই – এই পর্যায়ে বিচ্ছিরি একটা হাসি দিয়ে বলে, ‘You’re all the same! Indians, Pakistanis, Bangladeshis – you’re all pakis! And niggers and jews are pakis too!’

আমিও নাছোড়বান্দা – ‘No we’re not the same. You have to let me go.’

তারপর রিয়াদকে ইশারা করে বলি – ‘But he really is Pakistani.’

(ঐ যে বলেছিলাম – আমার বেশি বেশি বুদ্ধি।)


বলা বাহুল্য, বুলিরা লজিকে বিশ্বাসী না। তাই রিয়াদ, আমি, এবং আমাদের মতো চামড়ার পোলাপানদের গায়ে একটা অদৃশ্য ‘পাকি‘ স্টিকার সেঁটে থাকতো।

খেলার মাঠের বুলিদের দেখে তবু দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া যায় – এক সাবস্টিটিউট টিচার আমাদের সাথে এমন আচরণ করেছিল, যেটা আজকালকের দুনিয়ার ঘটলে লংকাকান্ড ঘটে যেত। এমনিতে স্কুলের টিচারগুলি ছিল খুবই নাইস, এবং প্রত্যেক টিচারের ব্যাক-আপ হিসাবে আরো টিচার থাকতো। কিন্তু যার কথা বলছি, কিভাবে কিভাবে যেন সেই মহিলাটা একাই কিছুটা সময়ের জন্য আমাদের ক্লাসে ছিল।

সেই অল্প সময়টায় মহিলাটা সাদা বাচ্চাদের সাথে ক্লাসে হাসিমুখে কথা বলছিল, আর আমাদের বাকি সবার সাথে ঝাড়ির সুরে। তার উপর শুধু সাদাদেরকেই সে খেলনা নিয়ে খেলতে দিচ্ছিল। আর আমাদেরকে বাধ্য করেছিল চুপচাপ বসে তার হেঁড়ে গলায় পড়া একটা বোরিং গল্প শুনতে।

আবার হোয়াইট সবাই-ই যে তার ফেভারিটজমের সুবিধা পাচ্ছিল, তা না। এত বছর পর দুইয়ে দুইয়ে চার করে বুঝি – মিক্সড, ইস্টার্ন-ইউরোপিয়ান এবং আইরিশ বাচ্চাদের প্রতিও সে রূঢ় ছিল।

এক কথায়, তার ভালোবাসার চেকলিস্টে ছিল শুধু তথাকথিত ‘খাস ইংলিশ‘ শিশুরা। স্বাভাবিকভাবেই ঐ বয়সে ব্যাপারটা বেশ কনফিউজিং লেগেছিল।

ভয়ে ভয়ে আমি ও আরো কয়েকজন জানতে চেয়েছিলাম – কেন শুধু অমুক আর তমুক খেলনা নিয়ে খেলতে পারছে, কিন্তু আমরা পারছি না? তাছাড়া স্টোরিটাইমে তো খেলনা নিয়ে খেলা মানা, এসময় সবাইকেই চুপ করে বসে স্টোরি শুনতে হয়।

সেই কথায় মহিলাটা এমনভাবে চোখ গরম করে তাকিয়েছিল, যার অনুবাদ – স্কুল ও সমাজের বিবিধ বাধা-নিষেধ না থাকলে তোদেরকে আমি এখুনি পুঁতে ফেলতাম, বাপ-মা টেরও পেত না।

ভয়ে আমার শরীরের সব লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু কি বিচিত্র – এই একই মানুষ অন্য টিচারের সামনে, এবং জাত-বর্ণ নির্বিশেষে গার্জিয়ানদের আশপাশে বারবার অন্য কেউ হয়ে যাচ্ছিল। যেন সে মানুষ না, বহুরূপী একটা কিছু।


একটা কথা ভাবলে অবশ্য এত বছর পরও আমার মনটা ভালো হয়ে যায়।

সাবস্টিটিউট টিচারটা যখন শুধু সাদা বাচ্চাদেরকে খেলনা নিয়ে খেলতে দিচ্ছিল, একটা সাদা মেয়ে খেলনা রেখে দিয়ে বলেছিল – তার বন্ধুরা যদি খেলনা নিয়ে খেলতে না পারে, তাহলে সেও খেলবে না। তার দেখাদেখি আরো কয়েকটা সাদা বাচ্চা একই কথা বলে আমাদের কাছে ফিরে আসে।

একসময় একটা বদ ছেলে ছাড়া সবাই স্টোরিটাইমে ফিরে। আমরা একসাথে সেই বোরিং গল্পটায় সৌন্দর্য খোঁজার চেষ্টা করি।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন