বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ১২

পর্ব ১২

লেখার আকার

একদিনের মধ্যেই আমি মোটামুটি বুঝে যাই, বাংলাদেশ জায়গাটা খুব রহস্যময়। লাইফের কুল-কিনারা করতে হলে এখানে ডিটেকটিভের ধৈর্য নিয়ে এগোতে হয়।

যেমন ধরা যাক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ব্যাপারটা।

পাঁচ বছর বয়সে জেট ল্যাগ হওয়ার কথা না, কিন্তু যেদিন ঢাকায় ল্যান্ড করলাম সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই আমি ঢুলুঢুলু। মা তাড়াতাড়ি আমাকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেল। দাঁত ব্রাশ করে আমি বিছানার কাছে গিয়ে দেখি, সেটা একটা জালের মতো জিনিসে আবৃত – মাছ ধরার জালের সাথে পার্থক্য একটাই, ফুটাগুলি অনেক ছোট।

কি মুশকিল! আমাকে বিছানায় ঘুমাতে দেয়া হবে না বললেই হয়, একটা সোফায় শুয়ে পড়তাম। এত নাটকের দরকারটা কি!

আমি ব্যাটম্যানের মতো ঘুরে ঘুরে সেই ঝুলন্ত জালটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। জিনিসটা রুমের চার কোনায় দড়ি দিয়ে উঁচু করে রাখা। (কেন?) দড়িগুলি বেডরুমের চারপ্রান্তে চার ধরনের জিনিসের সাথে বাধা – দরজার ফ্রেমে তীর্যকভাবে ঢুকে থাকা পেরেক, ডাইনিং রুম থেকে টেনে আনা চেয়ার, জানালার গ্রিল, আলমারির উপরদিকের হাতল। (এই জিনিসগুলির মধ্যে কি কোন সম্পর্ক আছে?)

একটা ব্যাটারাং থাকলে ঘ্যাঁচ করে দড়িগুলি কেটে ফেলা যেত। ব্যাটারাং নাই, কি আর করা – কিন্তু ওয়েইট, এটা কি কোন পাজল? আমাকে পাজলটা সল্ভ করে ঘুমাতে যাওয়ার অধিকার অর্জন করতে হবে? কোথায় যেন পড়েছিলাম, আফ্রিকার কোন কোন অঞ্চলে ছেলেরা একটু বড় হলে তাদেরকে একা একা শিকার করা টাইপ পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। প্লেনে করে আসতে আসতে কি আমি বড় হয়ে গেছি?

কয়েক মিনিট এসব ভাবতে ভাবতে ঢুলতে ঢুলতে সিদ্ধান্ত নিলাম – পাজল হলেও এটা আসলে আমার বাবা-মা‘র প্রবলেম, আমার না। আপাতত ঘুম দরকার। অতএব আমি চিৎকার করে মাকে ডাকি।

‘What happened, আব্বু?‘ মা হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে। ‘তুমি bed-এ যাও নাই?‘

‘I can’t get in! There aren’t any doors!’

হাসতে হাসতে মা‘র চোখে পানি এসে যায়, সেই হাসাহাসি শুনে অন্যরাও দৌড়ে আসে।

‘আব্বু, এইটার নাম মশারি!‘

আমি রাজ্যের ঘুম আর বিরক্তি নিয়ে বলি, ‘But why doesn’t it have any doors?’


প্রাণী হিসেবে মশা বেশ নির্মম, তাই অল্পদিনের মধ্যেই আমার মশারির নিচে ঘুমানোর অভ্যেস হয়ে গেল। কিন্তু ঢাকা তখন আরো অনেক রহস্যে ঢাকা।

আমাদের বাসায় দুইজন দাদা - আমার দাদা এবং কমল দাদা (দীদার ছোটভাই)। শুধু তাই না, আমার নাকি আরো কয়েকজন দাদা আছে – আওল দাদা, আতর দাদা, আশরাফ দাদা (এরা আমার দাদার ভাই কিংবা কাজিন)। কমল দাদারও দুই ভাই, মাজন দাদা এবং হারুন দাদা। তারাও নাকি আমার দাদা, ঘনিষ্ঠজন।

এত দাদা নিয়ে আমি কি করবো? সারাজীবন ওরফে পাঁচ বছর ধরে বইপত্রে পড়ে আসছি, বাবার দিকে একসেট গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস থাকে, আর মায়ের দিকে আরেক সেট। পিকচার বুকগুলিতে তাদের ছবিও আঁকা থাকতো, হাসিখুশি দুই জোড়া বুড়ো-বুড়ি।

কেউ কি হিসাবে ভুল করে ফেলেছে? নাকি বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এই অবস্থা?

‘You actually have even more grandpas,’ বাবা বললো।

আরো! আমি নড়েচড়ে বসলাম। ‘Who are they?’

‘My uncles, your grandpas’ cousins…. তারপর তোমার নানা, he’s also your grandpa, and your mum’s uncles and cousins, they are your নানাs too.’

‘Do you have an exact number?’

শুনে বাবা হো হো করে হাসে, যেন আমি খুব ফানি কিছু বলে ফেলেছি। আমি সরু চোখে তাকিয়ে সেই হাসির মধ্যে পিতামহ-রহস্যের বীজ খোঁজার চেষ্টা করি।

অল্পদিনের মধ্যেই অবশ্য আমার সব দাদা-নানাদের সাথে খাতির হয়ে যায়। নানা বলতে মূলত শুধু আমার মা‘র বাবার সাথেই দেখা হতো (যার বাসা গ্রীন রোডে), আর দাদা বলতে আমাদের বাসার দুই দাদার সাথে। অন্যদের সাথে দেখা হতো কালে-ভদ্রে, কোন দাওয়াতে গেলে বা তারা আমাদের বাসায় বেড়াতে এলে।

মনে মনে আমি বাসার দুই দাদার নাম দিলাম – ‘মেইন দাদা‘ আর ‘জুনিয়র দাদা‘।


কিন্তু ঐ বয়সে, সবে বিলাত থেকে ফিরে বাংলাদেশের যে ব্যাপারটা আমার সবচেয়ে রহস্যময় মনে হতো, সেটা হচ্ছে দারিদ্র্য।

রাস্তাঘাটে অহরহ দেখতাম, অনেকের গায়ে ঠিকমতো কাপড়ও নাই। শুধু জোড়া-তালি দেয়া একটা লুঙ্গি পরে হাড় জিরজিরে লোকরা রিকশা টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এখানে-সেখানে ছেঁড়া শাড়ি পরে মহিলারা বাসায় বাসায় ভিক্ষা করছে, ছোট ছোট বাচ্চারা উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে – এগুলি ঐসময়ের খুব কমন দৃশ্য।

মানুষ এত গরীব হয় কি করে?

শৈশবে হৃদয় আর মস্তিষ্কের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকে না, তাই আমি ভাবি – এসব নিশ্চয়ই কোন খারাপ জাদুগর বা সুপারভিলেনের কাজ। কিন্তু কোন সুপারহিরো কাউকে সাহায্য করছে না কেন?

আমি মা‘কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘Mummy, why don’t they have clothes?’

মা বোঝালো, কারণ তারা গরীব।

বাবাকে প্রশ্ন করলাম, ‘Daddy, why can’t we give them our clothes?’

বাবা বোঝালো, একজন-দুইজনকে দেয়া যায়, কিন্তু গরীবরা সংখ্যায় অনেক বেশি। আমাদের যা কাপড় আছে তাতে কুলাবে না।

‘Then how can we help them?’

এই প্রশ্ন শুনে বড়রা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতো, আহা দেখ, ছেলেটার মনে কত মায়া! কিন্তু কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিত না।

আমাদের বাসার কিছু মানুষের বেলাতেও দেখতাম, তাদের কাপড়চোপড় একটু অন্যরকম। মানে আমাদের তুলনায় একটু কম ভালো। তখন হঠাৎ খেয়াল হলো, সেই কম-ভালো কাপড় পরা মানুষগুলির বয়সও কম – আমার চেয়ে একটু বড়, ইংল্যান্ডে থাকলে তারা হয়তো হাই স্কুলে পড়তো, বা Sainsbury’s জাতীয় কোথাও কাজ করতো।

‘Why are their clothes different from ours?’ আমি সুধাই।

যথারীতি বড়রা কারণ দর্শায়, কারণ তারা গরীব, আমাদের বাসায় কাজ করে তাদের জীবন নির্বাহ করতে হয়।

‘They are servants,’ বাবা বুঝিয়ে বলে। ‘Household help.’

‘Servants?’ আমি অবিশ্বাসের সুরে বলি। ‘That can’t be right!’

‘Why not?’

‘Because servants are from ancient times. Like when there were knights and dragons.’

‘No, in Bangladesh we still have servants.’

কিন্তু আমার কিছুতেই ব্যাপারটা বিশ্বাস হতে চায় না। তাই মনে মনে ব্যাখ্যা খুঁজি – কী যেন একটা শুনেছিলাম স্কুলে? বাবা-মা না থাকলে যেসব বাচ্চারা অন্য বাসায় বড় হয়, তাদেরকে কী যেন বলে?

তারপর একদিন টার্মটা মনে পড়ে গেল। আমি ছুটে গিয়ে মা‘কে বললাম, ‘Mummy, I got it! I remember what they’re called!’

‘কার কথা বলতেছ, আব্বু?‘

আমি বাসার কাজের লোকদের নাম উল্লেখ করে করে বললাম।

‘কিন্তু তোমাকে তো বললাম সেইদিন, ওরা আমাদের servants.’

আমি জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলি, ‘No, they’re foster children!’

আমার কথা শুনে জন্মদাত্রী একটা মন-খারাপ হাসি হাসে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অন্যমনস্কভাবে শুধু বলে – ‘আহারে!‘


আস্তে আস্তে আমি বুঝে যাই, এত রহস্যের ভিড়েও বাংলাদেশ নামের পৃথিবীটা একদম স্বতন্ত্র। কোন সমস্যাই এখানে কোন সমস্যা না, কারণ সমস্যা জিনিসটা কিভাবে কিভাবে যেন সবাই আপন করে নেয়।

বাংলাদেশিদের সুপারপাওয়ার একটাই – অভ্যাস।

মুশকিল হচ্ছে, আমি তখনো পুরাপুরি বাংলাদেশি না – আমার স্মৃতি, সত্তা, সবকিছুই লন্ডনে। মনে ক্ষীণ আশা, Kal-El এর মতো যেকোন সময়ে আমাকে একটা space capsule-এ করে ইংল্যান্ডে বা ইংল্যান্ডের মতো কোথাও ফেরত পাঠানো হবে।

অতএব, দেশে থাকার অভ্যাসটা আমার একেবারেই হচ্ছিল না। তার উপর আমি তখন মোটামুটি বাংলা বুঝলেও বলতে-লিখতে পারি না বললেই চলে।

লন্ডনে থাকতে আমি বাসায় বাংলাতেই কথা বলতাম, কিন্তু দেশে ফিরে দেখি, আলটিমেটলি সেই বাংলার দৌড় খুবই সীমিত। বিটিভির নাটকে লর্ড ক্লাইভ যেভাবে নীল চাষীদের সাথে কথা বলতো, আমার বাংলা বলার অবস্থা ছিল অনেকটা সেরকম।

আমার মুখে মাতৃভাষার এরকম massacre দেখে আন্টিরা প্রথমে কিউট বলতো, তারপর প্রশংসা করতো, এবং অবশেষে উপদেশ দিত, ‘বাংলাটা আরেকটু ভালো করে শিখে ফেল!‘

অল্পবয়েসীরা কথায় না, কাজে বিশ্বাসী – আমাদের বাসার পেছনে এক চিলতে জায়গা ছিল (সেটাই ঐ সময়ে কত বিশাল মনে হতো!), আশেপাশের ছেলেমেয়েরা খেলতে আসতো সেখানে। বয়স কত হবে তাদের? দুই-আড়াই বছর থেকে শুরু করে চৌদ্দ-পনের পর্যন্ত। তাদের সাথে খেলতে গিয়ে প্রথমেই আমি আক্রান্ত হলাম।

আমার বাংলা শুনে কেউ নির্মমভাবে হাসলো, আবার কেউ ব্রিটিশরা কত খারাপ, বাংলাদেশকে ১৯৪৭ এর আগে কত কষ্ট দিয়েছে সেই ফিরিস্তি দিলো। সেই সাথে সবাই মিলে জোরে জোরে আমার গাল টেপা শুরু করলো, টিপলে কত লাল হয় সেটা দেখার জন্য।

আমি পুরাপুরি ট্রমাটাইজড হয়ে বললাম – ‘Stop it! You’re bullying me!’

কিন্তু বাংলাদেশ তখন বুলিয়িংয়ে খুবই অভ্যস্ত, তাই এটাকে কোন সমস্যা গণ্য করা হলো না। আমি কোন রকমে পালিয়ে বাসায় ফিরলাম। একটু পরে কমল দাদা আমার পক্ষে ফাইট করতে গিয়ে সেই ছেলেমেয়েগুলিকে ঝাড়িবাজি করে আসলো। সে তোতলা ছিল বলে তাতে খুব একটা কাজ হলো না।

তাই ঢাকায় আমার প্রথম যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়, তারা রাস্তার শিশু – চলতি ভাষায় যাদেরকে বলে, বস্তির পোলাপান।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন