পর্ব ০৫
স্মৃতিচারণ · · ৫ মিনিটের পাঠ

অনেক বছর পর যখন সাত্তার পরিবারের সাথে আমাদের আবার দেখা হয়, বাবা শিবলীকে আমার স্কুলের নামটা একটা কাগজে লিখে দিতে বলেছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে নীল রঙের একটা বলপয়েন্ট পেন আর বাসার খাতা থেকে এক টুকরা কাগজ ছিঁড়ে এনে দিলাম।
বেড়াছেড়াভাবে ছেঁড়া কাগজের টুকরাটা দেখে বাবা বললো, ‘আর একটু বড় কাগজ আনা গেল না?‘
গার্জিয়ানদের এই টাইপ কথায় বাধ্য কিন্ত ডানাওয়ালা সন্তানদের যেভাবে হাসতে হয়, আমি সেরকম একটা লজ্জিত হাসি দিলাম।
শিবলীও হাসি হাসি মুখ করে বললো, ‘It’s okay.‘ তারপর গোটা গোটা, হেলানো অক্ষরে লিখলো – North Harringay Primary School.
কিছুদিন আগে গুগুল ম্যাপসে সেই স্কুল খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, স্কুলটা আমাদের তখনকার বাসার পাশেই – রাস্তার উল্টা দিকে। এত কাছে ছিল? আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ছোটবেলায় তো মনে হতো বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। এইতো এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, আমি মায়ের হাত ধরে নাচতে নাচতে কালো রাস্তাটা পার হচ্ছি।
তাহলে কি ছোট ছোট পা নিয়ে হাঁটতাম বলে স্কুলটা তখন দূরে মনে হতো?
নাকি পৃথিবীটাই অনেক বড় ছিল সেই সময়ে? আর এখন বহু বছরের ধুলা-চাপা ডায়েরির মতো সংকুচিত হয়ে গেছে?
সেই নর্থ লন্ডন – বিকেলে আকাশটা মাঝে মাঝে লাল হয়ে থাকতো। যেন বিধাতার ইচ্ছে হয়েছিল, ব্রাশ দিয়ে জলরঙের কয়েকটা টান দেবেন।
তারপর কয়েকটা মেঘ রঙ করেই তাঁর আর রঙ করতে ইচ্ছে করছিল না, অন্য কিছু খেলতে চলে গেছেন। প্লে-গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আমি অবাক হয়ে সেই জলরঙের আকাশ চেয়ে চেয়ে দেখতাম। তারপর নিজেও অন্যকিছু খেলতে চলে যেতাম।
অনেকদিন পর্যন্ত স্কুলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলতে কেউ ছিল না। এমন না যে কারো সাথে মিশতাম না, বা অন্য পোলাপানদের কাছে পাত্তা পেতাম না – ঐসব দিক দিয়ে কোন প্রবলেম ছিল না। কাহিনী হচ্ছে, ঐ বয়েসের পোলাপানদের সাথে আমি খুব একটা কানেক্ট করতে পারতাম না।
এর কারণ হচ্ছে – আগেই বলেছি – বেশি বেশি জ্ঞান। আমি পড়তে শিখি দুই-তিন বছর বয়েসে। বই জিনিসটা আবিষ্কার করার পর পৃথিবীর সবাইকেই আমার কমবেশি বোরিং মনে হতো। বিদেশের স্কুলগুলির একটা চমৎকার জিনিস হচ্ছে, প্রত্যেকটা স্কুলে একটা ছোট লাইব্রেরি থাকে। আমি লাইব্রেরিতে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকতাম। ঐ বয়েসে আমার প্রিয় বই ছিল রামায়ণ – ছোটদের উপযোগী একটা ইংরেজি ট্রান্সলেশন ছিল লাইব্রেরিটায়।
তার উপর আমি তখন মোটামুটি নিয়মিতভাবে মেডিটেশন করতাম (যেটার পুরাপুরি কৃতিত্ব আমার বাবার)। ফলে ছোটাছুটি করতে পছন্দ করলেও আমার মধ্যে ন্যাচারালি এক ধরনের স্থৈর্য ছিল। সবার সাথে খেলতাম, হৈচৈ করতাম, কিন্তু তারপর একটা সুইচ অফ হয়ে যাওয়ার মতো করে গুডবাই – এক কথায়, ল্যাদাগুদুদের সাথে পুতুপুতু করার টাইম নাই।
হঠাৎ একদিন অ্যালেকজানড্রিয়া নামের সোনালি চুলের একটা মেয়ে ক্লাসের সবার সামনে ঘোষণা দিলো – ‘I love Tashfeen. I want to marry him when I grow up.’
কাজটা সে করেছিল একদম অপ্রাসাঙ্গিকভাবে – টিচার সবাইকে একটা পশুপাখি বিষয়ক গল্প পড়ে শোনাচ্ছিলেন যাতে বিয়ে-শাদির নামগন্ধও ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। ঐ বয়সে মানুষ প্রেম না বুঝলেও লোকলজ্জা ঠিকই বোঝে – আমি লজ্জায় বেগুনী হয়ে গেলাম।
অ্যালেকজানড্রিয়াকে দেখে অবশ্য মনে হলো, নিজের ফিলিংস জাহির করতে পেরে সে বেশ গর্বিত। টিচার সুধালেন, কিন্তু তাশফীনকেই বিয়ে করতে চাচ্ছ কেন?
বালিকা বললো, ‘Because he’s quiet. He’s not noisy like the other boys.’
আমি দুই হাত ছাতার মতো মাথার উপর মেলে ধরে তার নিচে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করলাম। (হ্যা, ব্যাপারটা পড়তে যতটা ridiculous লাগছে, বাস্তবেও তাই।)
এই লেভেলের ড্রামা করেও অ্যালেকজানড্রিয়া ক্ষান্ত হলো না।
চান্স পেলেই সে আমাকে তার বান্ধবীদের সাথে খেলার জন্য টানাটানি শুরু করে দিতো। আমি এমনিতেও কখনো তার সাথে খেলতাম না, তাই অনাগ্রহ প্রকাশ করতাম। তখন সে রেগে গিয়ে মনে করিয়ে দিত, ফিউচারে ওর সাথেই আমার বিয়ে হচ্ছে। তার সাথে খেলাধূলা করাটা আমার জন্য ফরয।
আমি স্বসম্মানে তার সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম।
তারপর একদিন স্কুল ছুটি হওয়ার পর সে আমার মা‘র কাছে গিয়েও সেই বৈবাহিক ডায়ালগ দিয়ে বসলো। মা তো হেসেই কুটিকুটি। হাসতে হাসতে সে অ্যালেকজানড্রিয়াকে সুধায়, কিন্তু কেন তুমি ওকেই বিয়ে করতে চাচ্ছ?
আমার সেই ‘চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী‘ তখন বলে, ‘Because he’s nice. He’s not like the other boys. He’s very kind.’
ঐ মুহূর্তে লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারলে আমি অবশ্যই যেতাম, কিন্তু বিধি বাম। তাই আমার একাধারে পেট খারাপ, ক্যান্সার, এবং সেই সাথে আমি এমন একজন চেইনস্মোকার যে কিনা আজ সকাল থেকেই সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে – এরকম একটা চেহারা করে মা‘র পাশে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
মাকে অবশ্য দেখে মনে হচ্ছিল সে খুবই আনন্দিত। অ্যালেকজানড্রিয়াকে সে হাসতে হাসতে বলে, ‘I see.’
নায়িকা তখন খুব উৎসাহ নিয়ে যোগ করে, ‘And I’m going to wear a white dress at our wedding. And there will be ponies. And then we’re going to have lots of babies.’
(লীলা বড় হলে তাকে একদিন এই গল্পটা বলতে হবে।)
[ চলবে ]