পর্ব ১৩
স্মৃতিচারণ · · ৯ মিনিটের পাঠ

ভালোবাসা মানুষকে অলস করে। লন্ডনের স্কুলে জিম ক্লাস হতো, প্লে-গ্রাউন্ড ছিল।
বিকালে খেলার মাঠ ছিল। বাসায় ব্যাকইয়ার্ড ছিল। এক কথায়, exercise করার অনেক সুযোগ ছিল। কাজেই চঞ্চল ছিলাম – জীবনটাই তখন চাঞ্চল্যপূর্ণ।
শুধু যে হাত-পা নাড়াচাড়া করার স্বাধীনতা, তা না – বন্ধুবান্ধব ছিল, স্কুলের লাইব্রেরিটা ছিল। এমন কি ক্লাসের সায়েন্স প্রজেক্টের ব্যাঙাচিগুলিও আমার অনেক আপন।
ফ্রবিশার রোড তখন মোটামুটি চুপচাপ, শান্ত, আদ্যোপান্ত আবাসিক একটা অঞ্চল। বাবার শেখানো কায়দায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে মেডিটেশন করতাম, নয়তো বইয়ের পর বই পড়ে শেষ করতাম। আমার পাঁচ বছর বয়েসী পৃথিবীটায় উইন্টারের তুষারপাতের মতো এক ধরনের প্রাচুর্য ছিল।
বাবা-মা‘কে ভালোবেসে আমি মিনিমাম প্রতিবাদে বাংলাদেশে ফিরে দেখি, আমাদের কাঁঠাল বাগানের বাসার আশেপাশে প্লে-গ্রাউন্ড বলতে শুধু একটা পিচ্চি ‘বালুর মাঠ‘। জায়গাটা আগে ঝিল ছিল, আক্ষরিক অর্থেই বস্তার পর বস্তা বালু ঢেলে সেটার মাঠ-জন্ম। বাসা থেকে তিরিশ সেকেন্ড দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানেও আমার খেলতে যাওয়া বারণ।
‘Why?’ আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করি ।
‘It’s too far, you’re too small.’
‘But my old playground was farther from our house in London.’
‘That’s different, in Dhaka you have to be more careful.’
‘Why?’
বাবা কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে, তারপর হাসিমুখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ভুজুংভাজং বোঝায়। আমি সায়েন্স প্রজেক্টের সেই ব্যাঙাচিগুলির মতো ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না – যেমন ধরা যাক কলাবাগানের সেই পার্কের ব্যাপারটা।
মেইনরোড লাগোয়াঁ সেই পার্কটায় খেলনা বলতে একটাই স্লিপার, তার নিচের দিকটা বাঁকা এবং মরিচা-গ্রস্থ। একবার তাতে হাত-পা কেটে গেলে হসপিটালে যাওয়া নিশ্চিত। বছরের পর বছর ধরে স্লিপারটা ঐভাবেই ছিল। একটা বাচ্চাদের পার্ক কী করে এরকম হয়?
এর একটা ব্যাখ্যা হতে পারে, পার্কটা জনসাধারণের জন্য বানানো, মানে মূলত গরীব পোলাপানের জন্য। ভোটের সিজন ছাড়া গরীব মানুষের জীবনের খুব একটা দাম নাই, তাই তাদের পার্কের ব্যাপারেও কারো কোন মাথাব্যথা নাই।
কিন্তু ঐ সময়ে সমাজের সব স্তরেই এরকম নানা উত্তরহীন প্রশ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। রাষ্ট্রমঞ্চে তখন একনায়ক, জেনারেল এরশাদ। কোন বিচিত্র কারণে সংবাদপাঠিকারা তার বিরাট লম্বা নামটা হাসি হাসি মুখ করে বলতো, প্রায় সুর করে। যেন সুর করে উনার নাম না বললে এখনই পিট্টি দেয়া হবে।
খবরে বাদবাকি সবার নাম বল হতো সুরহীনভাবে – খুবই পিকিউলিয়ার শোনাতো। যেন দেশজুড়ে কোন ধ্বনিতাত্ত্বিক বিপর্যয় চলছে।
দেশে ফিরে আমার কোন স্কুল ছিল না, তাই মাসখানেকের মধ্যেই ভর্তি হওয়ার আশায় গ্রীন হেরাল্ড স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। খেলাধূলার সেরকম সুব্যবস্থা চোখে না পড়লেও ভালো লেগেছিল স্কুলটা। কিন্তু জানা গেল, ব্রিটিশ পাসপোর্ট না থাকায় নাকি আমাকে ভর্তি করা যাবে না।
বাবা কিছুক্ষণ স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে তর্কাতর্কি করে হাল ছেড়ে দেয়। ‘But I am British,’ ফিরতে ফিরতে আমি বাবাকে স্মরণ করিয়ে দিই। ‘I was almost born in England.’
‘Almost isn’t enough,’ বাবা বলে। ‘You don’t have a British passport.’
‘But why?’
‘Because you were born here, in Bangladesh.’
‘Why?’
‘Because we’re Bangladeshi.’
‘No, why do I need a passport to go to school?’
বাবা মন-খারাপ চোখে আমার দিকে তাকায়।
রাত শেষে আমার অলস সময় কেটে যায়, স্বপ্নে কিছুটা নির্বাণ হয়, তারপর ঘুম ভেঙে আবার আলস্যের শুরু। কতদিন একটা সত্যিকারের প্লে-গ্রাউন্ডে খেলি না!
মাঝেমধ্যে আমার নিজেকে গাছ মনে হয়, অথবা ইলেকট্রিক পোস্ট।
গল্পের বই-টই থাকলেও সময় কাটানো যেত – কিন্তু আমি আবিষ্কার করি, ‘লাইব্রেরি‘ বলতে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ যা বোঝে সেটা আসলে স্টেশনারির দোকান।
বাবাকে টানা-হেঁচড়া করে একদিন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে গেলাম (গ্রন্থাগার, স্টেশনারির দোকান না) – সেখানকার দুরাবস্থা দেখে আমার অববোধন হয়, বইদেরও পরকাল আছে, এবং তার প্রমাণ এই নরক।
আমার মন ভালো করতে নিউ মার্কেটে বই কিনতে যাওয়া হয়। জিনাত বা এই টাইপ কোন দোকানে গিয়ে বাবা বলে, ‘বাচ্চাদের জন্য ভালো ইংরেজি বই দেখান তো, (আমাকে ইশারা করে) পাঁচ-ছয় বছর বয়েসী বাচ্চাদের জন্য।‘
দোকানের একজন ABCD টাইপ কিছু বই জড়ো করে হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে দেয়।
আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে যাই। বাবা অনেক কষ্টে দৌড়ে গিয়ে আমাকে ধরে। শেষমেষ বাসায় ফিরে সে নিজেই খাতাভর্তি করে এনসাইক্লোপিডিয়া-টাইপ একটা বই লিখে ফেলে আমার জন্য। হালকা সবুজ কাভারের একটা খাতা।
তার অনেক বছর পর বাবার লেখা একটা বই বের হয় – বইটার নাম ‘সহায়তা চক্র‘।
এক সময় আমি আর বিলাত-ফেরত নতুন একটা ছেলে থাকি না। আমাদের বাসার পিছনের জায়গাটায় যেসব ছেলেমেয়েরা খেলতো, তাদের চোখেও আমি কিছুটা পুরানো হয়ে যাই।
তখন বুলিয়িং-এর প্রকোপ কমে আসে। কিন্তু আমার ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টের বাংলা কম-বেশি আগের মতোই রয়ে যায় – সেটা পুরাপুরি কথ্যভাষা হতে আরো অনেকদিন লাগে।
ঐ বাংলিশ সময়টায় কারো সাথে ফ্রেন্ডশিপ করা ছিল আমার জন্য প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। সমবয়েসী কারো সাথেই বলতে গেলে আমি কানেক্ট করতে পারতাম না। বা কানেক্ট করতে পারলেও কানেকশনগুলি ছিল সাময়িক – হঠাৎ আমাদের বাসায় বেড়াতে আসা কেউ একটা, যার সাথে তারপর হয়তো আমার আর কখনো দেখাও হয় নাই।
টাইরানকে খুব মিস করতাম, আমার ক্লাসের বন্ধুদেরকে মিস করতাম। বুঝে যাই, আর কখনো তাদের সাথে আমার দেখা হচ্ছে না। সেজন্য আমার খুব মন খারাপ হয়, কিন্তু ততদিনে আমি বাংলাদেশি হওয়া শুরু করেছি – আস্তে আস্তে সেই মন-খারাপে আমার অভ্যাস হয়ে যায়।
এক দুপুরবেলার কথা। বাসার প্রায়-সবার লাঞ্চ করা হয়ে গেছে – কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ রিল্যাক্স করছে। এমন সময়ে পেছনের বারান্দার জানালাটা দিয়ে আমি উঁকি মেরে দেখি, তিন-চারটা ছেলে গোল হয়ে বসে অখন্ড মনোযোগে কি যেন একটা করছে।
কাহিনী কী? সিড়ি দিয়ে নেমে এক পা, দুই পা করে আমি পৌঁছে যাই সেই জটলায়।
ছেলেগুলি গরীব। একজন সম্পূর্ণ ফান্টা, আরেকজনের পরনে শুধু একটা শার্ট। আরেকজন লুঙ্গি পরা। তাদের মধ্যে লিডার গোছের ছেলেটার পরনে শুধু একটা শর্টস – জিপারের জায়গায় একটা সেফটিপিন।
‘Hello!’ আমি বলে উঠি। তারা চমকে তাকায়, তারপর আবার যা করছিল তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
‘What are you doing?’
তারা নিরুত্তর। আমি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখি, তাদের সামনে কয়েকটা মার্বেল। বালুতে ছোট্ট একটা গর্ত। লিডারগোছের ছেলেটা জিভ কামড়ে তর্জনী দিয়ে একটা মার্বেলকে –
‘Can I play with you?’ আমি তর সইতে না পেরে বলে উঠি।
শট মিস হওয়ায় লিডারটা বিরক্ত হয়ে একটা গালি দেয়। অন্যরা তার ব্যর্থতায় হা-হুতাশ করে। আমি বাংলায় এবং ইংলিশে সাধ্য অনুযায়ী দুঃখ প্রকাশ করতে থাকি। আমার অ্যাপলজি পুরাপুরি উপেক্ষা করে ছেলেগুলিকে মার্বেল-বিষয়ক দার্শনিক আলাপ করে।
তারপর একসময় লুঙ্গি পরা ছেলেটা আমাকে বলে, ‘গুল্লি খেলবা?‘
আমি বিরাট লম্বা একটা স্মাইল হেসে বুঝাই – খেলবো।
এত বছর পর ছেলেগুলির মধ্যে শুধু দুইজনের নাম আমার মনে আছে। মাত্র কয়েক মাস টিকেছিল আমাদের বন্ধুত্ব।
গুল্লি খেলার পাশাপাশি আমরা লাটিম ফাইটও খেলতাম – লাট্টু ঘুরিয়ে পোকিমন স্টাইলে লড়াই।
ভাষার প্রবলেমটা ওদের সাথে কোন প্রবলেমই মনে হতো না – কথা আর ইশারার ককটেলে কাজ চলে যেত। আমাকে হাতে-কলমে এসব খেলা শেখায় সেই লুঙ্গি পরা ছেলেটা, যার নাম বাবু। গ্রুপের নেংটো ছেলেটা সবচেয়ে বেশি বকবক করতো, সারাক্ষণ তার মুখে হাসি লেগে থাকতো। লিডারগোছের ছেলেটার আসলে লিডার হওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না – খুব চুপচাপ টাইপের ছিল, দরকারের বেশি একটা কথাও খরচ করতো না।
কারা ওরা? কোন স্কুলে পরে? কি করে, কোথায় থাকে? ওদের ফ্যামিলি কোথায়? ভাঙা ভাঙা বাংলায় ওদেরকে এসব প্রশ্ন করতাম। বুঝলাম, ওরা কেউ স্কুলে যায় না। কেউ কেউ কাজ করে, আবার কেউ করে না।
আমিও উচ্ছ্বসিত হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমিও স্কুলে যাই না, কাজ-টাজ করি না। বাবুর স্মিত উত্তর থেকে যা বুঝলাম, তা হচ্ছে – এই কারণেই তাদের সাথে আমার ফ্রেন্ডশিপ হয়েছে। কিন্তু ফ্রেন্ড থাকতে হলে আমার গুল্লি খেলা আরো ইমপ্রুভ করতে হবে।
পাশ থেকে নেংটো ছেলেটা বললো, ‘তোমার মা কি আছে? নাকি নাইকা?‘
‘My মা?‘
‘তোমার মা, আম্মু –‘
‘আছে। I have a dad and a mum.’
‘অ,‘ সে কিছুটা হতাশ হয়। ‘আমার মায় আরেক ব্যাটার সাথে চৈলা গেছে।‘
আমি ওদের কাছ থেকে দুই-তিনটা মার্বেল ধার নিয়ে বাসায় মন দিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করলাম। প্র্যাকটিস দেখে কমল দাদা অবাক হয়ে বললো, ‘দোস্ত, কি করতেছ?’
বললাম যে একটা টুর্নামেন্ট আছে, তাই প্র্যাকটিসিং।
‘কার সাথে?‘
আমি কিছু বলি না, প্র্যাকটিস করতে থাকি।
একসময় সাধনায় কাজ হলো – গুল্লি ম্যাচে জিতে গেলাম। আমার সে কি আনন্দ!
সবচেয়ে ভালো লাগলো আমার অন্য বন্ধুগুলির সেলিব্রেশন – মনে হলো আমি একা না, সবাই মিলে জিতেছি। এমন কি লিডার ছেলেটাও হেসে মাথা নাড়লো। মনে হলো আমার সবচেয়ে বড় জয় সেটাই – একজন এক্সপার্ট গুল্লি প্লেয়ারের কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি।
কি যে দুর্দান্ত গুল্লি খেলতো সে! একটা মার্বেল যে কতভাবে ফিজিক্সকে ভেংচি কাটতে পারে, সেটা তার খেলা যে দেখেনি সে কল্পনাও করতে পারবে না। লাট্টু খেলাতেও ছেলেটা ছিল সমান পারদর্শী।
একদিন জানতে পারলাম তার নাম আসলে ‘কামাইল্লা‘ না, কামাল। শুনে আমি খুশি খুশি গলায় বললাম – ‘Oh, like Kemal Ataturk!’ তারপর বাংলিশে তাকে আতাতুর্কি ইতিহাস বয়ান করলাম।
কামাল শীতল চোখে তাকিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দেয়, তুরস্ক দেশটা বা সেই দেশের বা অন্য কোন দেশের জাতির পিতাকে নিয়ে তার তিলমাত্র আগ্রহ নাই। আমি আমতা আমতা করে আবার খেলায় মন দেই।
একটুপর বাবু অন্য একটা ছেলের সাথে গল্পগুজব শুরু করে। বিষয়বস্তু তারা ঢাকা শহরের কোথায় কোথায় একা ঘুরে বেড়ায়, এসব।
অ্যাডভেঞ্চার! আমি তৎক্ষনাৎ অনুনয়-বিনয় শুরু করি, পরের বার ওরা যেন আমাকেও সাথে নিয়ে যায়। প্রথমে বাবু রাজি হয় না। খেলার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের নেগোসিয়েশন চলতে থাকে। ওদের সাথে নিলে আমি আমার জেতা ঐ গুল্লিটা দিবো, আর ঐটাও...
তখন ওরা দুইজন রাজি হয়। আনন্দে আমি রোদমাখা মার্বেলের মতো ঝলমল করি। প্ল্যান-প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যায়, আমাদের সম্ভাব্য ডেসটিনেশনের তালিকায় কলাবাগান, হাতিরপুল, এলিফেন্ট রোড,পরিবাগ...
হঠাৎ চমকে দিয়ে কামাল বলে উঠে – ‘পরিবাগে কখনো যাবা না। পরিবাগে গেলে ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত পা ভাইঙ্গা ভিক্ষা করতে বসায়ে দেয়।‘
[ চলবে ]
